তালেবান সরকারের নতুন আইন ।। ‘জখম বা হাড় না ভাঙা’ পর্যন্ত পারিবারিক সহিংসতা বৈধ!
পোস্ট ডেস্ক :

পারিবারিক সহিংসতাকে বৈধতা দিয়ে নতুন একটি ফৌজদারি আইন জারি করেছে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকার। নতুন এই আইন অনুযায়ী স্বামীরা তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানদের শারীরিকভাবে শাস্তি দিতে পারবে। তবে মারধরের ফলে ‘হাড় ভেঙে গেলে’ চোখে পড়ার মতো ‘জখম’ হলে স্বামীদের শাস্তি পেতে হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
৯০ পৃষ্ঠার এই নতুন দণ্ডবিধিতে স্বাক্ষর করেছেন আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থী গোষ্ঠীটির সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। নতুন এই দণ্ডবিধিতে শাস্তির ক্ষেত্রে এক ভিন্ন ধরনের স্তরবিন্যাস বা বর্ণপ্রথা তৈরি করা হয়েছে। এখানে অপরাধী ‘স্বাধীন’ নাকি ‘দাস’—তার ওপর ভিত্তি করে আলাদা মাত্রার শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
অবশ্য মারধরের ফলে স্ত্রী-সন্তানের হাড় ভাঙলে কিংবা ক্ষত সৃষ্টি হয়ে রক্তপাতের মতো অপরাধ প্রমাণিত হলেও স্বামীর সামান্যই শান্তি হবে।
নতুন আইনে বলা হয়েছে, ‘অবাঞ্ছিত বল’ প্রয়োগে আঘাতের ফলে হাড় ভাঙলে সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র ১৫ দিনের কারাদণ্ড। তবে একজন পুরুষ তখনই দোষী সাব্যস্ত হবেন, যখন ভুক্তভোগী নারী আদালতে নির্যাতনের প্রমাণ দিতে পারবেন। নিয়ম অনুযায়ী, একজন নারীকে পূর্ণ পর্দার আড়ালে থেকে বিচারকের কাছে তাঁর ক্ষতস্থান দেখাতে হবে। একই সঙ্গে আদালতে আসার সময় স্বামী বা পুরুষ অভিভাবক থাকা বাধ্যতামূলক।
আফগান নারীদের ঘর থেকে বের হওয়া নিয়ে বিদ্যমান বিধি-নিষেধের কারণে আদালতে গিয়ে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রমাণ করাও খুব একটা সম্ভব হয় না। নতুন আইনে বলা হয়েছে, একজন বিবাহিত নারী তাঁর স্বামীর অনুমতি ছাড়া যদি নিজে পরিবারের লোকেদের সঙ্গে দেখা করেন, তাহলে তাঁর তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
নতুন আইনের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে আফগান সমাজকে ধর্মীয় আলেম (উলামা), অভিজাত শ্রেণি (আশরাফ), মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত এই চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী একই অপরাধের শাস্তি অপরাধের ধরন বা গুরুত্বের ওপর নির্ভর করবে না বরং তা অভিযুক্ত ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
নতুন আইন অনুযায়ী, যদি কোনো ইসলামী ধর্মীয় আলেম অপরাধ করেন, তবে তাঁর শাস্তি কেবল ‘উপদেশ’ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
অপরাধী যদি অভিজাত শ্রেণির হন, তবে তাঁকে আদালতে তলব করা হবে এবং উপদেশ দেওয়া হবে। তথাকথিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির কেউ একই অপরাধ করলে তাঁর শাস্তি হবে কারাদণ্ড। কিন্তু ‘নিম্নবিত্ত’ শ্রেণির কোনো ব্যক্তি সেই একই অপরাধ করলে তাঁর শাস্তি আরো বেড়ে যাবে এবং তাঁকে কারাদণ্ডের পাশাপাশি শারীরিক শাস্তি (যেমন বেত্রাঘাত) ভোগ করতে হবে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে শারীরিক শাস্তি সংশোধনমূলক প্রতিষ্ঠান বা কারা কর্তৃপক্ষের পরিবর্তে ইসলামী আলেমদের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে।
এই দণ্ডবিধি ২০০৯ সালে প্রণীত ‘নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা দূরীকরণ’ আইনকে বিলুপ্ত করেছে। তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সরকার আইনটি প্রণয়ন করেছিল।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর তথ্য মতে, মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, মানুষ ছদ্মনামেও এই আইনের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। কারণ তালেবান একটি নতুন আদেশ জারি করেছে, যেখানে বলা হয়েছে, এই নতুন দণ্ডবিধি নিয়ে আলোচনা করাও একটি অপরাধ।




