ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি
পোস্ট ডেস্ক :

ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস মোজতবা খামেনিকেই দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। বিশ্বনেতাদের মধ্যে সবার আগে তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির প্রতি ‘অটল সমর্থনে’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গতকাল সোমবার এক বার্তায় তিনি তেহরানের প্রতি মস্কোর সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন মোজতবা। তিনি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। তেহরানের ধর্মীয় আলাভি স্কুলে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন।
মোজতবা খামেনির নাম নতুন নেতা হিসেবে ঘোষণার পর তাঁরই নির্দেশনায় ইসরায়েলে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান।
আর যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাসকর্মীদের সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোজতবার এই উত্থান তেহরানের পক্ষ থেকে একটি কঠোর বার্তা। আর তা হলো, তারা পিছু হটবে না; এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছুদিন ধরেই বলে আসছেন, তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে চান।
দেশটিতে পুরনো নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত কেউ ক্ষমতায় এলে তা তিনি মেনে নিতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিলেও এটি তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সেই ব্যক্তি মোজতবা খামেনি হওয়া তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি পরে এটাও বলেছেন, তাঁর অনুমোদন ছাড়া যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সে ‘দীর্ঘদিন টিকতে পারবে না’। ইসরায়েলও খামেনির দ্বিতীয় ছেলেকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিশ্চিত করার আগেই এক সতর্কবার্তা দিয়েছিল। তাতে তারা বলেছে, প্রয়াত আয়াতুল্লাহর যেকোনো উত্তরসূরির বিরুদ্ধেই তারা ‘অভিযান চালিয়ে যাবে’। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণার পর দেশটির শাসকগোষ্ঠীর সমর্থকরা রাস্তায় নেমে এসে উল্লাস করেছেন।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থেকে প্রভাব খাটানোর জন্য পরিচিত বলে অনেকে মনে করেন। বার্তা সংস্থা এপির এক খবরে বলা হয়েছে, উইকিলিকস প্রকাশিত মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তায় তাঁকে ‘আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়া’ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মোজতবা খামেনিকে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে ‘যোগ্য ও দৃঢ়চেতা’ ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনগুলোতে হস্তক্ষেপ করা, বাসিজ মিলিশিয়াকে নির্দেশনা দেওয়া এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার অভিযোগ রয়েছে। তবে ইরানে তাঁর প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা থাকা সত্ত্বেও তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্রটির কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পদে কখনো অধিষ্ঠিত হননি। তাঁর বাবা আলী খামেনি এবং তাঁর পূর্বসূরি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি উভয়েই ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবে উত্খাত হওয়া পাহলভি রাজতন্ত্রের বংশানুক্রমিক ক্ষমতা হস্তান্তরের সমালোচক ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে মোজতবা খামেনির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির নিযুক্ত বা তাঁর পক্ষ থেকে কাজ করে বিবেচনা করে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি
ইরানের সশস্ত্র বাহিনী নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রতি সমর্থন জানানো সর্বশেষ পক্ষ হিসেবে যুক্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সামরিক বাহিনী মোতজবা খামেনিকে ‘ন্যায়পরায়ণ, জ্ঞানবান…ধর্মপ্রাণ ও বিচক্ষণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা আরো বলেছে, খামেনিকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ পরিষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ আগ্রাসনে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছাড়াও তাঁর স্ত্রী, মোজতবা খামেনির স্ত্রী ও এক বোন নিহত হন। তবে সেদিন মোজতবা খামেনি হামলাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। কয়েক বছর ধরে বাবার সম্ভাব্য প্রধান উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবা খামেনিকে নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছিল। তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রায় আট বছর ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তারপর প্রায় ৩৭ বছর দেশটির সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
৮৮ সদস্যের আলেম পরিষদ বা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, একটি ‘নির্ণায়ক ভোটের’ মাধ্যমে ৫৬ বছর বয়সী এই ধর্মীয় নেতাকে ইরানের নতুন ‘সুপ্রিম লিডার’ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের আহবান জানিয়েছে পরিষদ।
বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর ক্ষমতায় আসা ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব এখনো শক্তিশালী থাকার ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে স্বল্প মেয়াদে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ বছর বয়সে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য বেশ কয়েকবার সেনাবাহিনীতে কাজ করেছিলেন। এরপর ১৯৯৯ সালে তিনি ধর্মীয় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পবিত্র শহর কোমে যান, যা শিয়া ধর্মতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে তিনি বেশির ভাগ সময়ই নিজেকে আড়ালে রেখে আসছিলেন। সূত্র : আল জাজিরা, রয়টার্স




