নেপালে হোটেলে নিয়ে যুবতী মডেল ধর্ষণ, নগ্ন ছবি ধারণ, মি টু আন্দোলন জোরালো

Published: 5 June 2022, 11:46 AM

পোস্ট ডেস্ক :


নেপালের জনপ্রিয় একজন যুবতী ও মডেল। বয়স তার মাত্র ১৬ বছর। একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতায় তার ডাক পড়ে। সেখানে পার্টির পরে তাকে কোমল পানীয় পান করতে দেয়া হয়। এতে মিশিয়ে দেয়া হয় চেতনানাশক। পানীয় পান করে অচেতন হয়ে পড়েন ওই মডেল। এরপর আয়োজক তাকে ধর্ষণ করেন এবং সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন। ওই মডেলের যখন চেতনা ফেরে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন রক্তাক্ত অবস্থায়। এর ৬ মাস পরে আরও ভয়ানক ঘটনা ঘটতে যায়।

গত ১৮ই মে তিনি টিকটকে ধারাবাহিক ভিডিওতে বলে যান- আমি মরে যেতে চাই। এতে তিনি ২০১৪ সালের ওই মানসিক ক্ষতের উল্লেখ করেন।

সে সময় একটি শিক্ষাবিষয়ক কনসালট্যান্সির মালিক তাকে লেমোনেড পান করান, তারপর হোটেলকক্ষে ধর্ষণ করেন। তার নগ্ন ছবি তোলেন। ওই ছবি ব্যবহার করে তাকে ব্লাকমেইল করেন। ওই ছবি ব্যবহার করে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করেন। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট।
ওই মডেল আরও বলেছেন, তিনি আমাকে বলেছেন যে, আমার কিছু ছবি তিনি তুলেছেন। এসব ছবি প্রকাশ করে দিতে চান। একটি ভিডিওতে ওই মডেলকে এসব কথা বলতে শোনা যায়। এ সময় তার কণ্ঠ কেঁপে কেঁপে উঠছিল। তিনি কাঁদছিলেন। বলতে থাকেন, আমি আসলেই ভয় পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে বলতেন– তুমি অর্থের জন্য এসব করে বেড়াও। তাই আমরা এসব করেছি। ওই মডেল বলেন, এসব শুনে আমি অসহায় হয়ে পড়ি। এমনকি কান্না লুকাতে পারছিলাম না। আমার পুরো শরীর জমে গিয়েছিল। ২৪ বছর বয়সী এই মডেলের ভয়াবহ এসব কাহিনীর ফলে নেপালে নতুন করে শুরু হয়েছে মি টু আন্দোলন। এর বিচারের দাবিতে নারীরা রাস্তায় নেমেছেন। তারা দেশে ধর্ষণ বিরোধী আইনের সংশোধন দাবি করেছেন।

এই অভিযোগের ফলে মডেল গ্লোবাল ভিসাস কনসালট্যান্সির মালিক মনোজ পান্ডেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ২১শে মে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে স্বয়ম্ভু এলাকা থেকে মনোজকে গ্রেপ্তার করেছে মেট্রোপলিটন ক্রাইম ডিভিশন। ২০১৪ সালে ঘটনার সময় মিস গ্লোবাল ইন্টারন্যাশনাল-২০১৪ এর আয়োজক ছিলেন। তিনি যে মডেলকে ধর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ, তিনি ঘটনার পরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছয় মাস পরে যখন আর এই ক্ষত বয়ে বেড়াতে পারছিলেন না, তখন এক বন্ধুর কাছে শেয়ার করেন এই কাহিনী।

এই কাহিনী প্রকাশ হওয়ার পর থেকে নেপালের নারীদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ বিক্ষোভ হচ্ছে। তাদের চাপে আইনপ্রণেতারা পার্লামেন্টে একটি বিল এনেছেন। দেশটিতে ধর্ষণের শাস্তি এক বছরের জেল। একে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে স্বল্প সময়ের শাস্তি হিসেবে মনে করা হয়। এই শাস্তি বাড়ানোর জন্য সরকারকে চাপ দিতে শীর্ষ আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছেন আইনজীবীরা। নেপালের আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের এক বছরের মধ্যে এ বিষয়ে মামলা করতে হবে। এক্ষেত্রে শত শত ভিকটিমের সামনে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা। তাদের বেশির ভাগেরই নেই আইনজীবী, আর্থিক সামর্থ্য, যৌন নির্যাতন পরবর্তী আইনগত বা পারিবারিক সমর্থন।

তবে সর্বশেষ ঘটনার পর নেপালের জাতীয় পরিষদে প্রস্তাব নিবন্ধিত করা হয়েছে। নেপালি কংগ্রেসের চারজন এমপি দিলা সাংগ্রুউলা পান্তা, প্রমীলা রাই, সুজাতা পারিয়ার এবং রাঙ্গামাটি শাহি প্রতিনিধি পরিষদে ধর্ষণের শাস্তি পরিবর্তনের জন্য ৩০শে মে একটি আবেদন করেছেন।

নেপালের সুপ্রিম কোর্টে ধর্ষণের শাস্তি বাড়ানোর জন্য আবেদন জমা দিয়েছেন ৬ জন নারী আইনজীবী মমতা সিওয়াকোটি, ওজস্বী কেসি, রঞ্জিতা সিলওয়াল, দিক্ষা খাদগি, দিকছা রাউত এবং সালিনা কাফল। এমপিরা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন ভিকটিমকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে, তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে, তাকে কাউন্সেলিং দিতে।

মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী দিচেন লামা জড়িত আছেন অলাভজনক সংগঠন ফোরাম ফর ওমেন, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে। তিনি বলেছেন, তারা ওই মডেলকে মামলা করতে সহায়তা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের আইনজীবীরা ওই মডেলের সংস্পর্শে আছেন। ওই মডেলকে ৬ মাস ধরে ধর্ষণ করা হয়েছে। নির্যাতন করা হয়েছে। এতে তার হৃদয় ভেঙে গেছে। কারণ, তিনি দেখেছেন ধর্ষণের শাস্তি মাত্র এক বছরের জেল। আসলে তিনি আইন সম্পর্কে জানতেন না।

কাঠমান্ডু মেট্রোপলিটন পুলিশ রেঞ্জের মুখপাত্র দিনেশ রাজ মাইনালি বলেছেন, এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। আরেকজন কম বয়সীর কাছ থেকে পান্ডের বিরুদ্ধে একই রকম আরেকটি অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। এনজিও ইকুয়ালিটি নাউ-এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কনসালট্যান্ট জুলি থেক্কুদান বলেছেন, ধর্ষিতারা ধর্ষণের বিষয়ে রিপোর্ট না করার বেশকিছু কারণ আছে। আমাদেরকে সব সময় শিখানো হয় যে, আমরা কিছু পর্যায়ে বিপদের মুখে। তার পরও কেন আমরা সেখানে যাই? কেন ওই ধরনের পোশাক পরি? কেন আমরা ছেলেদের সঙ্গে কথা বলি?