বিমান ভাড়া কমাতে সিলেটে আইনী পদক্ষেপ
বিশেষ সংবাদদাতা :

করোনা মহামারির ধকল কাটিয়ে যখন দেশ থেকে বিদেশে কর্মী যাওয়া শুরু করেছেন, তখনই তাঁদের দ্বিগুণ বিমানভাড়া গুনতে হচ্ছে। নভেম্বর পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিমানের টিকিটের দাম ছিল ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। এখন তা ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। এতে সিলেটের বিদেশ গমনেচ্ছু অন্তত ২০ হাজার প্রবাসীর হাঁসফাঁস অবস্থা। পড়েছেন চরম বেকায়দায়।
সিলেটের প্রবাসে গমনেচ্ছু ভুক্তভোগী এমন ৮জনের পক্ষ থেকে বিমানভাড়া হাতের নাগালে রাখার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ৬টি দপ্তরে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এছাড়া অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অস্বাভাবিক বিমানভাড়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কেন যথার্থ ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা নোটিশ পাওয়ার সাতদিনের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে। অন্যথায় উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবেন তারা।
মঙ্গলবার (২৮ ডিসেম্বর) সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ওই আট ব্যক্তির পক্ষে আইনজীবী শিশির মনির এ নোটিশ পাঠান। বিষয়টি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিশ্চিত করেছেন আইনজীবী শিশির মনির।
তিনি বলেন- বিদেশে গমনেচ্ছু ওই ৮জনের পক্ষ থেকে প্রবাসী কল্যাণ সচিব, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সভাপতি বরাবরে এ নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায় বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেতে বিমান ভাড়া অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। সংবাদে দেখা যাচ্ছে ‘বিমান ভাড়া বেড়েছে ৪ গুণ’। ঢাকা থেকে দুইবায়ের পূর্বের বিমান ভাড়া ৩০ হাজার টাকা হলেও এখন তা ৯০ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। ঢাকা থেকে সৌদিআরব রুটের ৪৫ হাজার টাকার বিমান টিকেট এখন এক লাখ টাকাতেও পাওয়া যাচ্ছে না।
নোটিশে আরও উল্লেখ- বাংলাদেশ বিমানে ভ্রমণকারী যাত্রীদের করা একাধিক ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে। সেগুলোতে দেখা যায়, টিকেটের সংকট থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ফ্লাইটে বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা যাচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, টিকেট সিন্ডিকেটের কারণে বাংলাদেশ বিমান ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। টিকেট কারসাজির মাধ্যমে উচ্চ টিকেট মূল্যের কারণে একদিকে প্রবাসী শ্রমিকরা তাদের কর্মস্থলে যেতে পারছেন না, অপরদিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ব বিমান সংস্থা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
টিকেটের উচ্চমূল্যের কারণে শ্রমিকদের বিদেশ যাওয়া নিয়ে নোটিশে বলা হয়, অনেক শ্রমিক তাদের কর্মস্থলে যেতে পারছেন না এবং দেশ বঞ্চিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা থেকে। বিষয়টি নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজমান।
উল্লেখ্য, দুবাই ও আবুধাবি রুটে আগে ভাড়া ছিল প্রায় ৪০ হাজার টাকা। বর্তমানে এয়ারলাইনসগুলো ভাড়া বাড়িয়ে প্রায় হাজার টাকা করেছে। মাস্কাট রুটের ভাড়া ৩৫ হাজার টাকা থেকে ৭২ হাজার টাকা এবং সৌদি আরবের ভাড়া ৪২ হাজার টাকা থেকে প্রায় ১ লাখ টাকা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়া, বুস্টার ডোজ ছাড়া ফেব্রুয়ারি থেকে সৌদি আরবে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, ভিসা অনুমোদন বৃদ্ধিসহ কয়েকটি কারণে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য রুটে যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। ফের ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই আগেভাগে ফিরতে চাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যে। আর এই সুযোগে মধ্যপ্রাচ্যগামী এয়ারলাইন্সগুলো ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। মধ্যপ্রাচ্যগামী এয়ারলাইন্সগুলো সিন্ডিকেট করে যাত্রীদের জিম্মি করে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। চাহিদার তুলনায় ফ্লাইট কম থাকায় এয়ারলাইনসগুলো ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে সৌদি আরবের এয়ারটিকিটের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবাসী ছাড়াও বিপাকে পড়েছেন ওমরাহ যাত্রীরা। অনেকেই ওমরাহে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেও এয়ারটিকিটের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় সৌদি আরব যেতে পারছেন না।
আটাব নেতারা জানান, বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। কিন্তু বর্তমানে এয়ারলাইনসগুলো প্রতিদিন ৩ হাজারের বেশি যাত্রী বহন করতে পারছে না। ফলে ২ হাজার যাত্রীর টিকিটের সংকট লেগেই আছে। এই অবস্থায় টিকিট সংকট নিরসনে সম্প্রতি আটাবের পক্ষ থেকে চারটি প্রস্তাব দিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
আটাব সিলেট জোনের সাবেক সভাপতি আবদুল জব্বার জলিল বলেন, ‘হঠাৎ করে গত এক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে এয়ারলাইনসের ভাড়া অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এয়ারলাইনসগুলোর সিন্ডিকেট। অটোমেশন পদ্ধতিতে টিকিট বিক্রি করা গেলে এই সংকট দূর করা যাবে।’
হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব জহিরুল কবির চৌধুরী শীরু বলেন, ‘ওমিক্রনের সংক্রমণ ও ভিসা অনুমোদন বৃদ্ধির কারণে দেশের মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। এই সুযোগে এয়ারলাইনসগুলো সিন্ডিকেট করে ভাড়া বৃদ্ধি করেছে। প্রতিদিন আমাদের কাছে অসংখ্য মানুষ আসছেন টিকিটের জন্য। অতিরিক্ত দাম দিয়েও টিকিট সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’




