জুলাই বিপ্লব এবং জনমত: সংবিধান সংশোধন ও জনগণের ইচ্ছার ভারসাম্য

Published: 19 February 2026

অ্যাডভোকেট শফিকুল হক
প্রাক্তন মেয়র, টাওয়ার হ্যামলেটস, লন্ডন
যুক্তরাজ্য (ইউকে)

১২ ফেব্রুয়ারি, Bangladesh‑এ নির্বাচনের সঙ্গে মিলিয়ে একটি জাতীয় জনমত নেওয়া হয়। এতে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ করেন এবং অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ ভোট “হ্যাঁ” দেন। এটি জুলাই বিপ্লব‑এর আদর্শ ও ঐতিহাসিক চেতনার সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের প্রতি সমর্থন নির্দেশ করে।

নতুন সংসদ শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনমতের ফলাফল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। প্রশ্ন হলো: জনগণের ইচ্ছা কি সংসদে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে, নাকি এটি কেবল নির্দেশনামূলক?

৬৮ শতাংশ ভোট: জনমতের অর্থ
৬৮ শতাংশ “হ্যাঁ” ভোট দেখায় জনগণ সংবিধান সংশোধনের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে। বিশেষত এটি জুলাই বিপ্লব‑এর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ।

জনমত একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে, কিন্তু সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয় না। এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো: জনমত রাজনৈতিক শক্তি দেখায়, কিন্তু সংসদ আইনগতভাবে শেষ সিদ্ধান্ত নেন।

সংবিধান সংশোধনের আইনগত কাঠামো
ধারা ১৪২ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদে দ্বি‑তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন।
পঞ্চদশ সংশোধনীর পরে জনমত বাধ্যতামূলক নয়। সংসদই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ। সংসদ সদস্যরা শপথ নেন “সংবিধান রক্ষা ও সংরক্ষণ” করার শপথ। অর্থাৎ তারা আইনগতভাবে বিচার-বিবেচনা করার ক্ষমতা রাখে।

জনমত শক্তিশালী হলেও সংসদ না মানলে সংবিধান পরিবর্তন হয় না। এটি কেবল নির্দেশনা।

রাজনৈতিক সময় ও প্রক্রিয়া
জনমত নির্বাচনের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। নতুন সংসদ শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় এসেছে।
নতুন সংসদ প্রথমে প্রশাসনিক কাজ, কমিটি গঠন ও আইন প্রণয়নে মনোযোগ দেয়। তাই নির্বাচনের সঙ্গে মিলিয়ে সরাসরি সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় কিছু চাপ তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতি দেখায়: সংসদকে জনগণের ইচ্ছা ও সংবিধানগত দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।

সংস্কার কমিশনের সময়সীমা
সংস্কার কমিশন সংবিধান ও প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুপারিশ তৈরি করেছে। তবে রিপোর্টটি শেষ মুহূর্তে জমা পড়েছে, ফলে রাজনৈতিক দলগুলো এবং জনগণ যথেষ্ট সময় পায়নি সুপারিশগুলো বিশ্লেষণ করার।
যদি কমিশন আগে রিপোর্ট দিত, নির্বাচন আগে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমন্বয় করতে পারত। এটি পরে সংসদে প্রক্রিয়াটিকে সহজ ও সুশৃঙ্খল করে দিত।

এটি কেবল সময়ের সীমাবদ্ধতা, কোনো ব্যক্তিগত দোষ নয়। তবে এতে নতুন সংসদ শপথ নেওয়ার সময় থেকেই বিতর্ক ও তীব্র আলোচনার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জনমতের বৈধতা ও সংসদের দায়িত্ব
সংবিধান অনুযায়ী জনমত পরামর্শমূলক। এটি সংসদকে নির্দেশ দেয়, বাধ্য করে না।
সংসদ ধারা ১৪২ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। জনমত কেবল একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকেত, যা সংসদকে জনগণের মনোভাব বিবেচনা করতে সাহায্য করে।

জনমত বনাম প্রক্রিয়া
৬৮ শতাংশ “হ্যাঁ” ভোট জনগণের স্পষ্ট নির্দেশ। তবে সংসদ আইনগতভাবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানবে না।
জনমত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে সংবিধান সংশোধনের বৈধতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত হয়। অর্থাৎ সরাসরি গণতন্ত্র (জনমত) ও প্রতিনিধি গণতন্ত্র (সংসদীয় প্রক্রিয়া) মিলিয়ে কাজ করতে হবে।

ভবিষ্যতের পথ
সংসদ ও জনগণ কিছু সহজ নীতি মানলে প্রক্রিয়া আরও গ্রহণযোগ্য হতে পারে:
আইনগত প্রক্রিয়ার সম্মান: ধারা ১৪২ অনুযায়ী সংশোধনী প্রণয়ন করতে হবে।
জনমতের গুরুত্ব: জনমত নাগরিক অংশগ্রহণ ও ঐতিহাসিক প্রত্যাশা দেখায়।
স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনা: সব পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
মনোযোগপূর্ণ সময়: সিদ্ধান্ত নিতে পর্যাপ্ত সময় থাকা প্রয়োজন।

গঠনমূলক সংলাপ: সংসদ ও জনগণের আলোচনা প্রক্রিয়ার বিশ্বাস নিশ্চিত করে।
এই নীতিগুলো মানলে সংবিধান সংশোধন আইনগত ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, এবং জনগণের ইচ্ছা ও সংসদের প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য থাকে।

১২ ফেব্রুয়ারি জনমতে ৬৮ শতাংশ সমর্থন একটি মজবুত রাজনৈতিক ও নৈতিক নির্দেশনা দেয়। এটি জুলাই বিপ্লব‑এর ঐতিহাসিক প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত।
যদিও এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান পরিবর্তনের অধিকার দেয় না, সংসদকে এটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের দ্বি‑তৃতীয়াংশ অনুমোদন প্রয়োজন। তবে জনমত ও ঐতিহাসিক চেতনার সম্মিলন প্রক্রিয়াকে ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য করে।
বর্তমান পরিস্থিতি শেখায়: জনগণের ইচ্ছা ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সঠিক সমন্বয়ই স্থায়ী ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংস্কারের ভিত্তি।