যেভাবে আটক হন মাদুরো

Published: 6 January 2026

পোস্ট ডেস্ক :


যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরেরা মাসের পর মাস ধরে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রেখেছেন। দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা বলেন, এ কাজে ভেনেজুয়েলা সরকারে থাকা একটি সূত্রও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। যারা যুক্তরাষ্ট্রের ছোট্ট দলটিকে সহায়তা করেছেন। ভেনেজুয়েলার ওই দলটির কাজ ছিল মাদুরো কোথায় ঘুমান, কী খান, কী পরেন, রোজ কী কী কাজ করেন- এসব কিছু নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা। এরপর ডিসেম্বরের শুরুতে ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ নামে এক মিশনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। এটি ছিল বহু মাস ধরে করা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিকল্পনা আর অনুশীলনের (রিহার্সাল) ফল, যাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট শাখা ডেলটা ফোর্সকে। অভিজাত এ বাহিনীর সদস্যরা মাদুরোর প্রাসাদের সমান আকারের একটি মডেল বানিয়ে অনুশীলন করেছেন।

এ খবর দিয়ে বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনাকে বলা হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধের পর লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক অভিযান, যা ছিল চূড়ান্ত গোপনীয়। মার্কিন কংগ্রেসকে এ পরিকল্পনার বিন্দুবিসর্গ জানানো হয়নি, ভেনেজুয়েলায় হামলার আগে কোনো আলোচনাও হয়নি। পরিকল্পনার খুঁটিনাটি নিখুঁত পর্যালোচনার পর শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছিল অভিযান শুরুর সর্বোত্তম পরিস্থিতির জন্য। শনিবার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা আচমকা হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলাকে বিস্মিত করে দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। চারদিন আগে যখন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অভিযানের অনুমোদন দিয়েছিলেন, ভালো আবহাওয়া থাকবে, এমন সময়ে অভিযানের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন কর্মকর্তারা। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বড়দিন এবং নতুন বছরের পুরো সপ্তাহ জুড়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রস্তুত ছিলেন, ধৈর্য ধরেছেন সঠিক সময়ের জন্য এবং অভিযান শুরু করতে প্রেসিডেন্টের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করেছেন।
অভিযান শুরুর নির্দেশ: শেষ পর্যন্ত শুক্রবার রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে অভিযান শুরুর নির্দেশ আসে। আমরা এটা করতে যাচ্ছিলাম চারদিন আগে, তিনদিন আগে, দুইদিন আগে- তারপর হঠাৎ করেই সবকিছু (পরিকল্পনার সঙ্গে) মিলে গেল এবং আমরা সঙ্গে সঙ্গে বললাম, শুরু-ভেনেজুয়েলায় মধ্যরাতে অভিযান চালানোর পর শনিবার এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ট্রাম্প নিজেই এ কথা বলেন। ট্রাম্পের নির্দেশ এমন সময় আসে, যখন কারাকাসে মধ্যরাত। ফলে মার্কিন সেনাবাহিনী অভিযানের বড় অংশটি রাতের অন্ধকারেই চালাতে পেরেছে। ভেনেজুয়েলার জল, স্থল আর আকাশসীমায় ২ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের সেই ক্ষিপ্র অভিযান ওয়াশিংটন ও বিশ্বের বহু মানুষকেই চমকে দিয়েছে। অভিযানের মাত্রা এবং নির্ভুল নিশানা ছিল কার্যত নজিরবিহীন।

অভিযানের সময় ট্রাম্প ওয়াশিংটনের সিচুয়েশন রুম থেকে তা দেখেননি। বরং তিনি ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচে মার-এ-লাগো ক্লাবে বসে সিআইএ পরিচালক জন ডক্লিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাশে বসিয়ে নিজের উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে অপারেশনের লাইভ স্ট্রিম দেখেছেন। শনিবার ট্রাম্প বলেন, অভিযান দেখাটা ছিল এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আপনি যদি দেখেন, কী ঘটছে, মানে আমি দেখছিলাম যেন-বা এটা একটা টেলিভিশন শো। আপনি যদি এর গতি আর সহিংসতা দেখতেন, দারুণ একটা ব্যাপার, ওরা (সামরিক বাহিনী) একটা অসাধারণ কাজ করেছে।

প্রাথমিকভাবে ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’-এর পরিকল্পনা ছিল আকাশপথেই অভিযান চালানো। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারা রাতে বোমারু বিমান, যুদ্ধবিমান, নজরদারি করার বিমানসহ দেড় শতাধিক উড়োজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছিল অভিযানে। ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, এটা খুব জটিল, খুবই জটিল, পুরো কৌশল, ল্যান্ডিং, বিমানসংখ্যা- সবকিছু মিলে। প্রতিটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য আমরা একটি করে যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রেখেছিলাম। রাত দুইটার দিকে কারাকাসে বিস্ফোরণের বিকট আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল এবং দূর থেকে শহরের উপরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যেতে থাকে।
‘তারা জানতো, আমরা আসছি’: কারাকাসের চারপাশে হামলা শুরুর পর, মার্কিন বাহিনী শহরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। বিবিসি’র যুক্তরাষ্ট্রের পার্টনার সিবিএসকে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ওই বাহিনীর সঙ্গে ছিল সামরিক বাহিনীর এলিট ফোর্স ‘ডেলটা ফোর্স’, এটি মূলত মার্কিন বাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালনার শীর্ষ বাহিনী। তারা ছিল নানা রকম সর্বাধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত- সঙ্গে ছিল ব্লোটর্চ নামের একধরনের আগুনবাহী সিলিন্ডার, যদি মাদুরোর প্রাসাদে কঠোর নিরাপত্তা ঘেরাটোপের মধ্যে কোনো ধাতব দেয়াল বা দরজা কেটে ফেলতে হয়, তার প্রস্তুতি হিসেবে ওই অস্ত্র নেয়া হয়। জেনারেল কেইন জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় রাত ২টা ১ মিনিটে অভিযান শুরুর কিছুক্ষণ পরই মাদুরোর অবস্থানে পৌঁছে যায় মার্কিন বাহিনী।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাদুরোর সেফ হাউসকে কারাকাসের মাঝখানে এক ‘নিশ্ছিদ্র সামরিক দুর্গ’ বলে বর্ণনা করেন। তারা যেন আমাদের জন্য তৈরি হয়েই ছিল। তারা জানতো যে আমরা আসছি, বলেন তিনি। মার্কিন বাহিনী পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সেনাদের লড়াই হয় এবং একটি আমেরিকান হেলিকপ্টারেও হামলা চালানো হয়। যদিও তারপরও সেটি উড়তে পারছিল। জেনারেল কেইন বলেন, মার্কিন বাহিনী এরপর মাদুরোর প্রাসাদ প্রাঙ্গণে নেমে তীব্রগতিতে, যথাযথভাবে এবং শৃঙ্খলার সঙ্গে এগিয়ে যায়।

এরপর তার প্রাসাদে ঢুকে পড়ে এবং এমন জায়গায় ঢুকে পড়ে, যা আসলে ভাঙা সম্ভব ছিল না। মানে সেখানে ছিল স্টিলের দরজা- যা কেবল এমন পরিস্থিতির জন্যই বসানো হয়েছিল, বলেন ট্রাম্প। তিনি আরও বলেন, মাদুরোর বাড়ির প্রাঙ্গণে, অভিজাত ডেলটা ফোর্সের সেনারা যখন ঢুকছিলেন, তখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট একটি নিরাপদ কক্ষে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি একটি নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেটি নিরাপদ ছিল না। কারণ, ওই দরজা মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মধ্যে উড়িয়ে দেয়া হতো। শনিবার স্থানীয় সময় ভোররাত ৪টা ২০ মিনিট নাগাদ মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিয়ে একটি হেলিকপ্টার ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ড ত্যাগ করে। পরে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে গ্রেপ্তারের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।