মুমিনদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও

Published: 19 June 2021, 10:27 AM

।। জাফর আহমাদ ।।

”ঈমানদারদের মধ্যকার দু’টি দল যদি পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। তারপরও যদি দু’টি দলের কোন একটি অপরটির বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করে তবে যে দল বাড়াবাড়ি করে তার বিরুদ্ধে লড়াই করো। যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। এরপর যদি তারা ফিরে আসে তাহলে তাদের মাঝে ন্যায় বিচারের সাথে মীমাংসা করিয়ে দাও এবং ইনসাফ করো। আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন। মু’মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমাদের ভাইদের মধ্যকার সম্পর্ক ঠিক করে দাও। আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমাদের প্রতি মেহেরবানী করা হবে”(সুরা আল হুজরাত:৯-১০)
তাফসীরকারকগণ বলেছেন, উল্লেখিত আয়াতের শুরুতে আল্লাহ এ কথা বলেননি, যখন ঈমানদারদের মধ্যকার দু’টি গোষ্ঠী পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হয় বরং বলেছেন,“যদি ঈমানদারদের দু’টি দল একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়”। এ কথা থেকে স্বত:ই বুঝা যায় যে,পরস্পরে লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া মুসলমানদের নীতি ও স্বভাব নয় এবং হওয়া উচিতও নয়। মু’মিন হয়েও তারা পরস্পর লড়াই করবে এটা তাদের কাছ থেকে আশাও করা যায় না।
তবে যদি এমনটি ঘটে তাহলে সে ক্ষেত্রে এমন কর্মপন্থা গ্রহণ করা উচিত যাতে মীমাংসা হয়ে যায়।“তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।” আয়াতের মাধ্যমে সমস্ত মুসলমানদের সম্বোধন করা হয়েছে। যারা উক্ত বিবদমান দল দূ’টিতে শামিল নয় এবং যাদের পক্ষে যুদ্ধমান দু’টি দলের মধ্যে সন্ধি ও সমঝোতা করে দেয়া সম্ভব। এ নির্দেশের মাধ্যমে এটিও পরোক্ষভাবে বুঝা যায় যে, মুসলমানদের দু’টি দল পরস্পর লড়াই করতে থাকবে আর মুসলমান নিস্ক্রিয় বসে তামাশা দেখবে আল্লাহর দৃষ্টিতে সেটা মুসলমানের কাজ নয়। বরং এ ধরণের দু:খজনক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটলে তাতে সমস্ত ঈমানদার লোকদের অস্থির হয়ে পড়া উচিত এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণে যার পক্ষে যতটুকু চেষ্টা করা সম্ভব তাকে তা করতে হবে। উভয় পক্ষকে লড়াই থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিতে হবে। তাদেরকে আল্লাহর ভয় দেখাতে হবে। প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাত করবে। বিবাদের কারণসমূহ জানবে এবং নিজ নিজ সাধ্যমত তাদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার সব রকম প্রচেষ্টা চালাবে।
এটাও মুসলমানদের কাজ নয় যে, সে অত্যাচারীকে অত্যাচার করতে দেবে এবং যার প্রতি অত্যাচার করা হচ্ছে তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেবে কিংবা অত্যাচারীকে সহযােগীতা করবে। তাদের কর্তব্য হচ্ছে, যুদ্ধরত দু’পক্ষের মধ্যে সন্ধি করানোর সমস্ত প্রচেষ্টা যদি ব্যর্থ হয়ে যায় তাহলে দেখতে হবে সত্য ও ন্যায়ের অনুসারী কে এবং অত্যাচারী কে? যে সত্য ও ন্যায়ের অনুসারী তাকে সহযোগীতা করবে। আর যে অত্যাচারী তার বিরুদ্ধে লড়াই করবে। সীমালংঘনকারী দলের বিরুদ্ধে লড়াই করার অর্থ এটাই নয় যে, তার বিরুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লড়াই করতেই হবে এবং তাকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে। বরং এর অর্থ হচ্ছে তার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করা এবং এর মূল উদ্দেশ্য তার অত্যাচার নিবৃত ও নিরসন করা। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যে ধরণের শক্তি প্রয়োগ অনিবার্য তা ব্যবহার করতে হবে এবং যতটা শক্তি প্রয়োগ উদ্দেশ্য সিদ্ধিতে যতেষ্ট তার চেয়ে কম শক্তিও প্রয়াগ করবে না আবার বেশীও প্রয়োগ করবে না।
”যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে” আল্লাহর নির্দেশ অর্থ আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নাত অনুসারে যা ন্যায় তা মেনে নিতে উদ্যোগী হবে এবং সত্যের এ মানদণ্ড অনুসারে যে কর্মপন্থাটি সীমালংঘন বলে সাব্যস্ত হবে তা পরিত্যাগ করবে। আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের সুন্নাত অনুসারে কোন বিবাদে ন্যায় কি এবং অন্যায় কি তা নির্ধারণ করা তাদেরই কাজ যারা এ উম্মতের মধ্যে জ্ঞান ও দুরদৃষ্টি দিক দিয়ে বিষয়টি বিচার-বিশ্লেষণ করার যোগ্য।
“তাদের মাঝে ন্যায় বিচারের সাথে মীমাংসা করিয়ে দাও এবং ইনসাফ করো” শুধু সন্ধি করিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি, বরং নির্দেশ দেয়া হয়েছে ন্যায় ও ইনসাফের সাথে সন্ধি করিয়ে দেয়ার। এ থেকে বুঝা যায় হক ও বাতিলের পার্থক্যকে উপেক্ষা করে শুধু যুদ্ধ বন্ধ করানো হয় এবং যেখানে সত্য ও ন্যায়ের অনুসারী দলকে অবদমিত করে সীমালংঘনকারী দলকে অন্যায়ভাবে সুবিধা প্রদান করানো হয় আল্লাহর দৃষ্টিতে তার কোন মূল্য নেই। সে সন্ধিই সঠিক যা ন্যায় বিচারের ওপর ভিত্তিশীল। এ ধরণের সন্ধির দ্বারা বিপর্যয় দূরীভুত হয়।
“মু’মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই” এ আয়াতে দুনিয়ার সমস্ত মুসলমানকে এক বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। দুনিয়ার অন্য কোন আদর্শ বা মত ও পথের অনুসারীদের মধ্যে এমন কোন ভ্রাতৃত্ব বন্ধন পাওয়া যায় না যা মুসলমানদের মধ্যে পাওয়া যায়। এটাও এ আয়াতের বরকতে সাধিত হয়েছে। এ নির্দেশের দাবী ও গুরুত্বসমূহ কি, বহুসংখ্যক হাদিসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা বর্ণনা করেছেন। ঐ সব হাদীসের আলোকে এ আয়াতের আসল লক্ষ ও উদ্দেশ্য বোধগম্য হতে পারে। হাদীসগুলো নিমানরূপ:
হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ বলেন,রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার থেকে তিনটি বিষয়ে “বাইয়াত” নিয়েছেন। এক, নামায কায়েম করবো। দুই, যাকাত আদায় করতে থাকবো। তিন, প্রত্যেক মুসলমানের কল্যাণ কামনা করবো। (বুখারী-কিতাবুল ঈমান)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মুসলমানদের গালি দেয়া ফাসেকী এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরী। (বুখারী-কিতাবুল ঈমান) মুসনাদে আহমাদে হযরত সাঈদ ইবনে মালেক ও তাঁর পিতা থেকে অনুরূপ বিষয়বস্তু সম্বলিত হাদীস বর্ণিত করেছেন।
হযরত আবু হুরাইরা রা: ্বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপর মুসলমানের জান, মাল ও ইজ্জত হারাম। (মুসলিম-কিতাবুল র্বির ওয়াস্স্ািহ, তিরমিযি-আবওয়াবুল র্বির ওয়াস্ সিলাহ)
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা: ও হযরত আবু হুরাইরা রা: বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না, তাকে সহযোগীতা করা পরিত্যাগ করে না এবং তাকে লাঞ্ছিত ও হেয় করে না। কোন ব্যক্তির জন্য তার কোন মুসলমান ভাইকে হেয় ও ক্ষুদ্র জ্ঞান করার মত অপকর্ম আর নাই। (মুসনাদে আহমাদ)
হযরত সাহল ইবনে সা’দ সায়েদী নবীর এ হাদীস বর্ণনা করেছেন, যে, ঈমানদারদের সাথে একজন ঈমানদারের সম্পর্ক ঠিক তেমন যেমন দেহের সাথে মাথার সম্পক। সে ঈমানদারদের প্রতিটি দু:খ-কষ্ট ঠিক অনুভব করে যেমন মাথা দেহের প্রতিটি অংশের ব্যথ্যা অনুভব করে। (মুসনাদে আহমাদ অপর একটি হাদীসে এ বিষয়বস্তুর প্রায় অনুরূপ বিষয়বস্তু বর্ণিত হয়েছে। উক্ত হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:পারস্পরিক ভালবাসা, সুসম্পর্ক এবং একে অপরের দয়ামায়া ও স্নেহের ব্যাপারে মু’মিনগণ একটি দেহের মত। দেহের যে অংগেই কষ্ট হোক না কেন তাতে গোটা দেহ জ্বও ও অনিদ্রায় ভুগতে থাকে।(বুখারী ও মুসলিম)
আরো একটি হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বাণীটি উদ্ধৃত হয়েছে যে, মু’মিনগণ পরস্পরের জন্য একই প্রাচীরের ইটের মত একে অপরের থেকে শক্তিলাভ করে থাকে। (বুখারী –কিতাবুল আদাব, তিরমিযি-কিতাবুল র্বির-ওয়াস্ সিলাহ)
ইসলামের এ পবিত্রতম সম্পর্কের ভিত্তিতে তারা একে অপরের ভাই এবং আল্লাহর ভয়েই তাদেরকে নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক ঠিক রাখার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন।