ইসলামে শান্তি ও ন্যায়সঙ্গত প্রতিরক্ষা নীতি
মুফতি সাইফুল ইসলাম

সালাম বা শান্তি শব্দটিই একটি সামাজিক চুক্তি। যার উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা, উসকানি-সংঘর্ষ এড়িয়ে চলা, উত্তেজনার দরজা বন্ধ রাখা। শান্তিই মানবজীবনের স্বাভাবিকতা। যুদ্ধ ব্যতিক্রম ব্যাপার।
শান্তি জীবনকে টিকিয়ে রাখে; বিপরীতে যুদ্ধ জীবনকে নিভিয়ে দেয়।
ইসলাম এই স্বাভাবিক সত্যটিকেই মানবসমাজের মূলনীতি নির্ধারণ করেছে। কোরআন যুদ্ধকে বৈধ করেছে শুধু তখন, যখন তা আগ্রাসন ঠেকাতে, ধর্ম-জীবন-সম্পদ রক্ষা করতে আবশ্যক হয়। শান্তি আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহের একটি।
কোরআনে এসেছে-
﴿هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ﴾
‘তিনি আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই—সর্বাধিপতি, পরম পবিত্র, শান্তিময়।” (সূরা হাশর, আয়াত : ২৩)
জান্নাতেরও একটি নাম দারুস্-সালাম বা শান্তির ঘর। কোরআনের ভাষায়-
﴿وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَىٰ دَارِ السَّلَامِ﴾
“আল্লাহ মানুষকে দারুস্-সালাম-এর দিকে আহ্বান করেন।” (সুরা ইউনুস, আয়াত :২৫)
এ কারণেই মুসলিমদের অভিবাদন শান্তির ঘোষণাপত্র: “আস-সালামু আলাইকুম” মহানবী (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন:
أَفَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى أَمْرٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
“আমি কি তোমাদের এমন কিছুর দিকে নির্দেশ না দেব, যা করলে তোমরা একে-অপরকে ভালোবাসবে?—তোমাদের মধ্যে সালাম ছড়িয়ে দাও।
” (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১৯৩)
ইসলাম যুদ্ধ চায় না; কিন্তু আগ্রাসন, জুলুম, ধর্মীয় নিপীড়ন যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে তখন আত্মরক্ষা ফরজ হয়। কোরআনের স্পষ্ট ঘোষণাগুলো দেখুন:
প্রতিরক্ষার অনুমতি:
﴿أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ﴾
“যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তারা অত্যাচারিত। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম।” (সুরা হজ, আয়াত :৩৯)
সীমালঙ্ঘন নিষিদ্ধ:
﴿وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ﴾
“আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো তাদের সাথে—যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে; কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।
” (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৯০)
শান্তি প্রস্তাব এলে সম্মতি:
﴿وَإِنْ جَنَحُوا لِلسَّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ﴾
“তারা যদি শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তুমিও তাতে সম্মতি দাও এবং আল্লাহর উপর ভরসা করো।” (সুরা আনফাল আয়াত : ৬১)
বেসামরিক লোকদের সাথে ন্যায় ও সদাচার:
﴿لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ… أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ﴾
“যারা তোমাদের সঙ্গে ধর্মের ব্যাপারে যুদ্ধ করেনি… তাদের সাথে সদাচরণ ও ন্যায়পরায়ণতা থেকে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না।” (সূরা মুমতাহিনা, আয়াত : ৮)
দেখুন উপরের সবগুলো প্রেক্ষিতেই শান্তিই হচ্ছে নীতিগতভাবে ইসলামের প্রাথমিক অবস্থান। যুদ্ধ ব্যতিক্রম। আর ব্যতিক্রমও ন্যায়সংগত প্রতিরক্ষার জন্য।
নববী যুগের যুদ্ধের ধরন
আপনি যদি সিরাতের দিকে নজর দেন তাহলে দেখতে পাবেন যে, বদর-উহুদ-খন্দকের মতো যুদ্ধগুলো ছিল প্রতিরক্ষামূলক; মুসলিমরা ছিল নবীন, সংখ্যায় অল্প, সর্বত্র অবরোধ ও আগ্রাসনে ঘেরা। শক্ত অবস্থান না নিলে শত্রুরা নবোদিত দ্বীনকে নিশ্চিহ্ন করে দিত। তাই ইসলামে ‘জিহাদ’ অপরের ওপর দখল-লোভের উপায় নয়; বরং জুলুম ঠেকানোর আইনি ও নৈতিক সুরক্ষা-প্রাচীর।
ইসলাম কখনো দখলদারিত্বের নামে যুদ্ধ করেনি; তবে অত্যাচারী বাধা সরিয়ে দাওয়াত পৌঁছাতে এবং সহাবস্থানের কাঠামো গড়তে ব্যবস্থাও রেখেছে। যেমন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জিজিয়া:
﴿قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ… حَتَّىٰ يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ﴾
‘যারা আল্লাহতে বিশ্বাস করে না ….. যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে নিজ হাতে জিযিয়া আদায় করে। (সুরা তাওবা, আয়াত : ২৯)
এটি অমুসলিম নাগরিকদের জন্য সামরিক-সুরক্ষার বিনিময়ে এক প্রকার নাগরিক কর। দ্বীন বদলানো এর শর্ত নয়; তারা নিজেদের ধর্মে থেকেই রাষ্ট্রীয় এই সুরক্ষার অধিকারী হতেন আর হবেন।
ইসলামের যুদ্ধনীতিতে নৈতিকতা
নববী নির্দেশিকা সুস্পষ্ট বেসামরিক লোক হত্যা নিষিদ্ধ, চুক্তিভঙ্গ নিষিদ্ধ, নিষ্ঠুরতা নিষিদ্ধ:
নারী-শিশু হত্যা নিষিদ্ধ:
নিচের হাদিসটি দেখুন
أَنَّ امْرَأَةً، وُجِدَتْ، فِي بَعْضِ مَغَازِي رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَقْتُولَةً فَأَنْكَرَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَتْلَ النِّسَاءِ وَالصِّبْيَانِ
‘রাসুলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত ছিলেন এরূপ কোনো এক যুদ্ধক্ষেত্রে জনৈক মহিলাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলা ও বাচ্চাদের হত্যা করতে নিষেধ করেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস ২৬৫৯)
অমুসলিম চুক্তিভুক্ত নাগরিক নিরাপত্তা:
রাসুলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَنْ قَتَلَ نَفْسًا مُعَاهَدًا لَمْ يَرِحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ أَرْبَعِينَ عَامًا
“যে ব্যক্তি নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি প্রদত্ত কোনো লোককে হত্যা করে, সে ব্যক্তি জান্নাতের সুগন্ধির ঘ্রাণ নিতে পারবে না। অথচ তার সুগন্ধ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়।” (বুখারি, হাদিস : ৬৯১৪)
নিষ্ঠুরতা-নির্যাতন বর্জন:
«إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ… فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ»
“আল্লাহ সব কিছুর ওপর ইহসান (সুন্দর আচরণ) লিপিবদ্ধ করেছেন… তোমরা যখন (প্রাণদণ্ড/যুদ্ধে) হত্যা করবে, উত্তমপন্থায় করো।” (তিরমিজি, হাদিস : ১৪০৯)
অভ্যন্তরীণ সংঘাতে শান্তি-প্রচেষ্টা:
﴿وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا﴾
“মুমিনদের দুটি দল যদি যুদ্ধ করে—তবে তাদের মিলিয়ে দাও।” (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ৯)
উপরের প্রমাণাদির পর এ কথা দৃঢ়ভাবেই বলা যায় যে, ইসলাম যুদ্ধধর্ম নয়; একটি শান্তির ধর্ম। ইসলাম যুদ্ধকে দেখে ন্যায়সংগত প্রতিরক্ষার শেষ অবলম্বন হিসেবে। শান্তিতে ঝুঁকতে কোরআনের নির্দেশ, বেসামরিক লোকদের সুরক্ষা, চুক্তিবদ্ধদের নিরাপত্তা, সীমালঙ্ঘন নিষেধ। এর সবই দেখায় যে, ইসলামের লক্ষ্য জীবন, ন্যায় ও সহাবস্থান। ইসলাম যুদ্ধের অনুমতি শুধু তখনই দেয় যখন জুলুম ঠেকানো ও শান্তি রক্ষা মানবতার জন্যই অপরিহার্য হয়ে ওঠে।




