সুদ সামাজিক বন্ধনকে বিনষ্ট করে

Published: 14 September 2021, 4:59 PM

।। জাফর আহমাদ ।।


সুদ সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ বিনষ্ট করে। সুদ স্বার্থপরতা সৃষ্টি করে। স্বার্থপরতা সমাজের প্রতিটি সদস্যদেরকে এতটাই অন্ধ করে তুলে যে, কেউ কারোর চরম বিপদে সাহায্যের হাত বাড়ায় না। এমন কি নিজের আপন লোকদেরকেও নয়। নিজের স্বার্থপরতার মাত্রা এতটুকু বৃদ্ধি পায় যে, সে তখন পৃথিবীর কোন কিছুই পরোয়া করে না। তার সুদখোরীর কারণে এক পর্যায়ে মানবিক প্রেম-প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও সহানুভুতির মাত্রা শূন্যের কোটায় নেমে আসে। তখন সে তার নিজের লোককেও চরম বিপদের সময়ে বিনা সুদে ধার দিতে কুন্ঠাবোধ করে। সুদ তাকে এতটুকু অন্ধ করে তুলে যে, জাতীয় সামষ্টিক কল্যাণের ওপর কোন ধ্বংসকর প্রভাব পড়লো এবং কত লোক দুরবস্থার স্বীকার হলো এসব বিষয়ে তার কোন মাথা ব্যথাই থাকে না। এ ব্যক্তি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:-“যারা সুদ খায় তাদের অবস্থা হয় ঠিক সেই লোকটির মত যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। তাদের এ অবস্থায় উপনীত হওয়ার কারন হচ্ছে এই যে, তারা বলেঃ ’ব্যবসা তো সুদের মতই’। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করে দিয়েছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।”(সুরা বাকারা-২৭৫)

লোন, ঋণ,ধার ও কর্জ একই অর্থবোধক বিভিন্ন ভাষার শব্দ। লোন ইংরেজী, ঋণ বা ধার বাংলা ও কর্জ আরবী ভাষার শব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে শব্দগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ভাবার্থ সৃষ্টি করা হয়েছে। কর্জ তার প্রকৃত বা স্ব-ভাবার্থ নিয়ে অটুট আছে। অর্থাৎ সময়ের ব্যবধানে কাউকে কোন কিছু কর্জ দেয়ার পর ঠিক ততটুকুই কোন প্রকার কমবেশ না করে আবার ফেরত নেয়া বা দেয়ার নাম কর্জ।

কিন্তু লোন ও ঋণ শব্দের ভাবার্থকে পরিবর্তন করা হয়েছে। আসলের সাথে অতিরিক্ত কিছু যোগ করে আদায় করা বা পরিশোধ করার নাম করা হয়েছে লোন ও ঋণ। ইসলামের দৃষ্টিতে এটিই সুদ। প্রকৃতপক্ষে লোন ও ঋণ কর্জের মতই। অর্থাৎ কোন প্রকার অতিরিক্ত ছাড়াই শুধু আসল পাওয়ার জন্য এই শব্দদ্বয়ের সৃষ্টি। কিন্তু সুবিধাবাদী লোকেরা প্রকৃত অর্থ পরিবর্তন করে নিজেদের শোষনের হাতিয়ারের ভাবার্থে ব্যবহার করছে। লোন, ঋণ বা ধার ও কর্জ হলো, দুটি পক্ষ বা ব্যক্তির মধ্যে এমন লেনদেন সংগঠিত হওয়া যাতে এমন শর্ত থাকে যে, ঋণ বা কর্জ হিসাবে যে পরিমান অর্থ বা দ্রব্য দেয়া হবে, ঠিক সেই পরিমান অর্থ বা দ্রব্য ঋণ গ্রহীতা ঋণদাতাকে নিদির্ষ্ট সময়ে ফেরত দিবে। আল কুরআন এটিকে কল্যাণকর বা উত্তম ঋণ হিসাবে অভিহিত করেছে। যেমন: আল্ল¬াহ তা’আলা বলেন:-“তোমরা আল্ল¬াহকে উত্তম ঋণ দিতে থাক। যা কিছু ভালো ও কল্যাণ তোমরা নিজেদের জন্য অগ্রীম পাঠাবে, তা আল্ল¬াহর নিকট সঞ্চিত ও মওজুদরূপে পাবে। এটি অতীব উত্তম। আর এর শুভ প্রতিফলও খুব বড়।” (সুরা মুয্যাম্মিল ঃ ২০)
কাজেই ঋণ বা লোন কোন খারাপ জিনিষ নয় বা নিষিদ্ব কোন লেনদেনও নয় যতক্ষণ এ গুলো তার প্রকৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এ কল্যাণকর ও উত্তম ঋণের সাথে যখন অতিরিক্ত কিছু যোগ করা হয় তখন তা অকল্যাণকর ও হারাম ঋণে পরিণত করেছে। প্রচলিত ব্যাংকগুলো এ অতিরিক্ত অংশকে সুদ বলে থাকে। অর্থাৎ প্রদত্ত ঋণের উপড় শর্ত হিসাবে অতিরিক্ত কিছু আদায় করা হলে তাকে সুদ বলা হয়।

সমপরিমান ফেরত দেয়ার শর্তে কাউকে নির্র্ধারিত সময়ের জন্য কোন কিছু ব্যবহার করতে দেয়ার নাম ঋণ, ধার, কর্জ ও লোন। আর এ ঋণ তখনই উত্তম ঋণে পরিণত হবে যখন খালেছ নিয়তে কোনরূপ ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়াই একমাত্র আল্ল¬াহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দেয়া হবে। যাতে কোনরূপ রিয়াকারিতা-দেখানোপনা ও সুনাম-সুখ্যাতি অর্জন করার উদ্দেশ্য শামিল থাকতে পারবেনা। এটি দিয়ে কারও উপর অনুগ্রহ দেখানো হবেনা বা যাবে না। যেমন আল্ল¬াহ রাব্বুল আলামীন বলেন“ (আর আল্লাহ তাদেরকে মহব্বত করেন না) যারা শুধু লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে থাকে আর আল্ল¬াহ এবং পরকালের প্রতি ঈমান রাখে না। শয়তান তাদের সাথী, তার ভাগ্যে খুব বড় দুষ্টু বন্ধুই মিলেছে।”(সুরা নিসা ঃ ৩৮) এ ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলার আরো বাণী “ হে ঈমানদারগণ! নিজেদের দানকৃত ধন-সম্পদ ও অনুগ্রহের কথা উল্লে¬খ করে আর দুঃখ-কষ্ট দিয়ে ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের ন্যায় তোমাদের দানকে নষ্ট করোনা যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে থাকে।”(সুরা বাকারা ঃ ২৬৪)

আল্ল¬াহকে ছাড়া অন্য কারো নিকট হতে কোনরূপ প্রতিফল পাওয়ার বা অন্য কারো সন্তোষ লাভ করার কোন ইচ্ছাই তার থাকবে না। এরূপ ঋণ দান প্রসংগে আল্ল¬াহ তা’আলার দু’টি ওয়াদা রয়েছে। একটি হলো, তিনি এটি কয়েকগুণ বেশী করে ফিরিয়ে দিবেন। আর দ্বিতীয়টি হলো, তিনি সে জন্যে নিজের তরফ থেকে অতীব উত্তম প্রতিফলও দান করবেন। যেমন: আল্ল¬াহ রাব্বুল আলামীন বলেন, “এমন কে আছে যে আল্ল¬াহ তা’আলাকে ঋণ দেবে, উত্তম ঋণ ? যেন আল্লাহ এটি কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে ফিরিয়ে দিতে পারেন এবং তার জন্য অতীব উত্তম সওয়াব রয়েছে।”(সুরা আল-হাদীদঃ১১)

লোন,ঋণ,ধার ও কর্জ শব্দগুলো সৃষ্টিই হয়েছে সমপরিমান লেনদেন বুঝানোর জন্য। আরবী, বাংলা ও ইংলিশ অভিধানে শব্দগুলোর তা-ই করা হয়েছে। অতএব, প্রচলিত ব্যাংকগুলো এ পবিত্র ও কল্যাণকর শব্দগুলোকে তাদের ব্যাংকের সুদী লেনদেনে ব্যবহার না করে অন্য কোন শব্দ ব্যবহার করলে করতে পারে। কিন্তু উল্লেখিত শব্দগুলো করা সম্পুর্ণভাবে ভুল ও অনৈতিক। আজো আমাদের সমাজের মানুষ কর্জ বলতে বুঝে কারো আপদ বিপদে সুখে দু:খে একমাত্র তার উপকারের নিমিত্তেই কোন কিছু কর্জ দেয়া। আমাদের মা বোনেরা সামান্য লবণ থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস প্রতিবেশীর কাজ থেকে ধার বা কর্জ নেয় এবং যে বান্ডল বা যে পরিমান গ্রহণ করে, ঠিক সে পরিমানই ফেরৎ দেয়। ঋণ বা কর্জ এ গুলোর প্রচলনই হয়েছে প্রতিবেশী প্রতিবেশীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, প্রেম-প্রীতি ও ভালবাসার বন্ধনকে সূদৃঢ় করার জন্য।

ইসলামের বিধান হচ্ছে পৃথিবীর সকল সম্পদের একছত্র মালিক আল্ল¬াহ্ তা’আলা। পৃথিবীর মানুষ এর ট্রাষ্ট্রি মাত্র। কাজেই আল্লাহ তা’আলার এ সম্পদ হতে মানুষ সমান ভাবে উপকৃত হবে। ইসলামের জন্ম পূজিঁবাদ বা সমাজতন্ত্র এর প্রতিক্রিয়ায় হয়নি। বরং ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজের স্বার্থকে এক সাথে দেখে। এক দিকে ব্যক্তিকে তার সমৃদ্ধির উৎসাহ দেয়, অন্য দিকে ব্যক্তি সমাজের অংশ হিসাবে সমাজের অন্যান্যদের সুখ ও সমৃদ্ধি সাধনের দায়িত্ব অর্পন করেছে। আর এটিই ভ্রার্তৃত্ববোধ।

একটি সুস্থ সমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, ভ্রার্তৃত্ববোধ। এটি ছাড়া কখনো একটি সুস্থ্য-সুশীল সমাজ গঠিত হতে পারে না। আর ইসলামই একমাত্র এ ভ্রার্তৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে যতোপযুক্ত কর্মসুচী দিয়েছে। মুসলমানদের আল্লাহর পথে দান করার সাধারণ নির্দেশ দিয়ে তাদের অর্থসম্পদে সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের অধিকার কায়েম করেছে। এর অর্থ হচ্ছে মুসলমানকে দানশীল, উদার হৃদয়, সহানুভূতিশীল ও মানব-দরদী হতে হবে। স্বার্থসিদ্ধির প্রবণতা পরিহার করে নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে প্রতিটি সৎকাজে এবং ইসলাম ও সমাজের বিভিন্ন প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য ব্যয় করতে হবে। ইসলাম শিক্ষা ও অনুশীলন এবং ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার সামষ্টিক পরিবেশ কায়েমের মাধ্যমে প্রতিটি মুসলমানের মধ্যে এ নৈতিক বল সৃষ্টি করতে চায়। এ ভাবে কোন প্রকার বল প্রয়োগ ছাড়াই হৃদয়ের ঐকান্তিক ইচ্ছায় মানুষ সমাজ কল্যাণে সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করবে। ইসলামী সমাজে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পরস্পরকে ঋণ দেয়া অপরিহার্য কর্তব্যরূপে চিহ্নিত হবে। এ ধরনের কর্তব্যবোধ একটি সমাজের সুস্থাতার পরিচায়ক। যদি কোন সমাজে এর অনুপস্থিতি পরিলক্ষিত হয় তবে বুঝতে হবে সেখানকার পরিবেশ বিকৃত হয়ে গেছে এবং সেখানকার অধিবাসীদের বিশ্বাস ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ইবাদাতগুলোর মধ্যে শিথিলতা দেখা দিয়েছে। মুসলমানকে দানশীল, উদার হৃদয়, সহানুভূতিশীল, মানব-দরদী ও পারস্পরিক কল্যাণকামী হিসাবে গড়ে তোলার জন্য তাওহীদ ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ইবাদাত গুলো সামষ্টিক ভাবে কাজ করে থাকে।

কিন্তু এ বন্ধনকে ছিন্ন করার জন্য সৃষ্টি হয়েছে সুদ নামক এ জঘন্য প্রথার। যে সমাজে এ মরন ব্যাধি সুদ প্রচলিত, সে সমাজের বাহ্যিক রূপ দেখে যতই সুস্থ্য ও সমৃদ্ধশলী মনে হোক না কেন, ভেতরে ভেতরে কাঠ কীট কুড়ে কড়ে সে সমাজটিকে তোষ করে দিচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের আধুনিক রাষ্ট্রগুলো তার সাক্ষী। সে সব সমাজের মানুষ গুলোর সামাজিক বন্ধন খু^ব্ নড়োবড়ে। এর প্রধান কারণ হলো সুদ। সুদখোর ব্যক্তি অর্থের পিছনে পাগলের মতো ছুটে ভারসাম্যহীন ব্যক্তিতে পরিণত হয়।

আধুনিক ব্যাংকের মাধ্যমে এমন অনেক কল্যাণমুলক কাজ সংগঠিত হয়ে থাকে যা অন্য কোন মাধ্যমে সম্ভব নয়। কিন্তু এ সব কল্যাণ ও সুফল বিশ্বমানবতার জন্য অকল্যাণ, অন্যায়, অনিষ্ট ও বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে যে বস্তুটি তা হচ্ছে সুদ। তাই সুদের অনিবার্য ধ্বংস থেকে বিশ্বমানবতাকে উদ্ধার করার জন্য ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই তা পরিহার করতে হবে। এ জন্য তাদেরকে ইসলামের আলোকে ব্যাংকিং পরিচালনা করতে হবে। ইসলামের কাছে কল্যাণমুখী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। পৃথিবীর দেশে দেশে ইসলামী ব্যাংকিং এর সফলতাই এর উদাহরণ।

  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5
    Shares