কিশোর মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রথম যুদ্ধাভিজ্ঞতা
মুফতি সাইফুল ইসলাম

মক্কার আকাশ তখনো ধুলোবালির রঙে মোড়া। চারপাশের উপত্যকাগুলোতে ওকাযের ঐতিহ্যবাহী বাজার বসেছে। এ বাজার শুধু বেচাকেনা নয়; কবিতা, বাগ্মিতা ও গোত্রীয় গৌরব প্রদর্শনেরও এক মহামঞ্চ। কিন্তু সে বছরের ওকায অন্য সব বছরের মতো শান্ত ছিল না।
একটি রক্তের খবর এসে ওকাযের বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল। উপত্যকাজুড়ে গুঞ্জরিত হতে লাগল যে বনু কিনানাহ গোত্রের বাররায নামের এক যোদ্ধা কায়স আয়লান গোত্রের তিনজনকে হত্যা করেছে। মুহূর্তেই জ্বলে ওঠে উভয় পক্ষের হৃদয়ে প্রতিশোধ আর প্রতিরোধের বিনাশী আগুন ।
শতবর্ষের মর্যাদা, গোত্রীয় অহংকার, আর রক্তের দাবি।
সব মিলিয়ে শত্রুতার ঢেউ আছড়ে পড়ে ওকাযের পথে-প্রান্তরে। একপাশে কুরাইশ ও তাদের মিত্র বনু কিনানাহ; অপরপাশে দুর্ধর্ষ গোত্র ক্বায়স আয়লান।
কুরাইশ শিবিরের সেনাপতির আসনে ছিলেন হারব ইবন উমাইয়া। যে প্রতিভা, প্রভাব ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় কুরাইশ ও কিনানাহর গোত্রদ্বয়ের মধ্যে মান-মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিলেন।
একপর্যায়ে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। যুদ্ধের দামামা আর তরবারির ঝনঝনানিতে প্রকম্পিত হতে থাকে উপত্যকার প্রতিটি প্রান্তর।
সংঘর্ষের প্রথম দিকে ক্বায়স আয়লানের পক্ষে সমর্থন ছিল প্রবল। তারাই চালকের আসন ধরে রেখে কঠিনতর প্রতিশোধ স্পৃহায় ভয়াবহ আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে যুদ্ধের ধারা বদলাতে থাকে।
ধীরে ধীরে সমীকরণ ঘুরে যায়। কুরাইশ আর কিনানাহদের পক্ষে সমর্থনের স্রোত বেড়ে ওঠে। দিনের পর দিন সংঘর্ষ চলতে থাকে। ধুলোয় মিশে যায় অনেক তরুণের প্রাণ।
বহু বছর ধরে চলতে থাকা এ যুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানির পর অবশেষে কুরাইশের কিছু প্রাজ্ঞ ব্যক্তি দুই পক্ষের মাঝে সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসেন। প্রস্তাব ছিল এমন— যে পক্ষের নিহতের সংখ্যা বেশি হবে। অপরপক্ষ তাদের অতিরিক্ত নিহতের বিনিময়ে ‘দিয়াত’ প্রদান করবে।
সেই প্রস্তাবে উভয় পক্ষই সম্মতি জানায়। রক্তের প্রতিশোধের জায়গা দখল করে আপসের চুক্তি। যুদ্ধের অবসান ঘটে। সরে যায় শত্রুতা ও বিদ্বেষের অন্ধকার।
ইতিহাসে এই যুদ্ধ ‘ফিজার’ নামে খ্যাত। অর্থাৎ ‘অপবিত্র যুদ্ধ’। কারণ, এতে শুধু রক্তপাতই হয়নি; বরং এটি সূচনা সংঘটিত হয়েছিল হারাম মাসে। আর তৎকালীন আরব্য সমাজব্যবস্থায় সে মাসে যুদ্ধ, হত্যা ও রক্তপাত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। পবিত্রতার সীমা ভেঙে, নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ লঙ্ঘিত হয়েছিল বলেই এ যুদ্ধ এমন নাম পায়।
তখন কুরাইশের একজন কিশোরও এই যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বয়স মাত্র কুড়ি। তবে হাতে তলোয়ার নয়, কাঁধে ছিল দায়িত্ব। তিনি চাচাদের তীরবৃষ্টি থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করছিলেন। ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি এই যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে লড়েননি, বরং তীর কুড়িয়ে এনে চাচাদের হাতে তুলে দিতেন, যাতে তারা শত্রুর মোকাবেলায় সক্ষম থাকে। এটা ছিল তাঁর জীবনের প্রথম যুদ্ধময় অভিজ্ঞতা, যা হয়ত তাঁকে শিখিয়েছিল যে, শক্তি শুধু হাতে নয়, ধৈর্য ও ন্যায়ের মধ্যেও নিহিত।
অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, ফিজার যুদ্ধ কয়েক ধাপে সংঘটিত হয়। যুদ্ধ শুরুর সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স ১৫ বছরের মধ্যে ছিল। আর যখন আপসের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ২০ বছর।
তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি; এ থেকে বোঝা যায় যে আল্লাহ তাঁকে অল্প বয়স থেকেই পবিত্রতা ও রক্তপাত এড়িয়ে চলার পথে রেখেছিলেন।
এই যুদ্ধের পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘হিলফুল ফুযুল’ নামের শান্তি সংগঠন গঠনের উদ্যোগ নেন। যা অত্যাচারিতের পক্ষে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
(আর রাহীকুল মাখতুম অবলম্বনে)




