ট্রাক আর ট্রাক্টরের বিকট শব্দে ঘুম থেকে কেঁপে উঠছেন শিশুরা

ট্রাক আর ট্রাক্টরের বিকট শব্দে ঘুম থেকে কেঁপে উঠছেন শিশুরা
বিয়ানীবাজারে চলছে কৃষি জমির টপ সয়েল বিক্রির মহোৎসব

Published: 19 February 2021

বিশেষ সংবাদদাতা : কোন ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্ক না করেই বিয়ানীবাজারে চলছে জমজমাট মাটি ব্যবসা। আর এই মাটি বহনের কাজে ব্যবহৃত ট্রাক্টর আর ট্রাকের শব্দে রাতে ঘুম থেকে কেঁপে কেঁপে উঠছে শিশুরা।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কোমলমতি শিশুদের এক আতংকের নাম ট্রাক আর ট্রাক্টর। অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রশাসনের রক্ষকদের সাথে যোগাযোগ করেই একটি চক্র সর্বত্র এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানাযায়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় উর্বর দুই/তিন ফসলি জমির টপ সয়েল (জমির উপরিভাগের মাটি) কাটার ধুম পড়েছে। আর্থিকভাবে সাময়িকভাবে লাভবান হওয়ার আশায় অনেক জমির মালিক তাদের জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে ফসল উৎপাদন ব্যাপকহারে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিয়ানীবাজার উপজেলার বিভিন্ন হাওরের অধিকাংশ জমিই উর্বর পলি মাটি সমৃদ্ধ। এসব জমিতে বছরে দু’টি মৌসুমে ধান শীতকালীন সবজি উৎপাদন হয়। কিন্তু কিছু অসাধু মাটি ব্যবসায়ী কৃষকদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে এসব জমির টপ সয়েল কিনে নিচ্ছেন।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বিয়ানীবাজার উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে দুই বা তিন ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে বিক্রির হিড়িক পড়েছে। বড় বড় ট্রাকে বা ট্রাক্টরে করে এসব মাটি পরিবহনের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে আঞ্চলিক মহাসড়কও। একটু বৃষ্টি হলেই নানা দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে চলাচল করতে হচ্ছে এসব রাস্তা দিয়ে। ঘটছে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। পাকা রাস্তায় পলি মাটি পড়ে থাকার ফলে ক্ষতি হচ্ছে পাকা রাস্তাও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় মাটি ব্যবসায়ীরা প্রতি বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু করে মার্চ পর্যন্ত মাটির ব্যবসা করেন। তারা কৃষকদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে জমির দুই থেকে আড়াই ফুট মাটি কিনে নিয়ে চড়া দামে ইটভাটায় বিক্রি করেন। এছাড়া বাড়ি তৈরি ও খালি জায়গা ভরাট করতে মাটি ভরাট প্রয়োজন হলেও অনেকে এসব মাটি ব্যবসায়ীর দ্বারস্থ হন। মাটি বিক্রি করে অল্প সময়েই মাটি ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকা রোজগার করেন।
কৃষি অফিস সূত্র জানিয়েছে, টপ সয়েল জমির প্রাণ। জমির উপরের আট থেকে ১০ ইঞ্চিই হলো টপ সয়েল। আর ওই অংশেই থাকে মূল জৈবশক্তি। কৃষকরা জমির টপ সয়েল বিক্রি করে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারছেন। মাটি বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে তারা জমির উর্বরা শক্তিই বিক্রি করে দিচ্ছেন। জমির এ ক্ষতি ১০ বছরেও পূরণ হবে না। সূত্রটি জানায়, যেভাবে মাটি বিক্রি হচ্ছে তাতে করে ফসল উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেতে পারে।
অনেকে অভিযোগ করে বলেছেন, মাটি ব্যবসায়ী চক্র এতোটাই বেপরোয়াভাবে ও সাহসের সাথে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে তা মাঠে গেলেই প্রমাণ পাওয়া যাবে। অত্যাধুনিক এক্সেভেটর দিয়ে দিন রাত প্রশাসনের নাগের ডগা থেকে শুরু করে সর্বত্রই মাটি কাটার কাজ করছে শ্রমিকেরা।
আব্দুল মানিক নামক জনৈক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, মাটি ব্যবসায়ীদের বেপরোয়া কারবারের ফলে বাচ্চারাও রাতের বেলা ঘুমাতে পারছেন না। ট্রাক্টর আর ট্রাকের শব্দে বাচ্চারা রাতে ঘুম থেকে কেঁপে কেঁপে উঠছেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানাগেছে, বিয়ানীবাজার পৌর এলাকায় টিলা কাটার পাশাপাশি মুল্লাপুর ইউনিয়নেও কাটা হচ্ছে টিলা। এছাড়াও কুড়ারবাজার ইউনিয়নের আংগারজুর এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের পাশ থেকে কাটা হচ্ছে মাটি। আর এর ফলে ঝুকির মধ্যে পড়ছে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ। স্থানীয় ইউপি সদস্য বিষয়টি স্বীকার করলেও তার কিছু করার নাই বলে তিনি জানান। আলীনগর, মুড়িয়া, লাউতা, চারখাই, তিলপারা, মাথিউরা, দুবাগ, শেওলা ইউনিয়নের হাওর থেকে শুরু করে মাঠ থেকেও কাটা হচ্ছে মাটি। স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেছেন, এই ব্যবসার সাথে যারা জড়িত রয়েছেন তারা প্রভাবশালী তাই তারা এ নিয়ে প্রতিবাদ করতে ভয় পাচ্ছেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের চেষ্ঠা করা হলে তার ফোনে তাঁকে পাওয়া যায় নি।