খালেদা জিয়া–যার হৃদয়ে ছিল শুধুই বাংলাদেশ
আনিসুর রহমান

আমরা অনেক সময় পুরো বিষয়টা ভালোভাবে অনুধাবন না করে বলি যে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন এবং ইচ্ছা হলে যে কাউকে সম্মান থেকে বঞ্চিত করেন। না, যিনি সবচেয়ে ন্যায় বিচারকারী, সবচেয়ে সুবিবেচক–সেই স্রষ্টা এমন খাম-খেয়ালিভাবে সিদ্ধান্ত নেন না। তিনি তাকেই সম্মানিত ও মহিমান্বিত করেন–যিনি তার যোগ্য এবং যেটি তার প্রাপ্য। অধঃপতিত হন তিনিই যিনি সম্মান পাওয়ার যোগ্য নন বা তা ধরে রাখতে পারেন না। খালেদা সেই সম্মান মহান ও সর্বশক্তিমান স্রষ্টার কাছ থেকে অর্জন করেছেন। বিপরীত কাজ করে অন্যজন তা বিসর্জন দিয়েছেন।
চিরনিদ্রায় শায়িত বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালোবাসার ও শ্রদ্ধার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ারও একটি শুকতারা ছিল। সেটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা– সার্বভৌমত্ব, বাংলাদেশের মানুষ ও তাদের স্বার্থ, এক কথায় সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ। যাকে অন্য কথায় বলা যায় ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ।’ এর প্রতিদানে সকল দেশপ্রেমিক মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন তাদের শুকতারা। এই সেই নেত্রী যার হৃদয়ে বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো ঠিকানা ছিল না। যাকে তৎকালীন পরাক্রমশালীরা শত চেষ্টা করে উন্নত দেশেও পাঠাতে পারেনি।
প্রবাদ আছে, আগুনে পোড়া ফিনিক্স পাখি ভস্ম থেকে উঠে দাঁড়ায়, পুনর্জন্ম লাভ করে। বেগম খালেদা জিয়াকেও ধ্বংস বা শেষ করে দেয়ার দ্বারপ্রান্তে কয়েকবারই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু কী এক অলৌকিক ক্ষমতাবলে প্রতিবারই তিনি সেই মহা বিপর্যয়ের খাদের কিনারা থেকে উঠে এসেছেন আরও শক্তিশালী হয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একমাত্র তিনিই রাজনীতির ফিনিক্স পাখি–যিনি এখন প্রকৃতির নিয়ম মেনে চিরনিদ্রায় গেছেন।
ইংরেজিতে ‘Larger than life’ বলে একটি কথা আছে। বেগম জিয়া তার কর্মের দ্বারা, এমনকি তার দল বিএনপির চেয়েও বড় হয়ে ওঠেন। সেটি ভালো কী মন্দ তা নিয়ে তর্ক করা যেতে পারে। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটির উচিত হবে বেগম জিয়া বিএনপিকে যে পর্যায়ে রেখে গেছেন কমপক্ষে তা ধরে রাখা। সন্দেহ নেই, একে ছাড়িয়ে যাওয়ার ‘বার’ বা লক্ষ্যটা অনেক উঁচু।
রাজনীতির কুশীলবরা এখন বড় বেশি রূঢ় হয়ে গেছেন। অনেকেই চাতুর্য ছাড়িয়ে ধুরন্দরতাকে কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং এটিই এখনকার স্বাভাবিক চিত্র হয়ে উঠেছে। শালীনতা, সৌজন্যবোধ, ভব্যতা লোপ পেয়ে যাচ্ছে। এখানে বেগম খালেদা জিয়া একজন জাজ্বল্যমান ব্যতিক্রম। তার এই গ্রেস বা দ্যুতি ছড়ানো কোমল উপস্থিতি মানুষকে মুগ্ধ করেছে। রাজনৈতিক বক্তব্য বা অবস্থানে তিনি আপসহীন হলেও ভব্যতার সীমা তিনি কখনো সামান্যতম অতিক্রম করেননি।
বাংলাদেশের স্বার্থের ব্যাপারে, নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাপারে তিনি এতোটাই আপসহীন ছিলেন যেন সুকান্তের কবিতা ‘সাবাস বাংলাদেশ/এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার/তবু মাথা নোয়াবার নয়’-অবিকল তার মাঝে মূর্ত হয়ে ছিল। এজন্য তাকে বৈরী বিদেশি শক্তির কাছে চরম মূল্য দিতে হয়েছে বটে! কিন্তু তাকে তার অবস্থান ‘আমরা প্রভু নয়, বন্ধু চাই’ থেকে এক চুলও নড়ানো যায়নি।
বেগম খালেদার কি সীমাবদ্ধতা, ভুল-ভ্রান্তি ছিল না? অবশ্যই ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার তেমন বেশি ছিল না। কিন্তু তা কাটিয়ে উঠেছেন তিনি অনেক জ্ঞানী-গুণী উচ্চ শিক্ষিত উপদেষ্টাকে সঙ্গে রেখে। আকবরের নবরত্ন সভা ছিল। খালেদারও উপদেষ্টামণ্ডলী ছিল সে রকম জ্ঞানীদের সমন্বয়ে। এবং তিনি তাদের উপদেশ, পরামর্শ মেনে নিতেন। তার প্রতিপক্ষ নেত্রীর চারপাশেও এরকম উচ্চ শিক্ষিত লোকজন ছিলেন। কিন্তু তারা ছিলেন অনেকটা শোভাবর্ধনকারীর মতো। আবার এদের কেউ কেউ উচ্চ শ্রেণির স্তাবকে পরিণত হন। খালেদা জিয়ার সময় শিক্ষাখাত বিশেষ অগ্রাধিকার পায়। নারী শিক্ষার উন্নয়নে তিনি কয়েকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মহামারি আকারের নকল বন্ধ করেন।
খালেদা জিয়া দেশমাতা অভিধায়ও ভূষিত। তার কর্মীদের মধ্যে তিনি মা-এর আসনে আসীন। তার জানাজায় আসা হাজারো নেতাকর্মী তাকে মা মা বলে ডেকে ডুকরে কান্না করেছেন। একজন মহীয়সী নেত্রীর জন্য এর চেয়ে সম্মানের, শ্রদ্ধার আর কিছু হতে পারে না।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জীবনের অমোঘ নিয়ম মেনে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে নশ্বর পৃথিবীকে বিদায় জানাতে হয়েছে। কিন্তু এমন জীবনের দৈহিক অবসান হলেও তার আত্মিক মৃত্যু নাই। দেশবাসীর কাছে তার উপস্থিতি থেকে যাবে তার কর্মের মাঝে।
তার এফিটাফে খোদাইকরা যে সান্ত্বনার বাক্যটি লেখা যেতে পারে তা হলো–তিনি তার সংগ্রামের একটি প্রধান লক্ষ্যের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পেরেছিলেন। তার জীবদ্দশায়ই ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের পতন হয়েছিল–যাতে তার একটি নির্ধারনী ভূমিকা ছিল।
লেখক: সুইডেন প্রবাসী একজন সিনিয়র বাংলাদেশি সাংবাদিক।




