পুনঃসংস্কার শেষে উদ্বোধন হলো লন্ডনের ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সেন্টার’

Published: 21 December 2021

পোস্ট ডেস্ক :


সময়মত যত্ন ও পরিচর্যার অভাবে বিলাতের বাঙালিদের যে গৌরব ও অহংকারের স্থাপনা প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছিলো, সেই বাংলাদেশ সেন্টার লন্ডন আবার কমিউনিটির ভালোবাসায় প্রায় এক দশকের বিরামহীন কর্মযজ্ঞ, ঘাম-শ্রম-অর্থের বিনিয়োগে আবার আগের জৌলুসে ফিরলো। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা তুলে যে স্থাপনা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলো, সেই স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির মাহেন্দ্রক্ষণেই ফের নবরূপে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ সেন্টার ব্রিটেনের বাঙালি কমিউনিটির মর্যাদাকে আরো বাড়িয়ে দিলো।


গত ১৯ ডিসেম্বর সেন্টারের মূল হলরুমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্কারকৃত ভবনটির দ্বারোদঘাটন করা হয়। বাংলাদেশ সেন্টারের সদস্যবৃন্দ এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে মুখোরিত ছিলো এই জমজমাট আয়োজন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ কাউন্সিলের সঙ্গে মামলা মোকাবেলা, বিশাল অর্থের সংস্থান এবং সংস্কারকাজের বিরাট ঝক্কি সামাল দিয়ে গত প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ সেন্টারের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে দায়িত্ব পালনকারী নেতৃবৃন্দ এক অসাধ্য সাধন করেছেন বলে প্রশংসা করেন অতিথিরা।


বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে লন্ডনের ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সেন্টার’। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে বৈশ্বিক জনমত গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন যুক্তরাজ্য প্রবাসীরা। তখন যুক্তরাজ্য প্রবাসীরাই স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে বৈশ্বিক সমন্বয়কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন ‘বাংলাদেশ সেন্টার’। এই সেন্টারেই ভারতের পর বহিঃর্বিশ্বে বাংলাদেশের প্রথম কোনো দূতাবাস চালু হয়। দ্য রয়্যাল লন্ডন বারা অব কেনজিংটন অ্যান্ড চেলসি এলাকার নটিংহিল গেইট টিউব স্টেশনের কাছেই ২৪ পেমব্রিজ গার্ডেন্সে অবস্থিত ঐতিহাসিক বাংলাদেশ সেন্টার।


যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনীম যিনি পদাধিকার বলে ‘বাংলাদেশ সেন্টার’ এর সভাপতি, ১৯ ডিসেম্বর স্বাধীনতার অনুষ্ঠান শুরুর আগে তিনি ফিতা কেটে বাংলাদেশ সেন্টারের প্রবেশদ্বার পুণরায় খুলে দেন।

অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনীম জানান, হেরিটেজ বিল্ডিং হিসেবে বাংলাদেশ সেন্টারের জন্য ব্লু প্ল্যাকের আবেদন করা হয়েছে। সেটি শিঘ্রই আসবে। আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সঙ্গে এই সেন্টারের যে অবদান তার স্বীকৃতির জন্য তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে লিখবেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেন্টার ‘ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার’ খ্যাতি পাওয়ার যোগ্য। বাংলাদেশ সেন্টারের নতুন উদ্যমে পথচলায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সাইদা মুনা তাসনীম বলেন, এই সেন্টার নিজের ঐতিহ্য ধরে রাখুক। অতীতে বাংলাদেশি কমিউনিটির সেবায় সেসব কাজ করেছে সেগুলো অব্যাহত রাখুক। সেন্টারটি যেন সকল প্রবাসীর সেন্টার হিসেবে টিকে থাকে।
আলোচনাপর্ব সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ সেন্টারের সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন। স্বাগত বক্তব্যে তিনি সেন্টারের প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার সাথে যুক্ত সকলকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ভবনের সংস্কার কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। কেবল স্বাধীনতা সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের লক্ষ্যে বেশ পরিশ্রম করে ভবনের নিচতলার কাজ শেষ করা হয়েছে।


স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সেন্টারে যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশিদের জন্য নানা সেবা চালু ছিলো। যেমন, বাংলা শিক্ষা ও বাংলা সংস্কৃতি চর্চা, অনুবাদ সেবা, অভিবাসন, বেনিফিট, পুলিশ ও আইনী বিষয়ে সহায়তা। আবার বাংলাদেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা নামমাত্র খরচ দিয়ে আপতকালীন এই সেন্টারে অবস্থানের সুযোগ পেতেন। কিন্তু সংস্কারের অভাবে সেন্টারটি এক সময় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। যে কারণে স্থানীয় কাউন্সিল এটি নিজেদের দখলে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো। বিষয়টি এক পর্যায়ে মামলায়ও গড়ায়। কিন্তু সেন্টারের ম্যানেজমেন্ট কমিটির ঐকান্তিক চেষ্টায় রক্ষা পায় বাংলাদেশ সেন্টার। তারা জ্যাকফ্রুট লন্ডন লিমিটেড কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে সেন্টারটি সংস্কারে উদ্যোগ নেন। চুক্তি অনুযয়ী সংস্কারের পুরো খরচ বহন করবে ওই কোম্পানি। বিনিময়ে তারা সেন্টারের ওপরের তিনটি ফ্লোর লিজ হিসেবে ব্যবহার করবে। তবে সেন্টারকে নির্ধারিত হারে মাসিক ভাড়াও প্রদান করবে।
অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে কিভাবে বাঙালির এই স্মারক স্থাপনা বাংলাদেশ সেন্টারকে কমিউনিটির হাতছাড়া হওয়া থেকে রক্ষা করা হয়েছে, সেই ইতিহাসের কিছুটা তুলে ধরেন এই বিশাল কর্মযজ্ঞে নেতৃত্ব প্রদানকারী, সেন্টারের বিল্ডিং কমিটির কনভেনর ও ম্যানেজমেন্ট কমিটির সহ সভাপতি মুহিবুর রহমান মুহিব। তিনি বলেন, “২০০৮ সালের দিকে এই বাংলাদেশ সেন্টার ভীষণভাবে সমস্যার মুখোমুখি হয়। তখন মুরব্বিরা আমাকে ডেকে এনে বলেন যে আমাদের ২৫/৩০ হাজার পাউন্ডের দরকার। তখন সেক্রেটারীর দায়িত্বে ছিলেন মুজিব সাহেব (মোঃ মুজিবুর রহমান)। তখন আমি ২৫ জন মেম্বার এনেছিলাম ১ হাজার পাউন্ড করে। ঐ সময় এভাবে সেন্টারটি কোনমতে রক্ষা পায়। এরপরে ২০১২ সালে মুজিব ভাই আমাকে কমিটিতে আসতে বললেন এবং বিল্ডিংয়ের দায়িত্বটা দেন আমাকে।”
বিল্ডিং কমিটির আহ্বায়াক জনাব মুহিব আরো বলেন, “আমি যখন এই বিল্ডিংয়ের দায়িত্ব নেই, তখন কোর্টে মামলা চলছিলো। আদালত আমাদের জরিমানাও করে। তখন কোর্ট এই জরিমানা কে দেবে তার গ্যারান্টি চাইলে আমিরুল ভাই (আমিরুল ইসলাম চৌধুরী, পরিচালক জ্যাকফ্রুট লন্ডন লিমিটেড) গ্র্যান্টার হোন। (প্রতিষ্ঠানটি রক্ষা করার স্বার্থে) ঐ সময় আমরা একটি বিল্ডিং কমিটি করি। ঐ কমিটিতে ছিলাম আমি, তৎকালীন সেক্রেটারী মুজিবুর রহমান, ফাইন্যান্স সব-কমিটির এ কে এম ফজলুল হক, তৎকালীন জয়েন্ট সেক্রেটারী আব্দুল হাই, চিফ ট্রেজারার সিরাজুল ইসলাম, জয়েন্ট ট্রেজারার মাসুক আহমদ। আমরা অনেক মিটিং করেছি। আমিরুল ভাই কমিউনিটিকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যেই সংস্কার কাজ করে দিতে উদ্যোগী হন। কাজ শুরুও করেন। আমরা এই কাজের জন্য একটা লোনেরও ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু কোন কারণে কমিটির সবাই একমত না হওয়ায় সেই লোন আর আনা হয়নি। পরবর্তীতে বিল্ডিং কমিটি আমিরুল ভাইকে লিজ দেয়। সেন্টারের জন্য সর্বোচ্চ ভালোটা নিশ্চিত করতে আমরা প্রানপন চেষ্ঠা করে যাচ্ছি। আগের কমিটি শুরু করেছিলো বিশাল এই কর্মযজ্ঞ এবং বর্তমান কমিটির সার্বিক তত্বাবধানেই আজকের এই পর্যায়ে আমরা আসতে পেরেছি। আজ আমি নিজে খুবই গর্বিত যে বিল্ডিং কমিটির কনভেনর হিসেবে আমার নেতৃত্বে এবং এই (বর্তমান) কমিটি নিয়ে আজ আপনাদেরকে আমরা এই হল উপহার দিতে পেরেছি। আপনারা যদি এই হল এবং উপরের কাজ দেখেন খুব খুশি হবেন। আপনারাও গর্ব বোধ করবেন।”

 

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সেন্টারের সহ সভাপতি সহ সভাপতি শাহানুর খান, ভাইস চেয়ারম্যান কবির উদ্দিন, মানিক মিয়া, গুলনাহার খান, সেন্টারের প্রধান উপদেষ্টা নবাব উদ্দিন, চীফ ট্রেজারার মামুন রশীদ, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের স্পীকার কাউন্সিলর মোহাম্মদ আহবাব হোসেন, স্থানীয় কাউন্সিলর ডোরি স্কেমেটারলিং, শতবর্ষী ব্যক্তিত্ব দবিরুল ইসলাম চৌধুরী ওবিই, দ্য রয়্যাল বারা অব উইনসরের কাউন্সিলার সামসুল ইসলাম সেলিম, কমিউনিটি নেতা হেলাল উদ্দিন আব্বাস, মারুফ চৌধুরী, টিভি ব্যক্তিত্ব ডাঃ জাকি রেজওয়ানা আনোয়ার, এশিয়ান ক্যাটারিং ফেডারেশনের চেয়ারম্যান ইয়াউর খান, বাংলাদেশ সেন্টারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মুজিবুর রহমান, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জুবায়ের, জ্যাকফ্রুট লন্ডন লিমিটেডের পরিচালক আমিরুল চৌধুরী ও আতিক চৌধুরী, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এভারাডের পরিচালক জুনায়েদ চৌধুরী, ডঃ সানোয়ার চৌধুরী, আবদুল মতিন ও তফজ্জুল মিয়া। সভার শুরুতে সূচনা বক্তব্য দেন সেন্টারের প্রধান নির্বাহী এস এম মুস্তাফিজুর রহমান।
সকল বক্তা বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীর শুভেচ্ছা জানান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ সকল মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। বাংলাদেশ সেন্টার তার ঐতিহ্য ধরে রেখে আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিলো সাংস্কৃতিক আয়োজন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেন মিসবাহ জামাল। এতে সংঙ্গীত পরিবেশন করেন গৌরী চৌধুরী ও নাজমুন নাহার তন্নী।