ইবাদতকে নিয়ে সরগরম বড়লেখা

Published: 7 January 2022

বড়লেখা প্রতিনিধি :


১৪ই মার্চ ২০১৬। পর্দা নামে চার মাস ধরে চলা পেসার হান্ট কর্মসূচির। আলোকোজ্জ্বল মঞ্চ। সেদিন পুরস্কার উঠেছিল মুজিবর রহমান, সুলতান হোসেন এবং ইবাদত হোসেন চৌধুরীর হাতে। তাদের মধ্যে দুইজনের আজ খোঁজ নেই ক্রিকেটাঙ্গনে। কিন্তু ইবাদত হোসেন। টাইগার ক্রিকেটে ইতিহাস বদলে দেয়ার নায়ক। বড়লেখা থেকে মাউন্ট মঙ্গানুই।

ভলিবল থেকে ক্রিকেট। ভ্রমণটা সহজ ছিল না।

২০১৯-এ টেস্ট ক্রিকেটে তার অভিষেক নিউজিল্যান্ডের মাটিতেই। জাতীয় দলে তার ক্যারিয়ারের শুরুটা ছন্দময় ছিল না। তবে ত্যাগ-তিতিক্ষা আর ধৈর্য ২৭ বছর বয়সী এই পেসারকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের মঞ্চে। হবেই না কেন! তিনি যে এক সত্যিকারের সৈনিক। যে কিনা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল একজন ভলিবল খেলোয়াড় হিসেবে। কিন্তু তার মনপ্রাণ জুড়ে ছিল ক্রিকেট। তাই বাহিনী থেকে ছুটি নিয়ে চলে আসে পেসারের হান্টে। যা তাকে নিয়ে গেছে তার স্বপ্নের দুনিয়াতে। শুধু কি তাই- ‘এয়ারম্যান’ ইবাদত এখন তার বাহিনীর প্রতীক হয়ে গেছেন। শুরুতেই ব্যাটসম্যানকে আউট করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন সৈনিকের মতো স্যালুট করে। অবশ্য তার সে কৃতিত্বে এখন গোটা দেশই তাকে উল্টো স্যালুট ঠুকছে। গতকাল বাংলাদেশ দলের ইতিহাস গড়ার নায়করা পৌঁছেছেন ক্রাইস্টচার্চে। দ্বিতীয় টেস্টে মাঠে নামার আগে তাদের সামনে আজ আরেকটি উৎসবের উপলক্ষ হতে পারে ম্যাচজয়ী নায়কের জন্মদিন। হ্যাঁ, ১৯৯৪’র ৮ই জানুয়ারি তার জন্ম হয়েছিল মৌলভীবাজারের বড়লেখায়।
অথচ নিউজিল্যান্ড সফরের টেস্ট দলে ইবাদতের জায়গা পাওয়ায় আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। তার কারণেই একাদশের বাইরে রাখা হয় সুইংয়ে পারদর্শী আবু জায়েদ রাহীকে। অথচ বল হাতেই সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিলেন। এক টেস্টে তার বোলিংয়ে বদলে যায় ব্ল্যাকক্যাপসদের মাটিতে বাংলাদেশের পরাজয়ের ইতিহাস। অথচ মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নামার আগে ১৩৭.৪ স্ট্রাইক রেট, ৮১.৫৪ গড় ও ৩.৫৫ ইকোনমির কোনো বোলারকে টেস্ট ক্রিকেটে ভয়ানক বলা যায় না। কিন্তু ম্যাচ শেষে তিনি কিউইদের জন্য বিভীষিকাময় নাম। শুধু কি তাই- এই মাঠে সেরা বোলিংয়ের নজিরও গড়েছেন তিনি। তার আগে এই মাঠে ইনিংসে ৫ উইকেট ছিল শুধু নেইল ওয়াগনারের। ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৪ রানে ৫ উইকেট শিকার করেছিলেন ওয়াগনার। এই ম্যাচে তাকে ম্লান করে সেরা হয়েছেন ইবাদত।

মৌলভীবাজার থেকে উঠে আসা এই পেসারের জীবন দারুণ বৈচিত্র্যে ভরা। মজার ব্যাপার হলো তার নিজ শহরের এক ক্রিকেট কোচ তাকে নিজেদের ছেলে মানতেই নারাজ। তার অবশ্য কারণও আছে, জন্ম সিলেটে হলেও তিনি পেসার হান্টে নিজের নাম নিবন্ধন করিয়েছিলেন ফরিদপুর থেকে। এমনই নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ৩রা মার্চ ২০১৯-এ তার টেস্ট অভিষেক হয় নিউজিল্যান্ডের হ্যামিল্টনে। দুই টেস্ট খেলে নিয়েছিলেন মাত্র একটি উইকেট। সে বছর নভেম্বরে ভারতের বিপক্ষে কলকাতায় ঐতিহাসিক দিবা-রাত্রির টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৯১ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন। পরের ১০ ইনিংস তার জন্য দারুণ যন্ত্রণাময় ছিল। সেখানে তার শিকার ছিল মাত্র ৭ উইকেট। তাই ইবাদতের সামর্থ্য ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে তারপরই কিউইদের বিপক্ষে সুযোগ পেয়ে জ্বলে উঠে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করলেন। বিমান বাহিনীতে তার চাকরি হলেও তার পদবি এয়ারম্যানের। তিনি আকাশে বিমান না চালালেও আজ উড়ছেন বাংলার ক্রিকেট আকাশে।

কিউইদের বিপক্ষে বাংলাদেশের ৮ উইকেটে পাওয়া ঐতিহাসিক জয়ের নেপথ্যে দলীয় প্রচেষ্টা সবচেয়ে বড় কারণ। তবে ইবাদত এই জয়ে রেখেছেন ভিন্ন এক অবদান। তার বোলিং তোপের মুখে পড়েই দ্বিতীয় ইনিংসে আসা-যাওয়ার মিছিলে নাম লেখান নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা। চতুর্থ দিনের শেষভাগ থেকে স্বাগতিকদের পরীক্ষা নেয়া শুরু করা ইবাদত শেষ দিনে হয়ে ওঠেন আরও ভয়ঙ্কর। অসাধারণ বোলিংয়ে ১৯ ওভারে ৪৬ রান খরচায় তুলে নেন ৬টি উইকেট। যা তার টেস্টের ক্যারিয়ার সেরা। এ ছাড়া প্রায় ৯ বছর ও ৪৭ ম্যাচ পর বাংলাদেশের কোনো পেসার হিসেবে টেস্টে ৫ বা তার বেশি উইকেটের অনন্য নজিরও এখন তার অবদান। শুধু কি তাই- নিউজিল্যান্ডে প্রথম জয়ের অপেক্ষাটা ছিল আরও দীর্ঘদিনের। ২০০১ প্রথম টেস্ট সফরে সেখানে গিয়েছিল টাইগাররা। এরপর ২০০৭ ও ২০১০-এ কিউইদের মাটিতে প্রথম ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। কিন্তু ১১ বছরে কিউইদের বিপক্ষে তাদের মাঠে তিন সংস্করণ মিলিয়ে ৩৩ ম্যাচ কোনো জয় ছিল না। অবশেষে সেই অসাধ্যই সাধন হয়েছে। যার অন্যতম নায়ক তো ইবাদতই।

ক্রিকেটার ইবাদত, আনন্দে ভাসছে গ্রাম: ইবাদতের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে তার নিজ গ্রাম মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ উত্তর ইউপির কাঠালতলীতে যেন বইছে খুশির বন্যা। পরিবারের পাশাপাশি গ্রামের মানুষও খুশিতে আত্মহারা। বুধবার রাতে কাঠালতলী বাজারে আনন্দ মিছিল, মিষ্টি বিতরণ ও কেক কেটে আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।
ইবাদত হোসেন চৌধুরীর বাবা নিজাম উদ্দিন চৌধুরী ও মা সামিয়া বেগম চৌধুরী বললেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই খেলার প্রতি তার আলাদা টান ছিল। সারাদিন ক্রিকেট খেলতো। তার স্বপ্ন ছিল সে কোনো একদিন জাতীয় দলের হয়ে খেলে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। আজ আমার ছেলের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশকে জিতিয়ে সে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। আমাদের ছেলের এমন পারফরমেন্সে আমরাও খুশি। এলাকার মানুষও খুশি। আমরা তার সব খেলা দেখেছি। নামাজ পড়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য দোয়া করেছি। সকালে ইবাদতের সঙ্গে আমাদের মুঠোফোনে কথা হয়েছে। সে খুব খুশি।

ইবাদতের চাচাতো ভাই দেলওয়ার হোসেন চৌধুরী ইমন বলেন, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ে সারা বাংলাদেশের মতো আমরাও গর্বিত, আনন্দিত। ইবাদত ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি অনুরাগী। আমাদের বিশ্বাস ছিল সে একদিন দেশের মুখ আলোকিত করবে। আজ সে সেই স্বপ্ন পূরণ করেছে।

ইবাদতের সহপাঠী আমজাদ হোসেন পাপলু ও এমদাদুর রাজ্জাক রাব্বি বলেন, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সে যে চমক দেখিয়েছে তাতে আমরা খুশি। এলাকার মানুষ ভীষণ খুশি। তার জন্য আজ বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ জয় পেয়েছে। এলাকার সবাই তাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ইবাদত হোসেন চৌধুরীর বাবা নিজাম উদ্দিন চৌধুরী বিজিবিতে চাকরি করতেন। আর মা সামিয়া বেগম চৌধুরী গৃহিণী। ছয় ভাইবোনের মধ্যে ইবাদত দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলার প্রতি তার আলাদা টান ছিল। স্থানীয় বিভিন্ন ক্রিকেট ক্লাবে খেলেছেন ইবাদত। ভালো বোলিং করতেন বলে এলাকার বাইরেও তার নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। এসএসসি পাস করে ২০০৮ সালে সৈনিক পদে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। সেখানেই চাকরির পাশাপাশি বিমান বাহিনীর নিয়মিত ভলিবল টিমে খেলতে শুরু করেন। কিন্তু ক্রিকেটের প্রতি তার টান মোটেও কমেনি। ২০১৬ সালে রবি পেসার হান্টের শেষ রাউন্ডে ১৩৯.০৯ কিলোমিটার গতিতে বল করে সবাইকে চমকে দেন ইবাদত। নজরে আসেন সবার। এরপর থেকে ইবাদতকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ২০১৯ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ইবাদতের অভিষেক হয়। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেই তার টেস্টে অভিষেক হয়। আর সেই নিউজিল্যান্ডের মাটিতেই ইতিহাস গড়লেন ইবাদত।

কাঠালতলী ক্রিকেট ক্লাবের সাধারণ সমপাদক ফারুক আহমেদ ও সোনার বাংলা ক্রিকেট ক্লাবের সভাপতি নাজিম উদ্দিন বলেন, ইবাদতের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে আজ বাংলাদেশ অবিস্মরণীয় জয় পেয়েছে। এটা ইতিহাস হয়ে থাকবে। ইবাদত আমাদের দেশের, এলাকার মুখ উজ্জ্বল করেছে। তাকে নিয়ে আমরা গর্বিত, আনন্দিত।