পদ্মা সেতুর এক বছর পূর্তি এবং আমাদের অর্জন
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

আজ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এক বছর পূর্তি। ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত পদ্মা সেতু থেকে এরই মধ্যে সুফল ভোগ করছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রায় তিন কোটি মানুষ, সর্বোপরি সারা দেশের মানুষ। পাল্টে গেছে অর্থনৈতিক চিত্র। নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যে।
২০২২ সালের ২৬ জুন থেকে পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকে গত ৭ জুন পর্যন্ত ৭৫৮ কোটি আট লাখ ৭৫০ টাকা টোল আদায় হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তির ৩১৬ কোটি দুই লাখ ৬৯ হাজার ৯৩ টাকা পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। এর আগে গত ৫ এপ্রিল পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির ৩১৬ কোটি ৯০ লাখ ৯৭ হাজার ৫০ টাকা পরিশোধ করা হয়। দুই দফায় ৬৩২ কোটি ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার ১৪৩ টাকা পরিশোধ করা হলো।
অর্থ বিভাগের সঙ্গে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ঋণ চুক্তি অনুযায়ী ১ শতাংশ সুদসহ ৩৫ বছরে ঋণের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা সেতু কর্তৃপক্ষের।
২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতু নির্মাণে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর নানা পটপরিবর্তনের কারণে থেমে যায় পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কাজ। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেতু নির্মাণের কাজ আবারও শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে সেটি বাস্তব রূপ লাভ করে বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়।
জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছরমেয়াদি এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কাজ করছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন রয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণ এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন সহজ করে তুলেছে। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের শিল্প ও পর্যটনকেন্দ্র।
পদ্মা সেতু গ্রাম ও শহরের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করেছে ব্যাপকভাবে। কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে। কৃষকরা দ্রুত ঢাকায় কৃষিপণ্য পৌঁছতে পারছে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের আয় বেড়েছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে অনেক পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে, যা ভ্রমণপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে থাকে। সুন্দরবন, কুয়াকাটা, ষাটগম্বুজ মসজিদের মতো অনেক পর্যটনকেন্দ্র ওই অঞ্চলের যাতায়াতব্যবস্থার অনুপযোগিতার কারণে মানুষের কাছে অনাগ্রহের বিষয় ছিল। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে এখন তা নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। এসব পর্যটনকেন্দ্রের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করে তা থেকেও রাষ্ট্র প্রচুর অর্থ আয় করতে সমর্থ হচ্ছে।
পদ্মা সেতুর ফলে আমাদের শিক্ষা বিস্তারেও পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। ঢাকা বা অন্য শহরগুলোতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা সহজেই পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। এতে শিক্ষাবৈষম্য দূর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পদ্মা সেতুর ফলে মোংলা বন্দরের গতি বেড়েছে। মোটাদাগে বলা যায়, দারিদ্র্য নিরসন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে পদ্মা সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
একসময় বৈদেশিক সহায়তা ছাড়া চলতে না পারা বাংলাদেশ এখন নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতুর মতো মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। স্বাধীনতার ৫২ বছরে আমরা পদার্পণ করছি। অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচকেই বাংলাদেশ এখন অনেক দেশ থেকে এগিয়ে। এটি আমাদের কম অর্জন নয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমান অবস্থানে এসে পৌঁছেছে; যদিও পদ্মা সেতু বাংলাদেশের একমাত্র মেগাপ্রকল্প নয়। এরই মধ্যে মেট্রো রেল চালু হয়েছে। এর আগেও এ দেশে বহু মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এখনো বেশ কিছু মেগাপ্রকল্প চলমান রয়েছে। তবে পদ্মা সেতুর বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেননা এই সেতু নির্মাণ নিয়ে ঘটে গেছে অপ্রত্যাশিত নানা ঘটনা; কেউ কেউ মেতে উঠেছিল গভীর ষড়যন্ত্রে। কিন্তু সব চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান হয়েছে; বিস্ময়কর হলেও সত্য যে এই সেতু নির্মাণে বাংলাদেশ কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেনি। এটি আমাদের আত্মগৌরবের জায়গাটিকে মজবুত ভিত্তি দিয়েছে।
যে দেশে সত্তরের দশকেও শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল দেশ, সেই দেশ এখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু এবং এর সংযোগ সড়ক নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করেছে। এটা গৌরববোধ ও আভিজাত্যের অনন্য অহংকার। বিশ্ব বাংলাদেশকে যে চোখে দেখত, এখন সেই চোখে দেখার দিন ফুরিয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক সক্ষমতার দেশ। প্রতিটি অঙ্গনে অপ্রতিরোধ্য গতিতে উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন করে চলেছে বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ৪৮ শতাংশ মানুষ ছিল হতদরিদ্র। আর বর্তমানে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশ, যা ২০১৫ সালেও ছিল ২৮.৫ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় দুই হাজার ৭৬৫ মার্কিন ডলার, যা নিকট-ভবিষ্যতে আমাদের সুনিশ্চিতভাবেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করবে।
বাংলাদেশ এখন আত্মবিশ্বাস ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করেছে। নানা দিক বিবেচনায় আমরা নিঃসংকোচে বলতে পারি, স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মানুষের অনাগত স্বপ্ন পূরণে সারথির কাজ করছে। এ দেশ নিজের অর্থায়নে এত বড় সেতু নির্মাণ করতে পেরে, অন্যান্য বৃহৎ অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজের সাহস অর্জন করেছে। এক কথায় বলা যায়, পদ্মা সেতু এরই মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি




