জোট ইস্যুতে যেসব ভয়ঙ্কর তথ্য দিয়ে দল ছাড়লেন এনসিপি নেত্রীরা
পোস্ট ডেস্ক :

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) শুরু হয়েছে বড় ধরনের ভাঙন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট ও আসন সমঝোতার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে পদত্যাগের মিছিলে যোগ দিয়েছেন দলের শীর্ষ দুই নারী নেত্রী—তাসনূভা জাবীন ও ডা. তাসনিম জারা। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তারা জামায়াতের সঙ্গে জোট করার প্রক্রিয়াকে ‘ভয়ংকর পরিকল্পনা’ এবং ‘অবিশ্বাস ও অনাস্থার’ রাজনীতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রোববার (২৮ ডিসেম্বর) দুপুরে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক তাসনূভা জাবীন নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ পোস্টে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের সাথে জোটের বিষয়টি কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং এটি একটি সুনিপুণ পরিকল্পিত ছক। ১২৫ জনকে মনোনয়ন দিয়ে শেষ মুহূর্তে মাত্র ৩০টি আসনের সমঝোতা করে বাকিদের নির্বাচনের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
জাবীন আরও বলেন, ‘‘পুরো জুলাইকে নিয়ে রাজনৈতিক কৌশলের নাম করে তুলে দিচ্ছে জামায়াতের হাতে। যে এনসিপিকে জামায়াতের ‘আরেকটা দোকান’ বলা হয়, সেই অপবাদ ঘুচানোর বদলে নেতারা কেন জামায়াতকে বেছে নিতে মরিয়া হয়ে যাচ্ছেন?’’ তিনি অভিযোগ করেন, এনসিপি নারী ও মধ্যপন্থার রাজনীতি করার কথা বললেও বাস্তবে জামায়াতের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
তাসনূভা জাবীন আরও জানিয়েছেন, যারা তাকে নির্বাচনের জন্য অনুদান দিয়েছেন, তাদের প্রতিটি পয়সা তিনি পর্যায়ক্রমে ফেরত দেবেন। তিনি বলেন, ‘‘পুরোনো ফাঁকা বুলির রাজনীতি করতে হলে পুরোনো দলই করতাম। এনসিপি এখন আর জুলাইয়ের স্পিরিট চর্চা করে না, বরং সেটাকে ব্যবহার করে।’’
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিনও জামায়াতের সঙ্গে জোটের ঘোর বিরোধিতা করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্ভরযোগ্য মিত্র নয়। তাদের সাথে কোনো সমঝোতায় যাওয়া এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে।’’ তিনি মনে করেন, জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন এনসিপির ঘোষিত রাষ্ট্রকল্প ও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ ধারণার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
এর আগে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা পদত্যাগ করে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। তিনি কোনো জোটের অধীনে নয়, বরং সরাসরি জনগণের মুখোমুখি হতে চান। এ ছাড়া দলের আরও ৩০ জন নেতা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জামায়াতের সাথে জোটের বিষয়ে লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছেন।
এদিকে জামায়াতের সাথে জোট নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন এনসিপির আরও তিন শীর্ষ নেত্রী। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, যুগ্ম সদস্যসচিব নুসরাত তাবাসসুম ও যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. মাহমুদা মিতু ফেসবুক পোষ্ট দিয়ে তাদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
সামান্তা শারমিন তার পোস্টে বলেছেন, আমরা লড়াই ছাড়ব না। আল্লাহ সহায়। আর নুসরাত তাবাসসুম লিখেছেন, নীতির চাইতে রাজনীতি বড় নয়। কমিটমেন্ট ইজ কমিটমেন্ট।
অন্যদিকে ডা. মাহমুদা মিতু লিখেছেন, এক পয়সা দিয়েও দেশি ভান ধরা পশ্চিমা গং বিশ্বাস করি না। এর চেয়ে যারা ওপেন বলে-কয়ে পশ্চিমা এজেন্ডার পক্ষ নেয় তাদের স্যালুট।
এনসিপির পদত্যাগী নেত্রীরা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শ ও নারীদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এনসিপির নারী নেতাদের জন্য এক বড় আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমালোচকদের মতে, জামায়াতের ‘বট বাহিনী’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমতাবলম্বী নারীদের ওপর নোংরা সাইবার বুলিং চালায়। মুক্তচিন্তার নারী নেত্রীদের জন্য এই পরিবেশ কখনোই নিরাপদ নয়।
এই গণপদত্যাগ এবং শীর্ষ নারী নেতাদের প্রকাশ্য বিরোধিতার ফলে এনসিপি এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একদিকে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা, অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরীণ নীতিগত বিচ্যুতি—সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের এই দলটি এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।




