সাম্রাজ্যবাদিতা ও জাতিবিদ্বেষের অভিযোগ!
সাম্রাজ্যবাদিতা ও জাতিবিদ্বেষের অভিযোগ!
‘কারি’ এর স্বকীয় স্বীকৃতির দাবিতে সোচ্চার ব্রিটিশ কারি-গুরু এনাম আলি এমবিই ও বিশ্বের ফুড ব্লগাররা
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি :

রসনাবিলাসে মধুর ব্যঞ্জনা এনে দেয় যে ‘কারি’, তার নাকি সংশ্রব রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার। সে নাকি সাম্রাজ্যবাদি এবং জাতিবিদ্বেষী! বিস্ময়কর হলেও সম্প্রতি অভিযোগটি তুলেছেন শীর্ষস্থানীয় একজন এশীয় ফুড বøগার। যথারীতি খাদ্য রসিকদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে এ নিয়ে। মার্কিন মুল্লুকের কয়েকজন ফুড-ব্লগার তো রীতিমতো দাবি তুলেছেন, সাম্রাজ্যবাদি এবং জাতিবিদ্বেষী হওয়ার অপরাধে ‘কারি’ শব্দটিকেই খাদ্য-অভিধান থেকে বয়কট করা হোক!
চলতি মাসেই এক ভাইরাল ভিডিওতে ক্যালিফোর্নিয়ার খাদ্যরসিক চাহতি বানসাল একটি রেসিপি শেয়ার করার সময় ‘কারি’ শব্দটিকে বাতিল করার ডাক দিয়ে বলেন, ভারতবর্ষে প্রতি ১০০ কিমি পার হলেই যেখানে রসনার স্বাদ বদলে যায়, সেখানে সব ডিশকেই ‘কারি’ আখ্যা না দিয়ে প্রতিটি ডিশের প্রকৃত নামেই তাকে সম্বোধন করা উচিত। এ কথার প্রতিধ্বনি করলেন নিশা বেদি পাওয়ার নামে আরেক ফুড-ব্লগার, যার ফলোয়ার সংখ্যা ৩৮ হাজার।
আচমকা কতিপয় ফুড-ব্লগাররের এ জাতীয় কারি-বিরোধী এ ধরনের অপপ্রচারে রীতিমতো ‘হতাশা’ ব্যক্ত করে ব্রিটিশ কারি অ্যাওয়ার্ডের প্রতিষ্ঠাতা কারি-গুরু এনাম আলি এমবিই বলেন, কারি শব্দটির আদি জন্ম তামিল ভাষায়। ইতিহাসে এর প্রথম উল্লেখ মেলে ১৮ শতকের মাঝামাঝি, যখন দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়–তে বাণিজ্যবেসাতি শুরু করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া ট্রেডিং কোম্পানি। চাহতি বানসাল, ব্রিটিশ কারির ইতিহাস বিষয়ে আদৌ জানেন কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ ব্যক্ত করে এনাম আলি আরো বলেন, চিরকাল পারস্পরিক গ্রহণ-বর্জন আর পুনর্নিমাণের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে খাদ্যসংস্কৃতি। এর জলজ্যান্ত উদাহরণ ব্রিটিশ চিকেন টিক্কা মাসালা। কিংবা ধরা যাক, বালতি ডিশের উদ্ভব হয়েছে বার্মিহামে। এখন সেটির ‘অ্যাংলিসাইজড’ সংস্করণ কিন্তু মিলছে বাংলাদেশি এবং ভারতীয় সব রেস্তোরাঁতেই। এ ধরনের প্রচারণাকে কেবলই ‘সস্তা গিমিক’ হিসেবে অভিহিত করে আলি বলেন, আমার মনে হয় না কোনো খাদ্যরসিক একমত হবেন বানসালির সঙ্গে।
অভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে লন্ডন এসওএস ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. সুবির সিনহা বলেন, অবিশ্বাস্য! তবে সংস্কৃতির ফেরে ভাষা-সমাজে শব্দের অর্থগুলোর রদবদলও ঘটে যেতে পারে এভাবে। ভারতে যে কোনো পশ্চিমা রেস্তোরাঁয় গেলে দেখা যাবে তারা ‘কাটলেট’ কিংবা ‘চপ’ ইত্যাদি নাম ব্যবহার করছে, যদিও ব্রিটেনে সেগুলোর বঞ্জনা একেবারেই ভিন্ন। ব্রিটেনের কুকবুকে ‘কারি’ সদর্পে বিরাজ করছে ১৩-১৪ শতক থেকেই। আমার কাছে এটিকে কখনো ঔপনিবেশিক কিংবা জাতিবিদ্বেষী বলে মনে হয়নি। এটির কারণে কোনো দক্ষিণ ভারতীয় মানুষের অনুভ‚তি আহত হয়েছে, এমনও দেখিনি কখনও।
অবশ্য বানসালির পক্ষে কলম ধরার লোকেরও কমতি নেই খাদ্যব্লগিং নেটওয়ার্কে। স্পাইসি নমস্তে নামের একটি রেস্তোরাঁর মালিক সাইরাস তোড়িওয়ালা মনে করেন, হরেদরে সব ভারতীয় ডিশকে কারি বলাটা অশুদ্ধ। দক্ষিণ এশিয়ায় কারি বলতে যে ‘গভীর অর্থবহ কুজিন’ বোঝানো হয়, এটি তা নয়। সাইরাসের কাছে কারি হচ্ছে সুলভ ও মজাদার একটি খাবার, যাতে অবশ্যই ‘প্রচুর তেল আর ঝালের গুড়া’ থাকতে হবে। ১৯৯০ এর দিকে ব্রিটেনে আসা এ রন্ধনপটিয়সী মনে করেন, ব্রিটিশদের উচিত ভারতীয় খাবারকে ‘ভারতীয় খাবার’ হিসেবেই অভিহিত করা। সবকিছুকেই কারি না বলে শুধু যেটি প্রকৃতই কারি, সেটিকেই কারি হিসেবে অভিহিত করা উচিত। তবে কারির সঙ্গে ঔপনিবেশিকতা বা জাতিবিদ্বেষের আদৌ সংশ্লিষ্টতা আছে বলে বিশ্বাস করেন না তোড়িওয়ালা।
বানাসলির সঙ্গে অংশত ঐকমত্য জানিয়ে ৪০ হাজার ফলোয়ার সমৃদ্ধ ব্রিটিশ ফুড-বøগার চিন্তা প্যাটেল জানান, আমি শব্দটিকে বয়কট করার বিপক্ষে। পাশাাপশি, কোনো খাবার রান্না করার সময় বøগারদেরও উচিত হবে তার উদ্ভাবক সমাজের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান বজায় রাখা। সবকিছুকে একটিমাত্র ছাতার নিচে বন্দী করা নয়, ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যই হোক আমাদের উদযাপনের উপলক্ষ্য।




