গ্রীনল্যান্ড সঙ্কটে ইউরোপের শিক্ষণীয় কি?

Dr Zaki Rezwana Anwar FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD
একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতিতে আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে যুক্তিবাদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের চাইতে ‘লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি’ (Transactional Diplomacy) এবং গায়ের জোরই প্রধান হয়ে উঠছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন এবং গ্রীনল্যান্ড দখলের জেদ কেবল একটি দ্বীপের মালিকানা পরিবর্তনের দাবি নয়, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর লিবারেল ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বিশ্ব ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার এক মহড়া। এ পরিস্থিতি যে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের বন্ধুত্বকে খাদের কিনারায় নিয়ে এসেছে তা-ই নয়, এ যেন বিশ্ব অর্থনীতির জন্যে এক অশনি সংকেত। শুধু তাই নয়, unpredictable ট্রাম্পের হুমকি বা আশ্বাস কোনো কিছুর উপরই ভরসা করা যায়না।
ভূ-রাজনীতির নতুন নাট্যমঞ্চ গ্রীনল্যান্ড কেন? বরফে ঢাকা একটি দ্বীপের জন্যে ট্রাম্প কেন নিজের দীর্ঘদিনের মিত্রদের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধে জড়াতে চাইছেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে দু’টি শব্দের মধ্যে: সম্পদ ও নজরদারি। আর্কটিক অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলছে। ফলে উন্মুক্ত হচ্ছে বিলিয়ন ডলারের বিরল খনিজ সম্পদ (Rare-earth metals) এবং লিথিয়ামের ভাণ্ডার যা বর্তমানের চিপ-যুদ্ধ (chip war) এবং সবুজ শক্তি বিপ্লবের প্রধান জ্বালানি। আধুনিক সভ্যতার প্রতিটি ইঞ্চি চিপের ওপর নির্ভরশীল। আপনার স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, গাড়ি থেকে শুরু ক’রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সুপারকম্পিউটার এবং অত্যাধুনিক মিসাইল বা যুদ্ধবিমানের চালিকাশক্তি হলো এই ক্ষুদ্র চিপ। এছাড়া ভৌগোলিকভাবে গ্রীনল্যান্ড হলো উত্তর মেরুর এমন এক ‘ওয়াচ টাওয়ার’, যেখান থেকে রাশিয়া ও চীনের ওপর সরাসরি নজরদারি সম্ভব। তাই ট্রাম্পের কাছে গ্রীনল্যান্ড কোনো দেশ নয়, এটি একটি অতিকায় ‘রিয়েল এস্টেট প্রজেক্ট’ যা যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামরিক এবং অর্থনৈতিক আধিপত্য নিশ্চিত করবে।
আমরা দেখে আসছি ট্রাম্পের কূটনীতির ষ্টাইল সবসময়ই ‘বুলিং’ বা ভয় দেখানোর ওপর ভিত্তি করে চলে। কারো সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার আগেই তাঁকে বুলি ক’রে তারপর আলোচনার টেবিলে বসেন। ডেনমার্ক যখন গ্রীনল্যান্ড বিক্রির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, ট্রাম্প তখন তাঁর সবচাইতে প্রিয় অস্ত্রটি বের করেছেন – শুল্ক বা ট্যারিফ। ট্রাম্পের কাছে শুল্কই যুদ্ধের হাতিয়ার। ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, নরওয়ে, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানি সহ আটটি ইউরোপীয় দেশের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। কতটুকু শুল্ক আরোপ করবেন বা আদৌ করে কিনা সেটা পরের কথা, তবে ইউরোপের সাথে আলোচনায় বসার আগেই তিনি বুলি করছেন পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণে আনতে। এটি ইউরোপকে হাঁটু গেড়ে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করার একটি রণকৌশল। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া ট্রাম্পের চিঠিটি ট্রাম্পের মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটায়। চিঠিতে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার ক্ষোভকেও গ্রীনল্যান্ড ইস্যুর সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন। এটি আধুনিক ইতিহাসে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম অবমাননা।

কথা হচ্ছে, ইউরোপ কেন ট্রাম্পের এমন অযৌক্তিক দাবির বিরুদ্ধে একযোগে পালটা আঘাত হানতে পারছে না? ইউরোপের হাতে যে একমাত্র বড় অস্ত্রটি রয়েছে, তা হলো ‘অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট’ (ACI)। একে বলা হয় ‘ট্রেড বাজুকা’। এটি এমন এক আইনি কাঠামো যা কোনো দেশের অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল মোকাবিলা করার জন্য তৈরি। এর মাধ্যমে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ৯৩ বিলিয়ন ইউরোর পালটা শুল্ক বসাতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে এটি মার্কিন টেক জায়ান্টদের ওপর বিশাল জরিমানা বা ইইউ বাজারে তাদের নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেয়। কিন্তু বাস্তবতার জমিনে এই ‘নিউক্লিয়ার অপশন’ প্রয়োগ করা হবে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এর মূল কারণ ইউরোপের ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্বহীনতা’ বা ইউরোপের ‘ডিজিটাল বন্দিদশা’। এ এক অদৃশ্য শৃঙ্খল!
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বৃটেন সম্মিলিতভাবে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কার্যত জিম্মি। গুগলের সার্চ ইঞ্জিন, মেটার সোশ্যাল মিডিয়া (ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম), অ্যমাজন এবং মাইক্রোসফটের ক্লাউড কম্পিউটিং ছাড়া ইউরোপের ব্যাংক থেকে শুরু ক’রে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক যোগাযোগ এবং সেইসাথে ইউরোপের ডেটা এবং ক্লাউড অবকাঠামোর প্রায় ৮০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ মার্কিন কোম্পানিগুলোর হাতে। বৃটেনও এর বাইরে নয়, তাদের সরকারি সেবা থেকে শুরু ক’রে গোয়েন্দা কার্যক্রম পর্যন্ত মার্কিন প্রযুক্তির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। সিলিকন ভ্যালির উপর এই অতি-নির্ভরশীলতা ইউরোপকে একটি ‘ভ্যাসাল স্টেট’ বা আজ্ঞাবহ অঞ্চলে পরিণত করেছে। ট্রাম্প জানেন, ইউরোপ গর্জাতে পারলেও কামড়াতে পারবে না, কারণ তাদের সমস্ত ডিজিটাল লাইফলাইন ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে।

ইউরোপ যদি পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর শুল্ক বসায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশোধ হিসেবে তাদের সফটওয়্যার আপডেট বা ক্লাউড সার্ভিস বন্ধ করে দিতে পারে। এতে ইউরোপ ও বৃটেনের পুরো প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক কাঠামো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অচল হয়ে পড়বে। গুগলের বিকল্প কোনো সার্চ ইঞ্জিন বা অ্যমাজনের বিকল্প কোনো শক্তিশালী ক্লাউড সিস্টেম ইউরোপের কাছে বর্তমানে নেই। বিকল্পহীন এই বাজারে পালটা আঘাত হানলে ইউরোপ নিজের পায়েই কুড়াল মারবে। সে কারণেই কিয়ার স্টার্মার একদিকে ইউরোপীয় সংহতির কথা বললেও, অন্য দিকে মার্কিন টেক বিনিয়োগ হারানোর ভয়ে ‘বাজুকা’ প্রয়োগে চরম অনীহা প্রকাশ করেছেন। ইউরোপ যতদিন নিজস্ব শক্তিশালী টেক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারছে ততদিন তারা অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের পাশাপাশি টেক ব্ল্যাকমেইলিং এর স্বীকার হতে পারে।
বৃটিশ ও ইউরোপীয় নেতারা বুঝতে পারছেন, এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য যুদ্ধ মানেই বিশ্ব বাজারে ধস নামা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া। জার্মানি ইতোমধ্যে তিন বছর ধরে মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফ্রান্স এবং বৃটেনের অর্থনীতিও নড়বড়ে। এছাড়া ব্রেক্সিটের পর বৃটেন এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝামাঝি এক ভঙ্গুর অবস্থানে। এছাড়া ইইউ-এর অভ্যন্তরেও ফাটল স্পষ্ট। হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান বা স্লোভাকিয়ার রবার্ট ফিতসোর মতো নেতারা ট্রাম্পের সাথে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা করতেই বেশি আগ্রহী। ইউরোপীয় ঐক্যের এই ভাঙন ট্রাম্পকে গ্রীনল্যান্ড অভিযানে আরো সাহসী ক’রে তুলেছে।
ঠিক এই সময়েই ট্রাম্পের গ্রীনল্যান্ড উন্মাদনার পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং নজর ঘোরানোর কৌশলের মত সূক্ষ্ম কারণ থাকতে পারে। জেফরি এপস্টাইন মামলার নতুন নথি এবং তার ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি নিয়ে যখনই যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর সমালোচনা বাড়ে, ট্রাম্প তখনই এমন কোনো বড় ইস্যু সামনে নিয়ে আসেন যা পুরো বিশ্বের নজর ঘুরিয়ে দেয়। ‘গ্রীনল্যান্ড দখল’ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্টকে উসকে দেওয়ার এক অব্যর্থ উপায়। তিনি বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করছেন যেন তিনি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা বাড়াচ্ছেন না, বরং চীন ও রাশিয়ার হাত থেকে উত্তর মেরুকে ‘উদ্ধার’ করছেন। এর ফলে অভ্যন্তরীণ চাপ থেকে রক্ষা পেয়ে তিনি নিজেকে একজন ‘ডিল মেকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পাচ্ছেন।

তবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ড দখল করবেন কিনা, করলে ইউরোপ কি করবে সে বিষয়ে ইউরোপ নিশ্চয়ই ভাবছে। ইউরোপ আত্মসমর্পণ করলে ইউরোপের গণতান্ত্রিক মর্যাদা শেষ হবে, আর পাল্টা লড়াই করলে অর্থনীতি পঙ্গু হবে। আমার ধারণা শেষ পর্যন্ত হয়তো একটি ‘মধ্যপন্থা’ বা ‘Transactional Deal’ খোঁজা হবে। ডেনমার্ক হয়তো সার্বভৌমত্ব ছাড়বে না, কিন্তু তারা গ্রীনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রকে খনি উত্তোলনের একচ্ছত্র অধিকার এবং নতুন সামরিক ঘাঁটি গড়ার অনুমতি দেবে।
কিন্তু এতে কি সমস্যার সমাধান হবে? সম্ভবত না। কারণ ট্রাম্পের এই আচরণ ন্যাটোর (NATO) মতো পুরনো জোটগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা চিরতরে নষ্ট ক’রে দিচ্ছে। যদি একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর মিত্রদের ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেন এবং বাণিজ্য দিয়ে তাদের কণ্ঠরোধ করতে চান, তবে ভবিষ্যতে সেই মিত্ররা অন্য কোনো শক্তির (যেমন চীন বা রাশিয়া) দিকে ঝুঁকে পড়বে কি না, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
ইউরোপের এখন কী করা উচিত? ইউরোপের প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি শক্তিশালী ডিজিটাল প্রাচীর (Firewall) তৈরি করা। চীন যা করেছে নিজেদের ড্যাটা এবং টেক কোম্পানিগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। ইউরোপ যদি গুগল, মেটা বা অ্যামাজনের ওপর নির্ভরশীল না হতো, তবে আজ ইউরোপে ৫০০০ বিলিয়ন ডলারের অন্তত আধা ডজন কোম্পানি থাকত।
গত ৪০ বছর ধরে ইউরোপীয় নেতারা তাঁদের নিজস্ব শিল্প গড়ে তোলার পরিবর্তে নিওলিবারেলিজম বা বাজার অর্থনীতির ওপর অন্ধ বিশ্বাস রেখেছেন। তাঁরা ভেবেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র তাদের আজীবন রক্ষা করবে। কিন্তু হুয়াওয়ের সিইও যেমন বলেছিলেন, একটি দেশের যদি নিজস্ব ড্যাটা সুইচ না থাকে, তবে তার সেনাবাহিনী না থাকার মতোই অবস্থা। ইউরোপ আজ প্রযুক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দাসে পরিণত হয়েছে। বর্তমান যুগে প্রকৃত স্বাধীনতার অর্থ নিজেদের ড্যাটার উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ থাকা। মনে রাখতে হবে গ্রীনল্যান্ড সংকট কেবল একটি দ্বীপের লড়াই নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা, এটি মূলত বদলে যাওয়া বিশ্ব ব্যবস্থায় টিকে থাকার এক নিষ্ঠুর মহড়া।
……….
লেখক Dr Zaki Rezwana Anwar FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD এজন চিকিৎসক, জনপ্রিয় সিনিয়র সংবাদ পাঠক, কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক স্পীকার।




