দেশের সার্বিক উন্নয়নে নারী সমাজের অবদান কম নয় : তারেক রহমান
পোস্ট ডেস্ক :

একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নারী সমাজকে হেয়প্রতিপন্ন করে নানা রকম বিকৃত কথা-বার্তা বলছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার দুপুরে যশোর উপশহর কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। এসময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন যশোর ও কুষ্টিয়া জেলার ২২টি সংসদীয় আসনের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা। তারেক রহমান ধানের শীষ প্রতিক হাতে নিয়ে এসব প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের পক্ষে জনগণের রায় প্রত্যাশা করেন।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, দেশের অর্ধেক মানুষ নারী, এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারে রেখে, ঘরে বন্দি করে রেখে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। অথচ একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ধর্মকে ব্যবহার করে নানা রকম মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে দেশের সহজ সরল মানুষকে বিভ্রান্ত করে তাদের ভোটাধিকার হরণের চেষ্টা করছে। এরা দেশের নারী সমাজকে হেয়প্রতিপন্ন করে নানা রকম বিকৃত কথা-বার্তা বলছে। অথচ দেশের সার্বিক উন্নয়নে নারী সমাজের অবদান কম নয়।
দেশের গার্মেন্টস সেক্টরে কর্মরত নারীদের অবদানের কথা স্মরন করে তিনি আরও বলেন, এই নারীদের কর্মের কারণেই দেশের গামেন্টস শিল্প আজ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় রকমের অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে। নারীরা কর্মমুখী হলে দেশ ও পরিবারের উন্নতি ঘটে। নবী করিম (সা:) এর স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা:) এর প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, তিনি একজন কর্মজীবী মানুষ ছিলেন, তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। মা আশেয়া (রা:) এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বদরের যুদ্ধে মা আয়েশা (রা:) সার্বিক ভাবে সহায়তা করেছিলেন। তিনি যুদ্ধাহত সাহাবীদের নিজে সেবা যত্ন করেছিলেন। আজকের আধুনিক নার্সিং সেবার উৎপত্তি সেখান থেকেই। তাই বিএনপি বিশ্বাস করে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সাধন করতে হলে দেশের নারী পুরুষকে হাতে হাত ধরে কাধে কাধ মিলে একসাথে কাজ করতে হবে। যে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী সেই দেশের নারী সমাজকে বাইরে রেখে কখনো দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব নয়। তাই তো বিএনপি দেশের নারী সমাজ বিশেষ করে সংসারের প্রধান মা-বোনদের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সংসার খরচের একটা বড় অংশ মাসিক ভাতা হিসেবে প্রদানের ঘোষনা দিয়েছে।
এছাড়া কৃষক, ধর্মীয় নেতা, তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে নানা পেশার সম্মানিত মানুষের জন্য বিএনপি কিছু করতে চায়। আর তার জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আপনাদের রায়টি ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে দেয়া প্রয়োজন।
তারেক রহমান বলেছেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। ৫ই আগস্টের পর একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল নারীদের অবমাননা করছে এবং তাদের ঘরের ভেতরে আটকে রাখার ষড়যন্ত্র করছে। আর বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি গৃহিণীর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া নারী শিক্ষার প্রসারে মাধ্যমিক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু করেছিলেন। আমরা সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিটি পরিবারের গৃহিণীদের হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেব, যার মাধ্যমে মায়েরা প্রতি মাসে রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাবেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গার্মেন্টস শিল্পের উন্নয়ন ও দেশের অর্থনীতিতে নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। যারা কর্মজীবী নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে, তারা জনগণের বন্ধু হতে পারে না।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি উন্নয়নের রাজনীতি করে, উন্নয়নের নামে প্রতারণা করে না সরকার গঠন করলে কৃষকের দোরগোড়ায় ন্যায্য মূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক পৌঁছে দেয়া হবে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সূচিত খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, উলশী খালসহ সারা দেশের বন্ধ হওয়া খালগুলো খনন করে ফসলের উৎপাদন দ্বিগুণ করা হবে।
তারেক রহমান বলেন, কারোর প্ররোচনায় বিশ্বাস করে আপনি কোন ভুল সিদ্ধান্ত নেবেন না। যাদের হাত ধরে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো, যারা দেশের মহান মুুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যারা দেশের সাধারণ মানুষের কাতারে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন- সেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতীক ধানের শীষে আপনাদের মূল্যবান রায়টি প্রধান করে বিএনপিকে আবারো রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ দেবেন। যারা মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের মানুষের পক্ষাবলম্বন না করে পাকিস্তানিদের পক্ষ অবলম্বন করে আমাদের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করেছিলো, সেই জনশত্রুদের কোন কথায় আপনারা বিশ্বাস করবেন না। যারা এখনো এই দেশের মা-বোনকে নিয়ে ঘৃণিত কথা-বার্তা বলে বেড়ায় তাদেরকে আপনারা ১২ তারিখে ব্যালটের মাধ্যমে প্রত্যাখান করবেন।
তিনি বলেন, কোন ধর্ম ব্যবসায়ীর হাতে দেশ নিরাপদ নয়। যারা কথায় কথায় মিথ্যা বলেন, যারা ভোটের আগে মানুষকে মিথ্যার আশ্বাস দেয়, যারা মহান রবের শক্তি ও ক্ষমতাকে নিয়ে মসকরা করে, রহস্য করে তাদেরকে আর যাই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিলে দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব বিলীন হয়ে যাবে। যেমন গিয়েছিলো বিগত ১৫ বছরে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে। তাই আপনারা সকলেই ধারে শীষের শক্তি। শুধু মিছিল, মিটিং আর স্লোগান দিয়ে শক্তি ক্ষয় করে ফেললে চলবে না। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোর থেকে ভোট কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। সকল চক্রান্ত ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার মাধ্যমে বিএনপির প্রতি জনগণের ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়ে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।
যশোর অঞ্চলের সম্ভাবনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এখানকার ফুল চাষকে আধুনিকায়ন করে বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করে আখ চাষিদের ভাগ্যোন্নয়ন এবং চিনি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। বেকারত্ব দূর করতে প্রতিটি এলাকায় ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও আইটি পার্ক নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনকে দেশপ্রেমিক ও দেশবিরোধীদের লড়াই হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, একটি চক্র এনআইডি ও বিকাশ নম্বর নিয়ে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। ভোট গণনায় দেরি করার উছিলায় কারচুপির চেষ্টা করা হলে তা শক্ত হাতে প্রতিরোধ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই শান্তিতে বাস করবে। কারণ রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনই আমাদের লক্ষ্য। বক্তব্যের শেষে তিনি ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে উপস্থিত জনতাকে উজ্জীবিত করেন।
বিএনপির চেয়ারম্যানকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি দুপুর ২টা ২০ মিনিটে জনসভা মঞ্চের পাশেই বিরামপুর প্রাইমারি স্কুল মাঠে নির্মিত হেলিপ্যাডে অবতরণ করেন। হেলিপ্যাডে দলের চেয়ারম্যানকে স্বাগত জানান বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। পরে গাড়িযোগে কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে মঞ্চে উপস্থিত হন।
ওদিকে জনসভা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। উপশহর কলেজ মাঠ ছাপিয়ে পাশের ঈদগাহ ময়দান, উপশহর পার্ক ও বাদশা ফয়সাল ইসলামী ইন্সটিটিউটের মাঠ ছাপিয়ে আশেপাশের রাস্তা ও বাসা বাড়ির ছাদে লোকারোণ্যে পরিণত হয়।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির সভাপতি এডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু এবং সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন। এতে আরও বক্তব্য রাখেন খুলনা বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোর-৩ সদর আসনের ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি, কেন্দ্রীয় নেতা নিতাই রায় চৌধুরী, অধ্যাপক নার্গিস বেগম, অমলেন্দু দাস অপু, আমিরুজ্জামান খান শিমুল, মাগুরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী আহম্মেদ, কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাকির হোসেন সরদার, নড়াইল জেলা বিএনপির সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর, ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ, যশোর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু প্রমুখ।




