দ্য স্টেটসম্যানের প্রতিবেদন

দ্য স্টেটসম্যানের প্রতিবেদন
ভারত আনুগত্যের মূল্য দিতে হয়েছে হাসিনাকে

Published: 31 December 2025

পোস্ট ডেস্ক :


বাংলাদেশের ‘লড়াকু দুই বেগমের’ পাঁচ দশকের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি ঘটলো। এ লড়াইয়ে ভারতের প্রতি আনুগত্যের মূল্য দিতে হয়েছে শেখ হাসিনাকে। দুই দফার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া (৮০) মঙ্গলবার সকালে জীবনের সঙ্গে লড়াইয়ে হার মানলেন। আর দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা গতবছর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত। তবে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করা হলেও, খালেদার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)কে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনলাইন দ্য স্টেটসম্যানে প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে এমনটাই লিখেছেন সাংবাদিক মাহেন্দ্র ভেদ।

তিনি আরও লিখেছেন- খালেদার মৃত্যু, অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে হলেও, তার ছেলে তারেক রহমানের জন্য নেতৃত্বের পথ পরিষ্কার করল। বেদনাদায়ক বিষয় হলো- লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে, মাত্র পাঁচ দিন আগে তার অসুস্থ মায়ের সাথে তার পুনর্মিলন ঘটে যেন শেষ বিদায় জানাতেই। নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রচলিত ধারণায় এই পরিস্থিতি জিয়া পরিবারকে ‘সহানুভূতি ফ্যাক্টর’-এর বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। তবে বিএনপি বৃহত্তম মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আগে থেকেই প্রচারণায় আছে। তারেক রহমানের মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার জন্যও মনোনয়ন দাখিল করা হয়েছে। অসুস্থ দলীয় প্রধানকে সম্মান জানানো ছাড়াও এটি নির্বাচনী কৌশলের অংশ হতে পারে। বাংলাদেশে অনেক শীর্ষ রাজনীতিক সংখ্যার ভারসাম্যের কথা মাথায় রেখে একাধিক আসনে প্রার্থী হন।

ফিরে তাকালে দেখা যায়, এই দুই নারী উত্তরাধিকারসূত্রে পারিবারিক রাজনীতি পেয়েছেন। শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে নিহত হন। খালেদা নেতৃত্ব দেন তার স্বামী, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে। ১৯৮১ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন জিয়া। এই দুই বিরোধী উত্তরাধিকার রাজনৈতিক আধিপত্য ও ক্ষমতার লড়াইয়ে বারবার মুখোমুখি হয়েছেন। এর স্বাভাবিক ফল ছিল তিক্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ক।

দুই বেগম কেবল একবারই এক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছিলেন। সেটা আশির দশকের শেষ দিকে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে হটাতে বৃহত্তর আন্দোলনের সময়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া জয়ী হন। হাসিনা পরাজিত হন। ১৯৯৬ সালে পালাবদল হয়। তবে ২০০১ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরেন খালেদা জিয়া। এ সময়টায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হয়। ১/১১ এর পর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির মামলায় তাদের দু’জনকেই কারাগারে পাঠানো হয়। ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরেন শেখ হাসিনা। তিনি ঢাকায় জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম বদলে ফেলেন। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পাল্টা রাজনীতির মাধ্যমে হাসিনা তার প্রতিপক্ষকে জবাব দেন।

দু’জনই ক্ষমতার বাইরে ছিলেন ২০০৬-০৮ সালে। ওই সময় ক্ষমতায় ছিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেই সরকার তাদের রাজনীতি থেকে নির্বাসনে পাঠাতে পারেনি। পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতে আমেরিকা যান শেখ হাসিনা। তাকে দেশে ফিরতে বাধা দেয়া হয়। তিনি লন্ডন হয়ে দেশে ফেরার লড়াই করেন। সেখানে বৃটিশ জনমত তার পক্ষে দাঁড়ায়। খালেদাকেও জেল থেকে মুক্তি ও ছেলেদের জন্য দায়মুক্তি দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি নির্বাসন প্রত্যাখ্যান করেন। ‘মাইনাস-টু’ পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। আর বাংলাদেশ ফিরে যায় ‘দুই বেগমের লড়াইয়ে’।
ন্যায্যতার খাতিরে বলা যায়- খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার পতনে প্রকাশ্যে উল্লাস করেননি। ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি’র পক্ষে থাকা বিএনপি শুরুতে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে। ভাগ্য খালেদা জিয়াকে আরেকবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ না দিলেও, জীবনের শেষ দিনগুলোয় তিনি বিপুল জনসমর্থন পান। ইউনূস প্রশাসনও সরকারি সহযোগিতা দেয়। ঢাকার সর্ববৃহৎ হিন্দু উপাসনালয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে তার জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন হয়।

এটি শুধু একজন নারী নেত্রীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনই নয়, বরং এটাই দেখায় যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাতাস কোন দিকে বইছে- যা মুসলিম বিশ্বে যথেষ্ট বিরল ঘটনা।

যেকোনো বাংলাদেশি রাজনীতিকের মতো খালেদা-হাসিনাও ভারতের বিষয়টি বোঝেন। পারিবারিক উত্তরাধিকারগত কারণেই হাসিনা ভারতের প্রতি অনুকূল অবস্থানে ছিলেন। এর রাজনৈতিক মূল্যও তাকে দিতে হয়েছে। এটি আওয়ামী লীগের তুলনামূলক ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকেও প্রভাবিত করেছে। খালেদার সে ধরনের কোনো বোঝা ছিল না। হাসিনার পতনের আগেই প্রশ্ন উঠেছিল- কেন ভারত তার সব রাজনৈতিক পুঁজি এক ঝুড়িতে রেখেছে। এটি খালেদার মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। তিনি একসময় প্রণব মুখার্জিকে এ নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন। ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট, দক্ষ রাজনীতিক প্রণব মুখার্জি, যদিও হাসিনার পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তবু রাজনৈতিক ভারসাম্যের পক্ষে কথা বলেন।

খালেদা তাকে বলেছিলেন- ‘আপনারা সবসময়ই হাসিনাকেই সমর্থন করবেন।’
পরে প্রণব মুখার্জি বলেছিলেন- ‘আমি তাকে বলেছিলাম, কখন বলেছি যে তুমি আমার ছোট বোন নও?’