একান্ত আলাপচারিতায় প্রবাসী সংগঠক বদরুজ্জামান বদরুল
মুক্তিযোদ্ধের সংগঠকদের রাষ্ট্রিয় মর্যাদা প্রদানের দাবী

Published: 20 January 2022, 6:54 AM

স্টাফ রিপোর্টার :

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযোদ্ধের পূর্বে ও যুদ্ধচলাকালীন সময়ে যুক্তরাজ্য থেকে যে ক’জন দেশ প্রেমিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে নানা আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বদরুজ্জামান বদরুল। তৎকালীন সময়ে তরুণ এই দেশ প্রেমিক নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন লাল সবুজের পতাকা ছিনিয়ে আনার আন্দোলনে। পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে সকল ধরণের সহায়তা করার শপথ নেন। নানা আন্দোলনে যোগ দিতে বিদেশের মাটিতেও তাকে করতে হয়েছে দৌড়ঝাঁপ। ফ্রান্সে গিয়েও তিনি বিশ্ব ব্যাংকের সামনে দাড়িয়ে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়ে সারা বিশে^র নজর কাড়েন।

সাবেক আইজিপি জাবেদ পাঠোয়ারির সাথে একান্তে মুক্তিযোদ্ধের প্রবাসী সংগঠক বদরুজ্জামান

মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার ৬নং একাটুনা ইউনিয়নের মল্লিকসরাই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান বদরুজ্জামান বদরুল বয়সের ভাবে ন্যূয়ে গেছেন অনেকটা। কিন্তুু বিদেশে বসে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস, নানা আন্দোলন ও দেশ স্বাধীনের কথা কিছু তিনি ভূলেন নি। পাক হানাদের হাতে বাবাকে হারিয়ে অনেকটা নির্বাক হলেও দেশ স্বাধীন হওয়া এবং একটি স্বাধীন দেশে বসবাস করতে পেরে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করছেন তিনি।
কথা হয় মুক্তিযোদ্ধের প্রবাসী এই সংগঠকের সাথে তিনি জানান, তাঁর যখন ২২/২৩ বছর বয়স তখন লন্ডনে কাজ করতেন। দেশের পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের খবর বিবিসি’র মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শুনতেন। দেশে যুদ্ধের দামামা বাজবে তা আর তাদের বুঝতে সময় লাগলো না। বন্ধু বান্ধব সকলে মিলে এ নিয়ে কাজের ফাঁকে আলোচনা করি। তখন আমরা মৌলভীবাজারীদের সংগঠন ছিল ‘মৌলভীবাজার জনসেবা সমিতি’। আর এই সমিতির ব্যানারে মঈন উদ্দিন মনাফ মিয়ার নেতৃত্বে আমরা পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন শুরু করি। লন্ডনের আলতাব আলী পার্ক, ট্রাফেগার স্কয়ারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডমেষ্ট্রেশন করি। বিভিন্ন পত্র পত্রিকার মাধ্যমে আমরা আমাদের অবস্থান বিশ^কে জানাতে থাকি। বদরুজ্জামান জানান, তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের তথা তাঁর এলাকার সাথে ছিল না টেলিফোন যোগাযোগ। তাই বিবিসির নিউজ শুনে যুদ্ধের খবর পেতেন।

 

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ডাকে উদ্ধুদ্ধ হয়ে, আমি কাজ করে যে বেতন পেতাম তার বৃহৎ অংশ দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে দান করে দিতাম। আর আমাদের দেওয়ার মাধ্যম ছিল মৌলভীবাজার জনসেবা সমিতি। এই সমিতি ভারতে বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের দেওয়া অনুদান প্রেরণ করতো।

১৯৭১ সালে ঘটে যাওয়া বাঙালিদের ওপর পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতা ও নির্যাতনের ঘটনা তাঁকে বার বার পীঁড়িত করে। স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের জন্য কিছু করার প্রয়োজনার্থে জীবন ঝুঁকি নিয়ে তিনি নিবেদিত হয়েছিলেন বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সুদূর প্রবাসে থেকেও নিজ মাতৃভূমির মুক্তির জন্য আন্দোলন সংগ্রামের প্রথম সারিতেও ছিলেন সাহসী এই বদরুজ্জামান। যার কারণে তার পিতাকে পাক বাহিনী বাড়ী থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করে।

যুক্তরাজ্য প্রবাসী কমিউনিটি লিডার বদরুজ্জামান বদরুল ২৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৪৯ সালে মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার ৬নং একাটুনা ইউনিয়নের মল্লিকসরাই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন আবু সুফিয়ান ওরফে আসকির মিয়া। মাতা ছিলেন রহিমা বানু। এলাকায় তাঁর পিতা একজন সুপরিচিত ও বিচারিক ব্যক্তি ছিলেন। পিতা মাতার আট সন্তানদের মধ্যে বদরুজ্জামান বদরুল সবার বড়। ১৯৫৫ সালে চাঁদনীঘাট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষা জীবনের শুরু হয়। পরবর্তীতে জুনিয়র হাইস্কুল ও ঐতিহ্যবাহী মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি পড়াশোনা করেন। ছোট বেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত সাহসী, মেধাবী, উদ্যমী ও কর্মঠ ছিলেন। সক্রিয় ছিলেন ছাত্র রাজনীতিতেও। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে লালন করে জড়িয়ে পরেন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। কিন্তু পারিবারিক কারণে ১৯৬৫ সালে তিনি পাড়ি জমান সুদূর লন্ডনে।

বদরুজ্জামান বদরুল জানান, ১৯৭১ সালে সেখান থেকেই একাত্ম হয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের লড়াইয়ে। যোগ দেন তৎকালীণ সিলেটের বৃহত্তর প্রবাসীদের সামাজিক সংগঠন মৌলভীবাজার জেলা জনসেবা উন্নয়ন সমিতিতে। তৎকালীন সেই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন তার নিজ একাটুনা ইউনিয়নের আরেক কৃতি সন্তান মঈন উদ্দিন মনাফ মিয়া। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে দেশ-মাতৃকার টানে, তারুণ্যে টগবগ যৌবন নিয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে ঝাঁপিয়ে পড়েন ক্লান্তিহীন মুক্তিসংগ্রাম আন্দোলনে। এই ত্যাগী সৈনিক শুধু মুক্তিসংগ্রামের আন্দোলনেই যুক্ত ছিলেন না, বরং প্রবাসে নিজ কষ্টে উপার্জিত টাকার বেশিরভাগই একটি অংশ দান করে দিতেন নিজ দেশের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনরত বিভিন্ন সংগঠনসমূহে।

তিনি জানতে পারেন, বিশ্ব ব্যাংক থেকে আর্থিক অনুদান নিচ্ছে পাকিস্তান। যেটি কিনা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হওয়ার আশংকা করছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলনরত রাজনৈতিক নেতারা। তাৎক্ষণিক মৌলভীবাজার জেলা উন্নয়ন জনসেবা সংগঠনের সবাইকে নিয়ে ফ্রান্সে বিশ্বব্যাংকের সামনে জড়ো হওয়ার পরিকল্পনা নেন। সেখানে অবস্থান নিয়ে গড়ে তুলেন তীব্র বিক্ষোভ ও আন্দোলন । ‘এইড টু পাকিস্তান মিনস্ ভুলেট ফর বাংলাদেশ’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয় প্যারিস শহর। তাঁদের আন্দোলনের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় বিশ্ব ব্যাংক।

বিশ্ব ব্যাংকের তৎকালীন পাকিস্তানকে অর্থ প্রদান বন্ধের সিদ্ধান্তের পর দেশে বাঙালি মুক্তিবাহিনীর মধ্যে বিপুল উৎসাহের জন্ম দেয়। প্যারিস থেকে লন্ডনে ফিরে গিয়ে জানতে পারেন দেশে পাকিস্তানি মিলিটারিরা তাঁর বাবাকে তুলে নিয়ে যায় (তৎকালীন টর্চার সেল হিসেবে খ্যাত) মৌলভীবাজার সার্কিট হাউজে। সেখানেই রাতভর টর্চার করে তার বাবাকে হত্যা করে পাকিস্তানি সৈন্যরা। তখন তার দেশে ফেরার ইচ্ছে থাকলেও পাক হানাদার বাহিনী তাকেও প্রাণে মেরে ফেলতে পারে স্বজনদের এমন আশংকায় তিনি আর দেশে ফেরেননি ।

বদরুজ্জামান বদরুল স্বপ্ন দেখতেন দেশ স্বাধীন হবে। দীর্ঘ ৯মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বহু প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি লন্ডনে যান। ৯ই জানুয়ারি লন্ডনের তৎকালীণ মুগলশাহী রেষ্টুরেন্টে বঙ্গবন্ধু যাবেন শুনে বদরুজ্জামান সেখানে ছুটে যান তার সান্নিধ্য পেতে। তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা হয় বদরুজ্জামানের। তখন তিনি আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন।

এ সময় বঙ্গবন্ধুর সাথে ছিলেন প্রবাসে মুক্তি সংগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম কুটনীতিক বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তখন দেশে ঘটে যাওয়া তার পিতার ঘটনাবলী বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করলে তিনি বদরুজ্জামানকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সদ্য বাবা হারানো ব্যাকুল হওয়া বদরুজ্জামানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিনের মুঘলশাহী রেস্টুরেন্টে বঙ্গবন্ধুকে নিজ হাতে খাওয়ানোর সেই স্মৃতি আজও ভূলতে পারেননি বদরুজ্জামান।

বয়সের ভারে এখন অনেকটা ন্যূয়ে পড়লেও বদরুজ্জামান বদরুল নিজ এলাকায় মানুষের কল্যাণে কাজ করছেন। মানবতার কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দিতে এখন অবস্থান করছেন দেশে। নিজ অর্থায়নে গরীব মেয়েদের বিয়ে, গরীব অসহায়দের ফ্রি চিকিৎসা, মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মানসহ মানুষের কল্যাণে আসে এ রকম কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। মানুষকে পেলে শুনান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের প্রবাসের গল্প। মুক্তি সংগ্রামে নিজ দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছেন সেটা নিয়ে তিনি সর্বদা গর্ববোধ করেন।

দেশ স্বাধীনের ৫০ বছর পার হওয়ার পরও মহান মুক্তিযোদ্ধের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত দেশ ও বিদেশের সংগঠকদের স্বীকৃতি না দেওয়ায় তিনি হতাশ। বদরুজ্জামান বদরুল বলেন, এদেশের দামাল ছেলেদের উজ্জিবীত করে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস যোগানো থেকে শুরু করে নানা নির্দেশনাসহ ভারতে নিয়ে যারা ট্রেনিং এর ব্যবস্থা এবং হাই কমান্ডের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে যেতেন তাঁরাই ছিলেন মুক্তিযাদ্ধের সংগঠক। পাশাপাশি এসব ব্যক্তিদের সাথে প্রবাস থেকে যুক্ত হতেন প্রবাসী সংগঠকরা।
তিনি বলেন, এসব মহান ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে এখনো নেয়া হয়নি সরকারী উদ্যোগ। তাই মুক্তিযাদ্ধারা শুধু এদেশে সুবিধা ভোগ করছেন আর সংগঠকরা পাচ্ছেন না তাদের স্বীকৃতির পাশাপাশি কোন ধরণের সুযোগ সুবিধা।
মুক্তিযাদ্ধের এই প্রবাসী সংগঠক সরকারের প্রতি দাবী রেখে বলেন, এখনো সরকার সঠিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সকল সংগঠকদের তালিকা করে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদানসহ সংগঠকদেরও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিতে হবে। আর এরই মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযাদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধের সংগঠক এবং মুক্তিযোদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।

তিনি ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ও আট সন্তানের জনক বদরুজ্জামান। তার সন্তানরাও সকলে প্রবাসের মাটিতে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। জীবনের বাকি সময়টুকু তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সোনারবাংলা বিনির্মাণে দেশের জন্য কাজ করবেন এমনটাই তাঁর প্রত্যাশা।