ওসি ক্লোজড অতিরিক্ত ডিআইজি'র নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি

ওসি ক্লোজড অতিরিক্ত ডিআইজি'র নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি
ওসি ও যুবলীগ নেতা অপুর ফোনালাপ নিয়ে শাল্লায় তোলপাড়

Published: 13 August 2021

কাউসার চৌধুরী :


সুনামগঞ্জের শাল্লা থানার ওসি নূরে আলমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্তে সিলেটের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম) বিপ্লব বিজয় তালুকদারের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওসির বিরুদ্ধে সহকর্মী এসআইকে একটি বাহিনী দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে পেটানো, নারী কনস্টেবলকে কু প্রস্তাব দেয়ার পাশাপাশি মাদক ও জুয়ার আসর থেকে মাসোহারা আাদায় , গ্রেফতার বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ উঠেছে।

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান পিপিএম জানান, অভিযোগ পেয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে ওসি নূর আলমকে ক্লোজড করা হয়েছে। তাকে ডিআইজি অফিসে সংযুক্ত করা হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত ছাড়া এ বিষয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না। ভয়েস রেকর্ড যেটা বের হয়েছে তা তদন্তের বিষয়। তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে।
সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মুহাম্মদ মফিজুর রহমান পিপিএম সিলেটের ডাককে জানিয়েছেন, ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ আসার পরই এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করা হবে বলে জানান তিনি।

ওসির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ
স্থানীয় লোকজন ও বিভিন্ন সূত্রের সাথে কথা বলে জানা গেছে , থানার এসআই শাহ আলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে একটি বাহিনী হামলা করে। এ ঘটনায় যুবলীগ নেতা অপুসহ কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হয়। সম্প্রতি একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার পরই শুরু হয় তোলপাড়। কথোপকথনে প্রতীয়মান হয়, এস আইকে হামলার ঘটনাটি জানতেন ওসি নূরে আলম।
অভিযোগ রয়েছে, থানায় কর্মরত এক নারী কনস্টেবলকে রাতে গিয়ে তার সাথে সময় কাটানোর জন্য প্রস্তাব দেন ওসি। ওই নারী কনস্টেবল বিষয়টি থানার এএস আই উদয় কুমার চক্রবর্তীকে জানান। ওই নারী কনস্টেবল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সিলেটের ডাককে বলেন, ‘এএসআই স্যারকে বিষয়টি জানিয়েছি। তারা বিষয়টি দেখছেন। আমার কাছে সব প্রমাণ রয়েছে।’
ওসি মো. নূরে আলম থানা এলাকায় বিভিন্ন জুয়ার আসর, মাদক ব্যবসায়ী ও চোরকারবারীর কাছ থেকে বিপুল অর্থ মাসোহারা গ্রহণ করে আসছেন। শাল্লা ডুমরা গ্রামের এক ব্যক্তি এই অর্থ উত্তোলন করে দেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে । বিনিময়ে ওই ব্যক্তিকে প্রতি মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকা দেয়া হয় । এছাড়া, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, মামলা রেকর্ডেও অর্থ দিতে হয় ওসিকে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ঈদুল আযহার কুরবানী উপলক্ষে থানার অফিসার ও ফোর্সদের খাওয়ার জন্য উপজেলা মসজিদ থেকে ৬ কেজি গরুর মাংস , উপজেলা চেয়ারম্যান আল আমিন চৌধুরীর বাসা থেকে ২০ কেজি গরুর গোশত থানায় দেওয়া হয়। কিন্তু, ২৬ কেজি গরুর গোশত ওসি নিজে খাওয়ার জন্য তার বাসায় রেখে দেন। থানার অফিসার ফোর্সদের ভেড়ার ২/৩ টুকরা করে গোশত প্রদান করেন। লকডাউন থাকায় এবার ঈদে ছুটিতে যেতে না পেরে গরুর মাংস খেতে না পারায় অফিসার ফোর্সদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে বলে জানা গেছে।

এছাড়াও, এসআই শাহ আলীর উপর হামলার ঘটনায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিদেশে অপুকে মদ্যপ অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়। তাকে শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মদ্যপান করেছেন মর্মে সার্টিফিকেট দেন। এ সংক্রান্তে অপুর বিরুদ্ধে একটি মাদক মামলা রুজু হলে তাকে কোর্টে পাঠানোর আগে স্কর্ট অফিসার এসআই সেলিমকে পুনরায় সুনামগঞ্জ শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে অপুর মদ্যপানের বিষয়ে পরীক্ষা করানোর জন্য নির্দেশ দেন। পরে বিলম্বে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে পরীক্ষা করানো হলে নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। তাড়াতাড়ি আসামীকে জামিন পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য নেগেটিভ রিপোর্টটি আদালতে জমাদানের জন্য নির্দেশ দেন ওসি। বিষয়টি পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান অবগত হলে নেগেটিভ রিপোর্টটি ফেরত আনা হয় এবং সরকারি হাসপাতালের রিপোর্ট জমা দেওয়া হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।

০ ওসি-অপু’র ফোনালাপে তোলপাড়
সম্প্রতি ওসি নূরে আলম ও যুবলীগ নেতা অপুর ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফোনালাপের রেকর্ডগুলো ফাঁস হওয়ার পর এ নিয়ে শাল্লাসহ সুনামগঞ্জ জেলায় শুরু হয়েছে তোলপাড়। অডিওতে আহত এসআইকে প্রাণে মারার ইচ্ছা ছিল বলেও হামলাকারীদের বলতে শোনা যায়।
তাদের কথোপকথন হুবহু তুলে ধরা হলো- ওসি- ‘অপু দা।’ অপু- ‘জি ভাই, কোন জায়গায় আছেন এখন?’ ওসি বলেন, ‘আমি এই যে রওয়ানা দিছি।’ তখন অপু বলেন, ‘কথা কইলাইন (বলেন) তাইলে দাদার সাথে। তখন দাদা সম্বোধনকারী জনৈক ব্যক্তি ওসিকে বলেন, আদাব। ওসি বলেন, আদাব দাদা।

জনৈক ব্যক্তি বলেন, আপনি যেটা বলছিলেন, ওই যে শাহিদ আলীর (শাল্লা সদরে অবস্থিত শাহিদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়) পিছে আপনার দারোগারে মন-ইচ্ছামতো দিছি। ওসি বলেন, হুম। জনৈক ব্যক্তি বলেন, দুইজন লোক আসায় বাইচ্ছা গেছে। নাইলে জানে শেষ করে দিতাম। আমরার দিকে একটু খেয়াল করইন যে, আমরার যেন কোনো সমস্যা না হয়।’ অডিও ক্লিপের বক্তব্য অনুযায়ী ওসির নির্দেশেই এসআই শাহ আলীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফাঁস হওয়া রেকর্ডে কে ওই দাদা তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
ফাঁস হওয়া অন্য একটি অডিওতে শোনা যায়, অপু ওসিকে বলছেন, ‘ভাই কিছু খরচ পাঠাইছলাম পাইছইন নি?’ ওসি সম্মতিসূচক প্রতিউত্তর দিলে অপু ওসিকে বলেন, ‘ভাই কালকে থানায় আপনার জন্য মিষ্টি নিয়ে আসব।’
সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লায় ১২ জুলাই রাতে যুবলীগ নেতা অপু বাহিনীর সন্ত্রাসী হামলায় পুলিশের এসআই শাহ আলী গুরুতর আহত হন।

০ ৫ মাসেই বেপরোয়া ওসি
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে , শাল্লার নোয়াগাঁও গ্রামে গেল ১৭ মার্চ হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় থানার সেসময়কার ওসি নাজমুল হককে ৬ এপ্রিল সাময়িক বরখাস্ত করে বরিশাল রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়। এরপর ৭ এপ্রিল বুধবার রাতে শাল্লা থানার ওসি হিসেবে পুলিশ পরিদর্শক নূরে আলম যোগদান করেন। শাল্লা থানায় যোগদানের আগে তিনি সুনামগঞ্জ সদর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত ) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এক সময় ঢাকা মহানগর পুলিশেও (ডিএমপি) দায়িত্ব পালন করা ওসি নূরে আলম ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার বাসিন্দা। গেল ৭ আগস্ট শাল্লা থানায় তার যোগদানের ৫ মাস পূর্ণ হয়েছে। যোগদানের মাত্র ৫ মাসেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন ওসি নূরে আলম।

০ অতিরিক্ত ডিআইজি’র নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি
ওসি নূরে আলমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত করতে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মুহাম্মদ মফিজ উদ্দিন আহমেদ পিপিএম তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সিলেটের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম ) বিপ্লব বিজয় তালুকদারকে প্রধান করে কমিটির অন্য দু’সদস্য হলেন সিলেটের রেঞ্জ ডিআইজি অফিসের পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা ও সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) হায়াতুন্নবী । তদন্ত কমিটি আজকালের মধ্যে শাল্লায় সরেজমিনে যাবেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

০ মিথ্যা প্রতিবেদন না দেয়াই মূল কারণ
অডিও ফাঁস হওয়ার বিষয়টি শুনেছেন জানিয়ে হামলার শিকার এসআই শাহ আলী সিলেটের ডাককে জানান, এমনটি হয়ে থাকলে তা খুবই দুঃখজনক। ওসি নূরে আলমের সঙ্গে বিরোধ ছিল কিনা জানতে চাইলে শাহ আলী বলেন, একটা বিষয়ে মতবিরোধ ছিল। সেটা হলো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কিত গোপনীয় প্রতিবেদন পাঠাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আসে। আমি থানা এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি ও গণজরিপ করে ড. জয়া সেনগুপ্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এবং উপজেলা চেয়ারম্যান আল আমিন চৌধুরীকে দ্বিতীয় অবস্থান দেখিয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করি। কিন্তু ওসি আমাকে আরেক ব্যক্তির নাম সর্বাগ্রে রেখে প্রতিবেদন দিতে বলেন। আমি এমন মিথ্যা প্রতিবেদন দিতে রাজি হইনি। এ নিয়ে তিনি আমার ওপর মনুক্ষুন্ন ছিলেন।

০ ওসি কল রিসিভ করেননি
এ সকল বিষয়ে জানতে চেয়ে শাল্লা থানার ওসি নূরে আলমের সরকারি সেলফোনে (০১৩২০১২০৯৭২) গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪ টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টা পর্যন্ত অন্ততঃ ১২ বার কল দেয়া হয়। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি।