তওবা: আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের উপায়

Published: 10 September 2021, 3:40 PM

।। জাফর আহমাদ।।


পাপাচারে পৃথিবী ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। যে দিকেই তাকাই পাপ আর পাপ। মানুষের ব্যক্তি চরিত্র থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক চরিত্র শয়তানের বিস্তৃৃত জালে আটকা পড়েছে। বেহায়াপনা, যিনা-ব্যাভিচার ও ভোগের সাম্রাজ্যে চলছে অত্যধিক মাতলামি। শয়তান তার চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নের নিমিত্তে মানুষের সামনে, পিছনে ডানে ও বাঁয়ে ওঁত পেতে ছিল। তাতে সে অনেকটা সফল হয়েছে। যার ফলে আল্লাহর গযব একটার পর একটা নেমে আসছে ধরিত্রীর সর্বত্র। আল্লাহর এই গযব থেকে বাঁচতে হলে খুব দ্রুতই শয়তানের বেড়াজাল ছিড়ে বেরিযে আসতে হবে। আল্লাহর রহমতের ছায়াতলে ফিরে আসতে হবে। এই ফিরে আসার নামই তাওবা। হতাশার কিছু নেই। অবশ্যই আল্লাহ আমাকে আপনাকে তাঁর রহমতের ছায়াতলে স্থান দিবেন। তিনি বিশাল দয়ার মালিক।
বৈধতার মোড়কে শয়তান অসংখ্য মায়াবী জাল পেঁতে রেখেছে। যে কোন মু’মিন পুরুষ অথবা নারী সর্বপ্রকার সতর্কতা অবলম্বন করা সত্বেও যে কোন সময় শয়তানের পেঁতে রাখা জালে পা রাখা অসম্ভব বা বৈচিত্র কিছু নয়। তাছাড়া আল্ল¬াহ তা’আলা অন্যান্য সৃষ্টির মত যেহেতু মানুষকে তাঁর কঠিণ বন্ধনে আবদ্ব না করে তাকে দান করেছেন স্বাধীন বিবেক। তাই ভাল-মন্দ উভয় করার প্রবণতা তাদের রয়েছে। আল্ল¬াহ তা’আলা বলেন:“মানব আত্মার শফথ, আর সেই সত্তার শফথ, যিনি তাকে সুগঠিত করেছেন। অতপর তার মধ্যে অন্তর্গত করে দিয়েছেন সীমা লংঘনের (ফুজুরের) প্রবণতা আর সীমার অবস্থানের (তাকওয়ার) প্রবণতা। সফল হলো সে ব্যক্তি, যে তার তাকওয়ার প্রবণতাকে বিকশিত ও উন্নত করেছে। আর ধ্বংস হলো সে, যে তার তাকওয়ার প্রবণতাকে দাবিয়ে দিয়েছে।’(সুরা শামস্ ঃ ৭-১০) ভাল ও মন্দ উভয় প্র্বণতাই মানুষের ভেতর অবস্থান করছে। একজন মুমিন-মুসলমান আমৃত্যু অবিরত তাক্ওয়াকেই বিকশিত করতে থাকবে। এর পরও যে মাঝে মধ্যে পা পিছলে যাবে না এর কোন নিশ্চয়তা নেই। কারণ শয়তান তখন আরো ভালো করে তার পিছু নেয়, পদস্খলনও ঘটিয়ে দিতে পারে।
তাই বলে করুণার আধার মহান আল্ল¬াহ রাব্বুল আলামীন ব্যক্তির ফিরে আসার সদর দরজা কি বন্ধ করে দিয়েছেন? কখনো নয়। বরং তিনি তাঁর করুণার সদর দরজা বান্দার জন্য সর্বদা খুঁলে রেখেছেন। ব্যর্থ মনোরথ বান্দা সারা পৃথিবীর কোথাও আশ্রয় না পেয়ে আবার যাতে তাঁর অনুগ্রহের দৃষ্টির সীমানায় চলে আসে, সে জন্য তিনি তাঁর দরবারের করুণার দরজাটি দিনে-রাতে খৃুলে রেখেছেন। ফিরে আসার এ যে কসরত, এর নাম তওবা।
তাওবা শব্দের অর্থ অনুতপ্ত হওয়া, লজ্জিত হওয়া, ফিরে আসা বা প্রত্যাবর্তন করা। পারিভার্ষিক অর্থে তাওবা মানে- ভুল পথে ধাবিত ব্যক্তির হঠাৎ সচকিত হয়ে সম্বিত ফিরে পাওয়া। অনুতপ্ত, অনুশোচনা ও নিজের কৃতকর্মে লজ্জিত হয়ে ভবিষ্যতে ভুলের পূনরাবৃত্তি হবে না এ নিশ্চয়তা প্রদান করে অত্যন্ত খালেছ বা খাঁটি দিলে আল্ল¬াহর দিকে ফিরে আসাকে তাওবা বলা হয়। গোনাহ করার পর তাওবার অর্থ হচ্ছে এই যে, যে দাসটি তার প্রভুর নাফরমান ও অবাধ্য হয়ে প্রভুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সে এখন নিজের কার্যকলাপে অনুতপ্ত। সে প্রভুর আনুগত্য করার ও তাঁর হুকুম মেনে চলার জন্য ফিরে এসেছে। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার দিকে তাওবা করার মানে হচ্ছে এই যে, দাসের ওপর থেকে প্রভুর যে অনুগ্রহ দৃষ্টি সরে গিয়েছিল তা আবার নতুন করে তার প্রতি নিবদ্ব হওয়া। আল্ল¬াহ তা’আলা বলেন: “তবে এ কথা জেনে রাখো, আল্লাহর কাছে তাওবা কবুল হবার অধিকার একমাত্র তারাই লাভ করে যারা অজ্ঞতার কারনে কোন খারাপ কাজ করে বসে এবং তারপর অতিদ্রুত তাওবা করে। এ ধরনের লোকদের প্রতি আল্ল¬াহ আবার তাঁর অনুগ্রহের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন এবং আল্ল¬াহ সমস্ত বিষয়ের খবর রাখেন, তিনি জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ। (সুরা নিসা ঃ ১৭) মহান আল্লাহ তা’আলা এ আয়াতে বলেন: আমার এখানে ক্ষমার দরজা একমাত্র সেই সব বান্দার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে, যারা ইচ্ছা করে নয় বরং অজ্ঞতার কারণে ভুল করে বসে এবং চোখের ওপর থেকে অজ্ঞতার পর্দা সরে গেলে লজ্জিত হয়ে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী হয়। এহেন বান্দা তার ভুল বুঝতে পেরে যখনই প্রভু মহান রাব্বুল আলামীনের দিকে ফিরে আসবে তখনই নিজের জন্য তাঁর দরজা উন্মুক্ত দেখতে পাবে, “ আমার এ দরবারে আশাভংগ হয় না কারো, শতবার ভেঙেছো তাওবা, তবু তুমি ফিরে এসো।”
আল¬াহর এক নাম আত তাওয়্যাব অর্থাৎ তওবা কবুলকারী। এটি আল্ল¬¬াহ তা’আলার আশা ও উৎসাহ দানকারী গুণ। আল কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এ গুণটি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে যারা এখনো পর্যন্ত বিদ্রোহ করে চলেছে অথবা যারা বার বার বিপদগামী হয়ে যায় তারা যেন নিরাশ না হয় বরং এ কথা ভেবে নিজেদের আচরণ পুনর্বিবেচনা করে যে, এখনো যদি তারা এ আচরণ থেকে বিরত হয় তাহলে আল্ল¬¬াহর অনুগ্রহ লাভ করতে পারে। গোনাহ করার পর তাওবার অর্থ হচ্ছে এই যে, যে দাসটি তার প্রভুর নাফরমান ও অবাধ্য হয়ে প্রভুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সে এখন নিজের কার্যকলাপে অনুতপ্ত। সে প্রভুর আনুগত্য করার ও তাঁর হুকুম মেনে চলার জন্য ফিরে এসেছে। আর আল্ল¬¬াহর পক্ষ থেকে বান্দার দিকে তাওবা করার মানে হচ্ছে এই যে, দাসের ওপর থেকে প্রভুর যে অনুগ্রহ দৃষ্টি সরে গিয়েছিল তা আবার নতুন করে তার প্রতি নিবদ্ব হওয়া।
কিন্তু আমাদের দেশে তাওবার ব্যাপারে একটি ভুল ধারনা প্রচলিত আছে। তা হলো: পাপ কাজ হচ্ছে, একটু বয়স হলে বা হজ্জ থেকে এসে তাওবা করে এ কাজ ছেড়ে দিব অথবা একটু বয়স হলে কর্তব্যের কাজটি শুরু করবো। জীবনের এ গ্যারান্টি কোথা থেকে যে তারা পায়, তা আমার বুঝে আসে না। অনেক সময় দেখা গেছে প্রকৃতপক্ষে বয়স হলেও ভাল কাজ করার সুযোগ আর এদের ভাগ্যে জোটে না। মুলতঃ অপরাধ জানার সাথে সাথে তাওবা করতে হবে। বয়স হলে তাওবা করে খারাপ কাজ ছেড়ে দিবেন বা ভাল কাজ শুরু করবেন এ ধরনের প্রভিশন ইসলামে নেই। তাছাড়া ইতিমধ্যে যদি পরকালে চলে যাওয়ার সুযোগ হয়, তবে তো নিজের পায়ে কুড়াল মারলেন। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় আরো পরিলক্ষিত হয় যে, ব্যক্তির মৃত্যুর সময় হয়ত ঘনিয়ে এসেছে আর তখন তাকে ওজু-গোসল দিয়ে একজন হুজুর ডেকে এনে তাওবার ব্যবস্থা করা হয়। এই মহড়া আল্লাহ দেখেন। এই তওবার মহড়া কি আল্লাহ কবুল করবনে? কুরআন হাদীসের দৃষ্টিতেও এটি ঠিক নয়।
যারা আল্ল¬াহকে ভয় না করে সারা জীবন বেপরোয়াভাবে গোনাহ করতে থাকে তারপর ঠিক যখন মৃত্যুর ফেরেশতা সামনে এসে দাঁড়ায় তখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকে, তাদের জন্য তাওবা নেই, তাদের গোনাহের কোন ক্ষমা নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন ঃ “ আল্ল¬াহ ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার তাওবা কবুল করতে থাকেন যতক্ষণ মৃত্যুর আলামত দেখা না দেয়।” কারণ যৌবন ও কৈশোরের মুল্যবান সময় বেহুদা সব কাজে ব্যয় করে এখন এ অসার ও মূল্যহীন জীবনটা আল্লাহর কি প্রয়োজনে আসবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ মানুষটার জীবন-যৌবন ও ধন-দৌলত দান করেছিলেন তাঁর রাস্তায় ব্যয় করার জন্য। কিন্তু সারা জীবন তার এ মূল্যবান জীবন ও ধন-সম্পদ খরচ করে এসেছে আল্লাহর বিরুদ্ধ সব পথে। এখন সে এমন এক স্থানে এসে দাঁড়িয়েছে যেখান থেকে আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পায় না। এখন আর তার প্রভাব প্রতিপত্তি, জান-মাল ও সন্তান-সন্তুতি তাকে আর বাহাদুরীর শক্তি যোগায় না। রঙিন দুনিয়ার শেষ প্রান্তে এসে যখন পরবর্তী জীবনের হাতছানি দেখছে, এখন তার সম্বিত ফিরে এসেছে আর তাই তাওবার হাত আল্লাহর দিকে প্রসারিত করেছে। এ অকর্মণ্য হাত আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। আল্লাহ এ হাত কবুল করবেন না। তাওবা সময় থাকতে করতে হবে। কাজটি খারাপ হচ্ছে, এ কথা জানার সাথে সাথে তাওবা করে তা থেকে স¤পূর্ণভাবে ফিরে আসতে হবে।
কোন ব্যক্তির মৃত্যু হলে তার আত্মীয়-স্বজনেরা কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করে থাকে। লাশ কবরে রাখার সময় নিন্মোক্ত দু’আটি পড়ে থাকে। “বিসমিল্লাহি আলা মিল্লাতে রাসুলিল্ল¬াহ।” অর্থাৎ আল্লাহর নামে রাসুুল সাঃ এর দলে রেখে গেলাম। প্রশ্ন জাগে ব্যক্তি জীবিতাবস্থায় যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দলভুক্ত না হন, তাহলে মুল্যহীন গলিত পচা লাশটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দলে নিয়ে কি করবেন? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো তাঁর দায়িত্বের বোঝা জীবিত লোকের কাছে রেখে গিয়েছিলেন। কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী আসবেন না। এ দায়িত্ব আমাদের জীবিতরাই পালন করতে হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রক্তমাখা ইসলামকে বাদ দিয়ে যারা নিজেদের শ্রম, মেধা ও অর্থ অন্য কোথাও খরচ করে, তারা মুলতঃ ভুল পথে আছে। জেনে বুঝে এ পথে যারা চলতে থাকবে, আল্লাহ তাকে আমৃত্যু এ পথে চলার সুযোগ করে দিবেন। আবার মৃত্যুর পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মরা লাশ গ্রহণ করবেন বলে ধারণা করা একান্তই বোকামী। আত্মীয়-স্বজন যারা কবরে লাশ রাখবেন, তাদেরকে এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের একটি মিথ্যা মিথ্যে কথা এ ভাবে বলবেন না। এটি এক ধরনের প্রতারণার শামিল। সারা জীবন লোকটি রাসুলের দল করে নাই, অথচ মৃত্যুর পর রাসুলের দলে রেখে আসবেন, আপনাদের এ কর্মটিও রাসুল পছন্দ করবেন না অবশ্যই। তাই সময় থাকতে সকলেই সঠিক পথে ফিরে আসুন। তাওবা করুন। যে কয়টি বর্ষ জীবন থেকে ঝরে গেছে, তার জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হোন। কুরআন ও হাদীসের আলোকে জীবনের সঠিক লক্ষ্য ঠিক করে, তাতে চলার চেষ্টা করুন। আল্ল¬াহ মাফ করে দিবেন ইনশা’আল্ল¬াহ।

  • 78
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    78
    Shares