হাসপাতালের বেজমেন্টে প্রাইভেটকারে দুই লাশ, নানা প্রশ্ন
পোস্ট ডেস্ক :

রাজধানীর মৌচাকে সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পার্কিংয়ে থাকা প্রাইভেটকার থেকে দুই যুবকের লাশ উদ্ধার নিয়ে নানা রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। গাড়ির ভেতরে দু’জন কখন, কীভাবে মারা গেলেন, তাদের হত্যা করা হয়েছে, নাকি অন্য কোনো কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধূম্রজাল। গতকাল দুপুর একটার দিকে মরদেহ দু’টি উদ্ধার করে রমনা থানা পুলিশ। নিহত জাকির পেশায় গাড়িচালক, নিহত অপরজন হলেন মিজান। তাদের দু’জনের বাড়ি নোয়াখালী জেলার চাটখিলে।
রোববার সকাল ৫.৩২ মিনিটে হাসপাতালটি থেকে রোগী নিতে আসেন তারা। সঙ্গে ছিলেন গাড়ির মালিক জোবায়ের আহমেদ সৌরভ। পরে ড্রাইভার জাকির গাড়িটি নিয়ে বেজমেন্টে চলে যায়। সৌরভ ও মিজান হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। রিসিপশনে কথা বলার পর গাড়ির মালিক হাসপাতাল ত্যাগ করেন, আর মিজান চলে যায় গাড়ির কাছে পার্কিংয়ে। এরপর কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা রহস্য। হাসপাতালে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, নিহতরা এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চাটখিলের জোবায়ের নামে এক শিশুর অপারেশন হয়েছে। মূলত তাকে হাসপাতাল থেকে নিতে এসেছিলেন তারা।
ওই শিশুর বাবা হুমায়ুন কবির বলেন, আমার বাচ্চার অপারেশন হয়েছিল এ হাসপাতালে। আমাদের নোয়াখালী নেয়ার জন্য আমরা এলাকার মনির নামে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাকে বলি যদি আমাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয় তাহলে চাটখিলে নেয়ার জন্য একটা প্রাইভেটকার ভাড়া করতে। কিন্তু আমাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়নি। পরে আমরা মনিরকে নিষেধ করি। কিন্তু এরমধ্যেই ওরা আমাদের না জানিয়েই হাসপাতালে চলে এসেছিল। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো কথা হয়নি। লাশ উদ্ধার হওয়ার পর আমরা খবর পাই।
নিহত মিজানের ভগ্নিপতি কামাল হোসেন বলেন, মিজানের এক বড় ভাই ইতালি প্রবাসী। মিজান পেশায় মৎস্য খামারি, সে অবিবাহিত। মিজানের সঙ্গে সর্বশেষ শনিবার কথা হয়েছিল। মিজান তাকে বলেছিল তার জন্য নোয়াখালী থেকে ডাব পাঠাবে। মিজান ও জাকিরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। মিজান প্রায় সময়ই জাকিরের সঙ্গে প্রাইভেটকারে ঢাকায় আসতো।
হাসপাতালটির সিকিউরিটি ইনচার্জ মিজানুর রহমান বলেন, গতকাল সকাল ৫.৪৫ মিনিটে গাড়িটি এন্ট্রি করা হয়। সকাল ১১.৫০ মিনিটের দিকে পার্কিংয়ে জায়গা খালি আছে কিনা দেখতে যাই। বেজমেন্টের দ্বিতীয় তলায় প্রাইভেটকারটিকে পড়ে থাকতে দেখি। সেখানে প্রথমে গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি গাড়িতে দু’জন শুয়ে আছে। আমি তাদের ডাকাডাকি করার পর সাড়া না পেয়ে গাড়ির দরজা খোলার চেষ্টা করি। গাড়িটি আনলক করা ছিল। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আমি লাশ দেখতে পেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানাই। পরে পুলিশে খবর দেই।
ডিএমপি’র রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম বলেন, খবর পেয়ে আমরা দুপুরে এসে মরদেহ দু’টি উদ্ধার করি। প্রাইভেটকারের নম্বরের সূত্র ধরে আমরা গাড়িটির মালিক সৌরভকে কল দেই। তার বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিলে। তাকে নিহতদের ছবি পাঠালে তিনি তাদের পরিচয় শনাক্ত করেন। তারা হলেন- প্রাইভেটকারের ড্রাইভার জাকির সঙ্গে জাকিরের চাচাতো ভাই মিজান। তাদের বয়স ৪০-এর কাছাকাছি। আমরা ইতিমধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। গতকাল ভোর ৫.৩২ মিনিটে গাড়িটি হাসপাতালে এন্ট্রি করে। গাড়িটির মালিক সৌরভ তাদের সঙ্গে হাসপাতালে আসেন। পরে ড্রাইভার গাড়িটি নিয়ে বেজমেন্টের দিকে চলে যায়। গাড়ির মালিক সৌরভ আর মিজান হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। তারা রিসিপশনে কথা বলার পর গাড়ির মালিক বিদায় নিয়ে চলে যায়। আর মিজান চলে যায় গাড়ির কাছে পার্কিংয়ে। তিনি আরও বলেন, তারা এখানে রোগী নিতে এসেছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। জোবায়ের নামে একজন কিশোরের অপারেশন হয়েছে এ হাসপাতালে। তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়ার কথা ছিল কিন্তু হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়নি। তারা যেহেতু ভোরে এসেছে তারা রোগীর আত্মীয়ের সঙ্গে হয়তো যোগাযোগ করতে পারেনি। পরবর্তীতে ওরা হয়তো চিন্তা করেছে একটু বিশ্রাম নিয়ে সকাল ৯-১০টার দিকে তারা যোগাযোগ করবে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। গাড়ির ভেতরে দু’জন কখন কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছি। তিনি আরও বলেন, গাড়িতে এসি চালু না থাকায় লাশগুলো পচে ফুলে গিয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে জানিয়ে উপ-কমিশনার মাসুদ আলম বলেন, ময়নাতদন্তের জন্য দু’জনের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।




