নরসিংদীর সেই কিশোরীকে হত্যা করেন সৎবাবা, আদালতে স্বীকারোক্তি

Published: 7 March 2026

পোস্ট ডেস্ক :


নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর কিশোরীকে হত্যা নাটকের অবসান হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ নূরার সঙ্গে কিশোরীর প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া, তার কারণে বিভিন্ন সময়ে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ায় গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন কিশোরীর সৎবাবা আশরাফ আলী (৪৫)।

গত ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক তার এক সহকর্মী সুমনের বাড়িতে যাওয়ার পথে একাই তাকে হত্যা করেছেন বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নরসিংদী পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল ফারুক।

শনিবার (৭ মার্চ) দুপুরে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। এই মামলায় চার ধর্ষকসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরমধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন, নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভার কোতয়ালীরচর এলাকার শাহজাহানের ছেলে নূর মোহাম্মদ নূরা (২৮) ও তার সৎভাই ইছাহাক ওরফে ইছা (৪০), একই এলাকার মৃত সাহাবুদ্দিনের ছেলে মো. এবাদুল্লাহ (৪০), হান্নান মুন্সীর ছেলে হযরত আলী (৪০), মো. আজগর আলীর ছেলে মো. আইয়ুব (৩০), মৃত মজিবুর রহমানের ছেলে গাফফার (৩৭), মহিষাশুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য আহাম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫) ও তাঁর ছেলে মো. ইমরান দেওয়ান (৩২)।

এই মামলায় পলাতক আসামিরা হলেন কোতয়ালীরচর এলাকার মৃত শাহজাহানের ছেলে ইছহাক ওরফে ইছা (৪০), দেওয়ান আলীর ছেলে আবু তাহের (৫০) ও কিশোরীর সৎবাবা শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মোয়াকুড়া এলাকার মৃত কুব্বাত আলীর ছেলে মো. আশরাফ আলী (৪৫)। এরমধ্যে সৎবাবা আশরাফ আলী, কথিত প্রেমিক নূর মোহাম্মদ নূরা ও ধর্ষক হযরত আলী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

পুলিশ সুপার জানান, কথিত প্রেমিক নূর মোহাম্মদ নূরার সঙ্গে ওই কিশোরীর পূর্ব থেকে প্রেমের সম্পর্ক থাকার সূত্র ধরে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। অপরদিকে, অভিযুক্ত মাধবদীর কোতয়ালীরচর এলাকার হযরত আলী, এবাদুল, জামান, গাফফার ওই কিশোরী হত্যার ১৫ দিন আগে হযরত আলীর বাড়িতে গণধর্ষণ করা হয়।

এসব নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা ঝামেলা তৈরি হওয়ায় কিশোরীর নিরাপত্তার অজুহাতে এক সহকর্মীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ভাড়া বাসা থেকে কিশোরীকে নিয়ে বের হন সৎবাবা আশরাফ আলী। তারা মহিষাশুড়া ইউনিয়নের কোতয়ালিরচর দড়িকান্দী এলাকায় মো. জাকির হোসেনের সরিষা খেতে পৌঁছালে পেছন থেকে কিশোরীর ওড়না তার গলায় পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে আশরাফ আলী। পরে দোষ কথিত প্রেমিকের ওপর চাপিয়ে হত্যার নাটক সাজান।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ভিকটিমের সৎবাবা আশরাফ আলী সিরিয়াল কিলার। সে ২০১১ সালে শেরপুরের নালিতাবাড়িতে এক প্রতিবেশীর ঘরে সিঁদ কেটে ঢোকে গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায় ব্যর্থ হয়ে চাকু দিয়ে তাকে হত্যা করে।

ওই মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়। সাত বছর জেল খেটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর উচ্চ আদালতে আপিল করে জামিনে মুক্ত হয়। তারপর সে মাধবদীতে এসে একটি কারখানায় কাজ নেয় ও ভিকটিম কিশোরীর মাকে বিয়ে করে।
ওসি বলেন, আমরা তার পূর্বের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে নানা দিক নিয়ে তদন্ত করে গতকাল শুক্রবার তাকে গ্রেপ্তার করি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করলে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। সেখানে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
প্রসঙ্গত, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টায় মহিষাশুড়া ইউনিয়নের কোতয়ালিরচর দড়িকান্দী এলাকায় মো. জাকির হোসেনের সরিষা ক্ষেত থেকে এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই রাতেই ৯ জনের নাম উল্লেখ করে আরো ২/৩ জন অজ্ঞাত আসামি করে মাধবদী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন কিশোরীর মা। এর পরপরই পুলিশ নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এজাহারনামীয় মূল আসামি নূর মোহাম্মদ নূরাসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে।

পরে ১ মার্চ তাদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায় পুলিশ। আদালত শুনানি শেষে ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্তকালে কিশোরীর সৎবাবা আশরাফ আলীর দেওয়া তথ্যে ও কথাবার্তায় গরমিল পাওয়ায় পুলিশের সন্দেহ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার আশরাফ আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।