কেমন হবে টিনেজারদের উপর স‍্যোশাল মিডিয়ার এই নতুন নিষেধাজ্ঞা?

Published: 11 December 2025

Dr Zaki Rezwana Anwar FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD

২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে অষ্ট্রেলিয়া টিনেজারদের জন‍্যে (১৬ বছর পর্যন্ত) স‍্যোশাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করেছে!  এই নিষেধাজ্ঞাকে একটি ‘বিশ্বের প্রথম’ (World First) পদক্ষেপে পরিণত করেছে। প্রাথমিকভাবে অনেকে ঢালাওভাবে একে সাধুবাদ জানালেও আমি মনে করি, এর সুবিধা অসুবিধা, ফাঁকফোকর, নিয়ন্ত্রণের নিয়মাবলী, দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং করণীয় – এসব নিয়ে একটি উত্তপ্ত বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। এ প্রশ্নগুলো নিয়েই মূলত আজকের এই কলাম, তবে তার আগে অষ্ট্রেলিয়ার এই পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটটি একটু ছুঁয়ে যেতে যাই।

বিশ্বের অনেক দেশের মত অষ্ট্রেলিয়াতে আসক্তিমূলক অ্যালগরিদম, ক্ষতিকারক বিষয়বস্তুর সংস্পর্শ, সাইবার বুলিং এবং অনলাইন শিশু শোষণ লাগামহীনভাবে  বেড়ে চলেছে। মনোবিজ্ঞানী জনাথন হাইট তাঁর গবেষণা ও বিভিন্ন একাডেমিক লেখায় দেখিয়েছেন যে, ২০০৯-২০১০ সালের পর থেকে টিনেজারদের মধ্যে স্মার্টফোন এবং সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপক প্রচলনের সাথে সাথে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সূচকগুলো দ্রুত খারাপ হয়েছে। তারা বাস্তব জগতের মুখোমুখি না হয়ে একটি ভার্চুয়াল জগতে আটকে থাকে এবং একটুতেই নিজেদেরকে অপ্রতুল মনে করে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, স্ক্রিন টাইম বাড়ার ফলে টিনেজারদের ঘুমের চক্র (Circadian Rhythm) ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় মনোযোগের সময়কাল (Attention Span) মারাত্মক হারে কমে যাচ্ছে।

এসব বিবেচনায় নিয়ে প্রায় ১৩ মাস আগে বিলটি অষ্ট্রেলিয়ার সেনেট ও হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে পাস হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে, দশটি প্ল্যাটফর্মকে এর আওতায় আনা হয়েছে, যার মধ্যে Facebook, Instagram, Snapchat, Threads, TikTok, Reddit, X, Youtube এবং দুটি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম (Twitch ও Kick) অন্তর্ভুক্ত। অস্ট্রেলীয় সরকার বলছে, এই আইনটি সাইবার বুলিং, অনলাইন শিকারী (Online Predators) এবং ক্ষতিকারক বিষয়বস্তু থেকে শিশুদের রক্ষা করার লক্ষ্য নিয়ে করা হয়েছে। শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়, ডেনমার্কসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশও একই ধরনের পদক্ষেপের দিকে নজর দিচ্ছে।

এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ বড় সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মের সর্বনিম্ন বয়সসীমা ১৩ বছর ছিল, কিন্তু এই আইনের অধীনে তা ১৬ বছর করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যালবানিজি বলছেন, তিনি চান শিশুরা শৈশব ফিরে পাক, এবং বাবামায়েরা যেন জানতে পারেন তাঁদের সন্তানরা কী দেখছে। সরকার বলেছে,  ১৬ বছরের আগে এই ‘বিলম্ব’-এর সময়কাল যেন সামাজিক মাধ্যমের ঝুঁকি এবং প্রভাব সম্পর্কে শেখার সময় হয়। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় অবশ‍্য মেসেঞ্জার (Messenger) এবং টিমস (Teams)-এর মতো অ্যাপগুলি পড়ছে না।

চলুন, এবার এ আইনকে ঘিরে প্রশ্নগুলো এক এক ক’রে আলোচনা করি।

ভেবে দেখুন, এই যে ১০টি বড় অ্যাপ নিষিদ্ধ হল, তাহলে শিশুরা বিকল্প হিসেবে কোথায় যাবে? Omegel এর কথা মনে করে দেখুন। যখন বড় প্ল্যাটফর্মগুলো নিষিদ্ধ হয়, তখন টিনেজাররা ওমেগলের মতো অনিরাপদ বা ছোট, অনিয়ন্ত্রিত অ্যাপগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারে যেখানে ঝুঁকি আরও বেশি। আমাদের মনে থাকার কথা, ওমেগেল-এ ‘টক টু স্ট্র্যাঞ্জার্স’ (Talk to Strangers) বা ‘অপরিচিতদের সাথে কথা বলো’ এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। এটি ব্যবহারকারীদের রিয়েল-টাইমে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের সাথে randomly যুক্ত করতে পারত। অতীতে এমন হয়েছে যে Omegal-এর মতো অ্যাপ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, কিন্তু এটিও শিশুদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় কয়েক  বছর আগে বন্ধ হয়ে যায়।

আইন করলেই কি কাজ শেষ?  যারা আইন ফাঁকি দিতে চাইবে? অনেকেই ইতিমধ্যেই ফাঁকি দেওয়ার উপায় নিয়ে অনলাইনে কথা বলছে। মেটা (Meta) সরকারি আইডি বা ভিডিও সেলফি ব্যবহার করতে পারে এবং স্ন্যাপচ্যাট (Snapchat) ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বা ফটো আইডি চাইতে পারে ব’লে জানিয়েছে। কিন্তু অনেকে তাদের মা বাবা এমনকি অন‍্যের ছবি ব্যবহার করেও অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছে বলে এরই মধ্যে খবর পাওয়া গেছে।

এই দশটি বৃহত্তম সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম থেকে তরুণদের দূরে রাখার অর্থ কি সব প্ল‍্যাটফর্ম থেকে দূরে রাখা? শিশুরা কি এমন ছোট প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকবে যেখানে ঝুঁকি বেশি?  লেমন এইট (Lemon 8)-এর মতো ছোট অ্যাপগুলি, যা টিকটকের সাথে সম্পর্কিত, হয়তো এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েনি। তাই তরুণরা হয়তো সেদিকে ঝুঁকতে পারে।

এদিকে ডেটা সুরক্ষার প্রশ্নটিতেও উদ্বেগ রয়েছে। বয়স যাচাইয়ের জন্য এত বিপুল পরিমাণে তথ্য সংগ্রহ করা হলে ডেটা সুরক্ষার ঝুঁকি বাড়বে। যদিও সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলোর কাছে ইতোমধ্যেই প্রচুর ডেটা রয়েছে, তবুও অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে উদ্বেগ থেকেই যায়। বয়স যাচাইকারী সংস্থাগুলো তথ্য সুরক্ষিত রাখার দাবি করলেও, অতীতে ডেটা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যা উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

এই যে অস্ট্রেলীয় সরকার বলছে, যদি কোম্পানীগুলো এ আইন না মানে তাহলে কোম্পানীগুলোকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার (৩৩ মিলিয়ন ইউএস ডলার) পর্যন্ত  জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। মেটা-এর মালিকানাধীন ফেসবুকের অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন প্রধান বলছেন, যে জরিমানার কথা বলা হচ্ছে তা ফেসবুকের মতো ধনকুবের কোম্পানীগুলোর জন্যে কেবল একটি ছোট ‘পার্কিং টিকিট’-এর মতো।

এত কিছুর পরেও আমি বলব, এই উদ‍্যোগের উদ্দেশ‍্য মহৎ এবং এটি একটি চলমান উদ্যোগ। যেহেতু এটি বিশ্বের প্রথম নিষেধাজ্ঞা, তাই অনেক ছোটখাটো ত্রুটি থাকবে। সরকার বলছে, এই সমস্ত প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে ‘যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ’ (Reasonable Steps) নিতে হবে যাতে তরুণরা সাইন আপ করা থেকে বিরত থাকে। তা কি কম্পানীগুলো করবে?  যুক্তরাজ্যের অনলাইন নিরাপত্তা আইন ২০২৩ (Online Safety Act 2023)  মূলত প্ল্যাটফর্মগুলোকে বলে আসছে, প্ল্যাটফর্মগুলোর উচিত তাদের পণ্য শিশুদের জন্য নিরাপদ করা। অপ্রাপ্ত বয়স্করা তাঁদের চোখ টানা যত বেশী সময় ধরে স্ক্রীনের সাথে সাঁটিয়ে রাখবে ততই কোম্পানীগুলোর লাভ!

বর্তমানে সামাজিক মাধ্যম কি শুধুই যোগাযোগের মাধ্যম? সামাজিক মাধ্যম এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি ‘ক্রিয়েটর ইকোনমি’ (Creator Economy) এবং ‘ডিজিটাল ক্যাপিটাল’ (Digital Capital) তৈরির একটি প্রাথমিক প্ল্যাটফর্ম। কঠোর নিষেধাজ্ঞা বরং সচেতন তরুণদের অর্থনৈতিক এবং পেশাগত বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দেবে, যা আধুনিক ডিজিটাল স্বাক্ষরতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সব কিছুর পরে যে নীতিগত বিতর্কটি থেকেই যায় তা হল, রাষ্ট্র আমাদের কতটুকু স্বাধীনতা দেবে আর কতটুকু অভিভাবকত্ব ফলাবে? যারা এই আইনটি তৈরি করছেন, তাঁরা ভিন্ন প্রজন্মের। কোভিডের সময় আমরা এসব অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর স্কুলের পড়াশোনার জন্য কতটা নির্ভরশীল ছিলাম। এই নিষেধাজ্ঞা টিনেজারদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জনে বাধা দিবে,তা হলো সামাজিক মাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যবহার (Responsible use of Social Media)। সম‍স‍্যা হচ্ছে, আমাদের স্কুলে স‍্যোশাল মিডিয়ার নিরাপদ ব‍্যবহার শেখনোর ব‍্যবস্থা নেই। এ বিষয়ে পর্যাপ্ত সংখ‍্যক শিক্ষকও আমরা তৈরী করতে পারনি।

উদ্দেশ‍্য যতই মহৎ হোকনা কেন, মুনাফালোভী কোম্পানীগুলোর অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপের কারণে ও সেইসাথে বেশীরভাগ অবিবেচক ব‍্যবহারকারীর কারণে sensible teenager রা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর ওদিকে অবিবেচক শিশুরা নানা চক্রের সহায়তায় আরো ঘোরতর বিপর্যয়ের দিকে ঝুঁকবে যদি আন্তর্জাতিকভাবে কোম্পানিগুলোর উপর কার্যকর ভূমিকা রাখার ব‍্যপারে চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব না হয় এবং ছোটবেলা থেকে আমরা শিশুদের স্কুলে স‍্যোশাল মিডিয়ার নিরাপদ ব‍্যাবহার না শিখাই॥

…………………………….

লেখক Dr Zaki Rezwana Anwar FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD একজন চিকিৎসক, জনপ্রিয় সিনিয়র সংবাদ পাঠক, কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক স্পীকার।