প্রিয় নবীর নির্দেশে শান্তি, অবাধ্যতায় ধ্বংস
মুফতি সাইফুল ইসলাম

মানবজীবন এক দীর্ঘ যাত্রাপথ। এই যাত্রা কখনো সমতল, কখনো পাথুরে, কখনো আঁকাবাঁকা। মানুষ নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে যতই এগিয়ে যেতে চায়, তবুও অনেক ক্ষেত্রে সে বিভ্রান্ত হয়, পথ হারায়। তাই আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন মানবতার দিশা দেখানোর জন্য।
আর সেই নবীদের শৃঙ্খলে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি শুধু আরব ভূমির জন্য নন, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত হয়ে এসেছেন। তাই তাঁর প্রতিটি আদেশ, নিষেধ, জীবনাচরণ ও সুন্নাহর মধ্যে নিহিত রয়েছে মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ।
কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন-
﴿وَمَا آتَاكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْ﴾
“রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।
” (সুরা হাশর, আয়াত : ৭)
এ আয়াতের মধ্যে রয়েছে এক অটল নীতি—যা প্রমাণ করে রাসুল (সা.)-এর আদেশ অমান্য করার কোনো অবকাশ নেই। তাঁর প্রতিটি বাণী, প্রতিটি নির্দেশ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত। সুতরাং একজন মুমিনের কর্তব্য হলো বিনা প্রশ্নে তা গ্রহণ করা।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন-
﴿مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَ﴾
“যে রাসুলের আনুগত্য করল, সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করল।
” (সুরা নিসা, আয়াত : ৮০)
অতএব, রাসুল (সা.)-এর আনুগত্যকে অবজ্ঞা করা মানে সরাসরি আল্লাহর নির্দেশকে অমান্য করা।
হাদিসের শিক্ষা
রাসুল (সা.) বলেছেন- ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সমগ্র মানবজাতির চেয়ে অধিক প্রিয় হই।” (বুখারি, হাদিস : ১৫; মুসলিম, হাদিস : ৪৪) অর্থাৎ, রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য ঈমানের মৌলিক শর্ত। শুধুমাত্র মুখে ঈমানের দাবি যথেষ্ট নয়; বরং তাঁর আদেশ মানা ও নিষেধ থেকে বিরত থাকা দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অন্য এক হাদিসে এসেছে— ‘যে আমার সুন্নাহকে ভালোবাসে, সে আমাকে ভালোবাসল।
আর যে আমাকে ভালোবাসবে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬৭৮) এই হাদিস প্রমাণ করে, রাসুল (সা.)-এর আদেশ-নিষেধ আঁকড়ে ধরা শুধু আনুগত্য নয়; বরং এটি জান্নাতলাভেরও মাধ্যম।
সাহাবিদের দৃষ্টান্ত
রাসুল (সা.)-এর সাহাবিরা তাঁর প্রতি এমন আনুগত্য দেখিয়েছেন, যা মানব ইতিহাসে বিরল। একবার উহুদের যুদ্ধে রাসুল (সা.)-এর দাঁত ভেঙে যায়, রক্ত ঝরতে থাকে। সাহাবিগণ তাঁর রক্ত ঝরা মুখ দেখে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন— “আমরা যদি আপনার এক বিন্দু রক্ত ঝরতে দিই, তবে আল্লাহর কাছে কী জবাব দেব?’
আরেকবার হুদায়বিয়াহর সন্ধির সময় রাসুল (সা.) মাথা মুড়িয়ে ইহরাম খোলার নির্দেশ দেন। সাহাবীগণ প্রথমে বিস্মিত হয়ে স্থির হয়ে ছিলেন। তারা ভাবছিলেন বাহ্যিক দিক থেকে অপমানজনক এ চুক্তি হয়তো আবার বিবেচিত হবে। তাই তাঁরা আদেশ পালণে দেরি করছিলেন। কিন্তু উম্মে সালামা (রা.) এর পরামর্শে যখন রাসুল (সা.) নিজে মাথা মুড়িয়ে পশু কোরবানি করলেন, তখন সকল সাহাবি চোখের পানিতে ভিজে দ্রুত তাঁর নির্দেশ পালন করতে লাগলেন। এটি ছিল পূর্ণ আনুগত্যের এক অনুপম দৃষ্টান্ত।
রাসূল (সা.)-এর আদেশে কল্যাণ, নিষেধে মুক্তি
রাসুল (সা.) যে সব বিষয়ে আদেশ দিয়েছেন, সেগুলো মানুষের জন্য কল্যাণকর। যেমন— নামাজ আদায় করা, যাকাত প্রদান করা, পরিশ্রমকে শ্রেষ্ঠ উপার্জন বলা, প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করা। এসব নির্দেশ সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে।
অন্যদিকে তিনি যেসব বিষয়ে নিষেধ করেছেন, সেগুলো মানবজীবনের জন্য ক্ষতিকর। যেমন— অহংকার, প্রতারণা, সুদ, অশ্লীলতা ও অন্যায়ভাবে হত্যা। এগুলো পরিত্যাগ করলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই শান্তি লাভ করে।
নবীর আদেশ অমান্যের পরিণতি
পবিত্র কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে—
﴿فَلۡيَحۡذَرِ ٱلَّذِينَ يُخَـٰلِفُونَ عَنۡ أَمۡرِهِۦٓ أَن تُصِيبَهُمۡ فِتۡنَةٌ أَوۡ يُصِيبَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ﴾
‘অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরোধিতা করে, তারা যেন সতর্ক থাকে— তাদের ওপর বিপদ নেমে আসতে পারে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এসে যেতে পারে।” (সুরা নূর, আয়াত : ৬৩)
রাসুল (সা.)-এর আদেশ উপেক্ষা করা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং তা সামগ্রিক সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বিপর্যয় ডেকে আনে।
মহানবী (সা.) আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী। তাঁর আদেশ-নিষেধ কোনো সাধারণ উপদেশ নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য নির্দেশনা। তাঁর আনুগত্যে রয়েছে জান্নাতের অঙ্গীকার, অবাধ্যতায় রয়েছে ধ্বংস ও শাস্তি। তাই প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর আদেশ-নিষেধ আঁকড়ে ধরা।
আসুন আমরা সবাই দৃঢ় অঙ্গীকার করি— ‘আমরা রাসূল (সা.)-এর প্রতিটি আদেশ মান্য করব, তাঁর প্রতিটি নিষেধ থেকে দূরে থাকব, তাঁর সুন্নাহকে জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করব।’
এতে দুনিয়ায় শান্তি আসবে, আর আখিরাতে জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করা যাবে।




