এনসিপি নেত্রীর লাশ উদ্ধার, রহস্য
পোস্ট ডেস্ক :

রাজধানীর হাজারীবাগের জিগাতলার একটি নারী হোস্টেল থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী জান্নাত আরা রুমীর (৩০) লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার ভোররাত সাড়ে ৩টার দিকে জিগাতলা পুরাতন কাঁচাবাজার এলাকার ২৫/৭/১ রোডের জান্নাতী ছাত্রী হোস্টেলের পঞ্চমতলার একটি রুম থেকে রুমীর লাশ উদ্ধার করে হাজারীবাগ থানা পুলিশ। রুমী এনসিপি’র ঢাকা মহানগর দক্ষিণ (ধানমণ্ডি থানা) সমন্বয় কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী ছিলেন। রুমীর মৃত্যু ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার রাত ১টার দিকে রুমী তার মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে নিজের রুমে প্রবেশ করছেন। এরপর আর তিনি তার রুম থেকে বাইরে বের হননি। রাত ৩টার দিকে বাইরে থেকে মিরাজ নামে এক যুবক এসে বাড়িটির দারোয়ানকে বলেন, আমি ভেতরে যাবো। কিন্তু দারোয়ান তখন তাকে ভেতরে প্রবেশে বাধা দেন। তখন মিরাজ নামে ওই যুবক বলেন, এই বাসার একটি মেয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। দ্রুত খোঁজ নেন। পরে দারোয়ান বিষয়টি বাড়িওয়ালাকে জানান। বাড়ির মালিক তখন তার কাজের লোক রাজিয়াকে খবর নিতে পাঠান। রাজিয়া ৩টা ৭ মিনিটের দিকে প্রথমে বাড়ির চতুর্থ তলায় যান। গিয়ে দেখেন একটি ঘরে দুই শিক্ষার্থী লাইট জ্বালিয়ে বই পড়ছেন। এরপর পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখেন সব রুম অন্ধকার, শুধু একটি মাত্র রুমে আলো জ্বলছে। তখন ওই রুমের দরজায় নক করেন। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ না আসায় তিনি দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। একপর্যায়ে দরজা খুলে গেলে, দেখেন ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় রুমীর লাশ ঝুলছে। রাত ৩টা ৪৬ মিনিটের দিকে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে লাশ উদ্ধার করেন।
ঘটনাস্থলে যাওয়া হাজারীবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শাহদাত হোসেন বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ এর মাধ্যমে আমরা খবর পাই জিগাতলার একটি ছাত্রী হোস্টেলে একজন আত্মহত্যা করেছেন। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো রুমীর ঝুলন্ত লাশ দেখতে পাই। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, হোস্টেলের ঘরগুলো হার্ডবোর্ড দিয়ে পার্টিশন করা, ফলে পাশের রুম থেকে কিছুটা দেখা যায়। ওই বাড়ির গৃহকর্মীই প্রথম দেখেন রুমী সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছেন। এরপর তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে পুলিশকে খবর দেয়। তিনি বলেন, রুমীর ঘরে ডিপ্রেশনের ওষুধ পাওয়া গেছে। আশপাশের লোকজন আমাদেরকে জানিয়েছেন, পারিবারিক কারণে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন।
ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেলে রুমীর লাশ নিয়ে যাওয়া হাজারীবাগ থানার এসআই মো. কামরুজ্জামান বলেন, নিহত রুমী দুইবার বিয়ে করেছেন। প্রথম স্বামীর ঘরে তার একটি মেয়ে এবং দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে একটি ছেলে রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি নওগাঁ জেলার পত্নীতলা থানার নাজিরপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। তার বাবার নাম মো. জাকির হোসেন ও মা নুরজাহান বেগম।
নিহত রুমীর সাবেক স্বামী মো. বিপ্লব সরকার বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার আমাকে হঠাৎ ফোন করে জানানো হয় রুমী আত্মহত্যা করেছে। এরপরই আমি এখানে আসি। তিনি বলেন, রুমী একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে চাকরি করতেন। গত বছরের ৫ই আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার পর এনসিপি’র যুগ্ম সমন্বয়কারী হয় সে। গত ৪/৫ মাস আগে তার সঙ্গে আমার ডিভোর্স হয়। তার আগেও আরেকজন স্বামী ছিলেন। সেখান থেকে ডিভোর্সের পরই আমার সঙ্গে রুমীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর আমরা নওগাঁর নাজিরপুর এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতাম। প্রথম স্বামীর ঘরে রুমীর আট বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। আমার সংসারে তার সাড়ে তিন বছরের একটি ছেলে রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে ঢামেকের মর্গের সামনে ন্যাশনাল হেলথ এলাইন্সের সদস্য সচিব ডা. আবদুল আহাদ বলেন, যারা জুলাইযোদ্ধা আছেন তাদের একের পর এক অপমৃত্যু ঘটছে। তাদের ওপর যে একের পর এক হুমকি আসছে সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। আমরা এই অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রশাসনকে জুলাই যোদ্ধাদেরকে নিরাপত্তা দিতে উদার আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি বলেন, কেউ যদি আগে মারা যান তার মেডিকেল রিপোর্ট একরকম হয় এবং হ্যাংগিং (ঝুলন্ত) অবস্থায় কারোর মৃত্যু হলে সেই রিপোর্ট কিন্তু আরেক রকম হয়। তাই আমরা ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের হেডসহ প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাবো রুমীর লাশের যেন সঠিক মেডিকেল করা হয়। সে আসলেই আত্মহত্যা করেছে, নাকি হত্যার পর তার লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে- এদিকটায় যেন খেয়াল রাখা হয়।
এ সময় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেছেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সম্মুখসারির যোদ্ধা রুমীর মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, কয়েকদিন আগেই আমাদের সহযোদ্ধা ওসমান হাদির ওপর হামলা করা হয়েছে। এর মধ্যেই রুমীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হলো। তিনি বলেন, রুমীকে আগে থেকেই হুমকি দেয়া হয়েছিল এবং তিনি বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। এ বিষয়ে গত ১৩ই ডিসেম্বর রুমী ধানমণ্ডি থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। হুমকিদাতার আইডিসহ বিভিন্ন তথ্য প্রশাসনকে জানানোর পরও প্রশাসন এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আমরা পুলিশ, ডিজিএফআই, এনএসআইসহ প্রশাসনের বিভিন্ন ইউনিটকে যেভাবে তথ্য-প্রমাণ সরবরাহ করছি, সেভাবে আমরা কোনো ফলাফল পাচ্ছি না। সামান্তা বলেন, আমাদের জুলাই ঘোষণাপত্রে জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। আর সংসদ নির্বাচন এমনভাবে আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে প্রশাসনেরও কোনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই। তাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের ওপর নানা ধরনের হুমকি আসছে। এনসিপি’র একাধিক নেতার ওপরে হামলা ও হুমকি চলমান রয়েছে। এটা শুধু এনসিপি’র ব্যাপার নয়, এটা সমগ্র বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয়।
হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, গত মাসের ২৬ তারিখে ওই হোস্টেলে ওঠেন জান্নাত আরা রুমী। তিনি পঞ্চম তলার একটি রুমে থাকতেন। সেই রুম থেকেই তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকালে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আমরা আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাই করছি। এই বিষয়ে তার পরিবার বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলাও দায়ের করেছে। এরপরও আমরা পুরো বিষয়টি তদন্ত করছি। আশপাশের লোকজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।




