চৈত্রসংক্রান্তি : বাঙালির নিজস্ব সংরাগ
সৌমিত্র শেখর

মানুষের জীবনে, এমনকি প্রাণিকুলেও একটি বছর বেশ লম্বা সময়। জীবনে ও জগতে এই সময়ের মধ্যে অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়। পাল্টে যায় আবাসিক স্থান, পোশাক-পরিচ্ছদ, এমনকি মূল্যবোধের ছোটখাটো সূচক। তাই একটি বছর থেকে আরেকটি বছরে পদার্পণকে মানুষ সারা পৃথিবীতেই বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বাঙালির ক্ষেত্রেও তেমনি নববর্ষকে নানা মাত্রায় যে উদযাপন করতে দেখা যায় তার পেছনে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর ব্যাপারটি মুখ্য। ব্যাপারটি এমন, গত বছর যা হয়েছে হোক, নতুন এই বছরটি যেন খুব ভালো করে যায়; শুধু যায় না, আনন্দে কাটে। কিন্তু বাঙালির মধ্যে সংক্রান্তি বলেও একটি ধারণা আছে, যদিও ওই ধারণাটি এখন বেশ ম্লান। সংক্রান্তি শব্দটি এসেছে সংক্রমণ শব্দ থেকে। একটি মাসের নির্দিষ্ট রাশি থেকে অন্য মাসের রাশিতে সংক্রমণই হলো সংক্রান্তি। এটি প্রতি মাসেই হয়। কোনোটি সাড়ম্বর আয়োজনে আমাদের সামনে আসে, কোনোটি আবার নীরবেই চলে যায়।
বাংলা মাসের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি বেশ আগ্রহোদ্দীপক। কেননা বাংলা মাসগুলো মূলত নক্ষত্রের গমনাগমনকে মান্য করেই নির্ধারিত হয়েছে। বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জেষ্ঠা নক্ষত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেকে আষাঢ় এভাবে স্মরণ করলে চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ হয়েছে। তাই এক মাস শেষ করে অন্য মাস সূচনার যে সময় সেটি খুব ভালো করে স্মরণের একটি ব্যাপার থেকেই গেছে। বাঙালি সমাজে একসময় পঞ্জিকা খুব গুরুত্ব পেয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রা অনেকটাই পরিচালিত হয়েছে পত্রিকার অনুসরণে। বিশেষ করে ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠান সবটাই এই পঞ্জিকাকেন্দ্রিক ছিল। সেই পঞ্জিকায় দিনক্ষণ, তিথিনক্ষত্র ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট অনেক সূত্রসন্ধান মেলে। সেখানেই সংক্রান্তির ব্যাপারটি উল্লেখ আছে। কিন্তু যাপিত জীবনে মাস শেষে বছরে বারোটি সংক্রান্তি পালন করা হয়তো দুরূহই হয়ে পড়ে। সে কারণে মাত্র দু-তিনটা সংক্রান্তি বাঙালি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় আমেজ আর আনন্দে, আহার আর উৎসবে। এর মধ্যে চৈত্রসংক্রান্তি একটি।
বাঙালি ঐতিহ্যে পহেলা বৈশাখকে মহাসমারোহে পালনের ইতিহাস যতটা না মেলে, তার চেয়ে বেশি মেলে চৈত্রসংক্রান্তি পালনের ইতিহাস। পুরো ভারতীয় সমাজে এই প্রস্থানকে সমাদর করার একটি রীতি আছে, আগমনকে যতটা নয়। যে কারণে ভারতীয় সমাজে প্রাচীন রীতিতে জন্মতিথির চেয়ে মৃত্যু বা প্রস্থান তিথি পালনের ব্যাপারটি মুখ্য ছিল। এখন অবশ্য ঔপনিবেশিক মানসিকতায় জন্মদিন পালনের ব্যাপারটি প্রধান হয়ে উঠেছে, মৃত্যুর পর কেউ স্মরণে রাখবে না, হয়তো এটি মনে করেই! রবীন্দ্রনাথ নিজে পর্যন্ত জন্মদিন পালন করতে চাননি। তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক জন্মদিন পালিত হয় ৭০ বছর বয়সে। বাঙালি মনীষীদের জীবৎকালে জন্মদিন পালনের ইতিহাস আমাদের সে কারণেই জানা নেই। হয়তো তাঁদের জীবনে দু-চারবার গণসংবর্ধনা পাওয়ার খবর পাওয়া যায়। সেই ধারণা থেকেই বাঙালি সমাজে চৈত্রসংক্রান্তি সমারোহে পালিত হয়েছে। এটির সঙ্গে ধর্মের সংশ্লিষ্টতা যত না আছে, তার চেয়ে বেশি আছে সামাজিক সংশ্লেষ। অর্থনীতিরও একটি যোগ ছিল নিশ্চয়।
চৈত্রসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে গ্রাম ও গঞ্জে যে মেলার আয়োজন হতো, সেটি বাঙালির অপেক্ষাকৃত বড় ব্যাবসায়িক মিলনের ক্ষেত্র ছিল। আজকে বাণিজ্য মেলা, কম্পিউটার মেলা, বস্ত্রমেলা, এমনকি বইমেলার যে ধারণা, সেটিরও গর্ভধারিণী এই চৈত্রসংক্রান্তির মেলা। তখন নগর গড়ে ওঠেনি, মানুষ এতটা যান্ত্রিকও ছিল না। তার পরও জনসংখ্যা স্বল্পতার জন্য দূর-দূরান্তে ছিল তাদের বসবাস। মেলা মানুষকে মিলনের পথে হাতছানি দিত। সে কারণেই চৈত্রসংক্রান্তি মেলার জন্য বছরব্যাপী মুখিয়ে থাকত মানুষ। দূর-দূরান্ত থেকে নাইওরে এসে বাপের বাড়ি বা আত্মীয় বাড়িতে সমবেত হতো কাছের মানুষগুলো। এভাবেই মানুষে মানুষে আত্মিক বন্ধন গাঢ়তর করেছে চৈত্রসংক্রান্তি। চৈত্রসংক্রান্তি মেলার জন্য প্রস্তুতি থাকত ভেতরে ভেতরে।
তখন তো কুটির শিল্পই প্রধান। সেই শিল্পই মেলাকে উপলক্ষ করে বেশ আগে থেকে প্রস্তুতির জোয়ারে ভাসত। কুমারপাড়ায় মৃিশল্প, কামারপাড়ায় ধাতুশিল্প, সেই সঙ্গে বাঁশ, বেত আর অন্য কিছু দিয়ে তৈজসসামগ্রী গড়ার ধুম পড়ে যেত। নানা ধরনের খাদ্য আর মিঠাই মেলার প্রাণ ছিল। তখন তো ফুচকা, ঘুগনি, আইসক্রিম ছিল না। মণ্ডা, মিঠাই, বাতাসা আর কাচের এটা-ওটা পেলেই সবাই খুশি হয়ে যেত। চৈত্রসংক্রান্তি মেলা দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি যে চাঙ্গা হতো, পরের অন্তত দুটি মাস গ্রামবাংলার মানুষের জীবনযাত্রায় সেই প্রভাব বোঝা যেত। চৈত্রসংক্রান্তির এই মেলার বৈচিত্র্য স্থানবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন। কোনো অঞ্চলে চড়ক গাছে ঘূর্ণি, আবার কোথাও গাজনের আয়োজন—এগুলোও দেখা গেছে। কিন্তু চৈত্রসংক্রান্তির সর্বজনীনতা হলো, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে একটি মাসের মধ্য দিয়ে বছরকে বিদায় আর সেই সূত্রেই মানুষের মিলনমেলায় ভাসা। এতে মানুষের অন্তর্গত বন্ধন যে সুদৃঢ় হয়, তা দিয়েই পরবর্তী বছর আরো ভালো করে অতিবাহিত করার প্রাণসঞ্চার ঘটে। অতএব সংক্রান্তি বাঙালির নিজস্ব উপলব্ধি ও সংরাগ। এর উদযাপনও একান্তভাবেই এই জাতির। চৈত্রসংক্রান্তি যেহেতু একটি বছরকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরে প্রবেশ, সেহেতু এর সমাদর ও আয়োজন অপেক্ষাকৃত বেশি ও সাড়ম্বরে হবে, সেটি বলাই বাহুল্য।




