ইরান ইস্যুতে মার্কিন মিডিয়া কেন যুদ্ধবাজের ভূমিকায়?
পোস্ট ডেস্ক :

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সংবাদ প্রচারে একটি পরিচিত ছবি দেখা যাচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম প্রবাসী ইরানি গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কণ্ঠগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে। এসব কণ্ঠের সবাই প্রকাশ্যে যুদ্ধের পক্ষে। এটাই এখন মার্কিন মিডিয়ার অতি পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকেই প্রভাবশালী অনেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম প্রবাসী ইরানি ও ইরানি-আমেরিকানদের বক্তব্য তুলে ধরছে। তারা স্থল আক্রমণের মাধ্যমে ইরানে শাসন পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। এমন ব্যক্তিদের কথা প্রচার করা হয়েছে যারা নিজ দেশের প্রতি তীব্র ক্ষোভ পোষণ করেন। তাদের যুক্তি, ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী অপরাধী।
ইরানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী কিয়ান তাজবাখশ অতীতে ইরানে রাজনৈতিক বন্দি ছিলেন। তিনি বারাক ওবামার পারমাণবিক চুক্তির অংশ হিসেবে মুক্তি পান। সম্প্রতি সিএনএনে এসে তিনি যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
তাজবাখশ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় কোনো শক্তি সাহায্য না করলে ইরানি জনগণ নিজেদের দেশের ভাগ্য বদলাতে পারবেন না।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসলে সেই যুদ্ধ শেষ করতে চান, যা ৪৭ বছর আগে ১৯৭৯ সালে ইরান শুরু করেছিল।’
এমন বক্তব্যগুলো তাজবাখশকে মিডিয়ায় বিশেষ প্রভাবশালী এবং বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তবে এই বক্তব্যগুলো মোটেই সত্য নয়। তাজবাখশ ১৯৫৩ সালে ইরানে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শাসক পরিবর্তন এবং মোহাম্মদ মোসাদ্দেগকে উৎখাতের ইতিহাস উল্লেখ করেননি।
এ ছাড়া তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই ইরানি জনগণের নিজস্ব বিষয়, মোটেই তা যুক্তরাষ্ট্রের নয়। আন্তর্জাতিক আইন ও মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী অন্য কোনো দেশকে এমন ক্ষমতা দেওয়া যায় না। অথচ তাজবাখশের যুক্তি বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইচ্ছামতো যুদ্ধ চালানোর অনুমতি দেওয়ার পথ খুলে দেয়।
মার্কিন মিডিয়ায় তাজবাখশের মতো আরো অনেক ব্যক্তির কণ্ঠস্বর প্রচার করা হয়েছে। মাসিহ আলিনেজাদও সম্প্রতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ক্ষেত্রে একই ধরনের বার্তা দিয়েছেন। তিনি বার্লিন প্রাচীরের উদাহরণ টেনে যুদ্ধবিরোধীদের সমালোচনা করেন। বলেন, তারা শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের বিষয়ে ‘অ্যালার্জি’ পোষণ করছেন।
এসব ব্যক্তিত্ব আমেরিকান দর্শকদের আবেগকে কাজে লাগাচ্ছেন, যারা ইরানি জনগণের স্বাধীনতা চান কিন্তু পুরো প্রেক্ষাপটটি ভালোভাবে জানেন না।
ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাসক মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভিও মার্কিন মিডিয়ায় ঘন ঘন হাজির হচ্ছেন। পাহলভিরও ব্যক্তিগত আগ্রহটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যুদ্ধ চালাবে এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাবে। কারণ তিনি বছরের পর বছর ধরে তেহরানে এক ধরনে রাজা হিসেবে প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন।
মার্কিন মিডিয়া বারবার রেজা পাহলভির মতো ব্যক্তিত্বদের কণ্ঠস্বর প্রচার করেছে। অনেক ইরানি তাকে এমন একজন হিসেবে দেখেন, যিনি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের সঙ্গে জড়িত।
তাজবাখশ, আলিনেজাদ এবং পাহলভির মূল কাজ হলো এমন দর্শকদের কাছে টানা, যারা ইরান ও দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব কম জানেন। তাদের লক্ষ্য, এসব দর্শক যেন যুদ্ধকে অনুমোদন দেন এবং নৈতিকভাবে সমর্থন করেন। যেসব মিডিয়া এ ধরনের বক্তব্যকে পাল্টা কোনো চ্যালেঞ্জ জানানো ছাড়াই প্রচার করছে, তারা আসলে পেশাগতভাবে ব্যর্থ এবং দর্শকদের বিভ্রান্ত করছে।
মার্কিন দর্শকদের জানা উচিত, এই ব্যক্তিরা খুবই ছোট একটি গ্রুপের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তবু তাদের বক্তব্য প্রচার করা হয়, কারণ তারা যুদ্ধের পক্ষে। ইরানের বেশিরভাগ নাগরিক যুদ্ধের বিরোধী। তারা জানেন, যুদ্ধের খরচ শেষপর্যন্ত নিরপরাধ মানুষের কাঁধের ওপরে চাপে। এ ছাড়া শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষপর্যন্ত কট্টরপন্থীদের শক্তিশালী করবে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের চাহিদা আরো বাড়িয়ে দেবে।
ইরানের ভেতরের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসীরা শান্তিপূর্ণ কূটনীতির পক্ষে। আমেরিকান সংবাদমাধ্যম যুদ্ধবিরোধী এই সংখ্যাগরিষ্ঠদের নীরবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।
৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিল (এনআইএসি) এক বিবৃতিতে সতর্ক করেছিল। সেখানে বলা হয়, ইরানে বোমা হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এনআইএসির মতো যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমিয়ে দেয়ার চেষ্টা আরো তীব্র হয়েছে। এনআইএসির এই অবস্থান সাধারণ প্রবাসী ইরানি ও অনেক আমেরিকানের মতামতের সঙ্গেও মিলে যায়।
ইতিহাস দেখায়, যুদ্ধপন্থীরা সাধারণত সংখ্যালঘু এবং অভিজাত শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করেন। ইরাক যুদ্ধের সময়েও প্রবাসী গোষ্ঠীর কিছু মানুষ যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। কিউবার ক্ষেত্রেও ছোট কিন্তু সোচ্চার একটি কিউবান-আমেরিকান গোষ্ঠী শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চাপ দিচ্ছে।
মার্কিন সরকার আসলে গণতান্ত্রিক নয়। এ দেশের প্রেসিডেন্ট যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু করতে পারেন। আর মিডিয়া ও শাসক শ্রেণি মনে করে, সাধারণ মানুষ তাদের যেকোনো অবস্থান মেনে নেবে।
মূল কথা হলো, স্বাধীনতা ও ন্যায়ের পক্ষের বলে দাবি করা মানুষের কাছ থেকে এ ধরনের প্রচারণা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তাদের প্রচারণার আসল উদ্দেশ্যটি খুব কম মানুষই বোঝে বা বিশ্লেষণ করতে পারে।
[ডেভিড এস ডি’আমাতো একজন আইনজীবী, ব্যবসায়ী এবং স্বাধীন গবেষক। তিনি ফিউচার অব ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের নীতি উপদেষ্টা এবং দ্য হিলে নিয়মিত মতামত প্রকাশ করেন। কাউন্টারপাঞ্চে ‘হোয়াই উই ওনলি হিয়ার ডায়াসপোরা ভয়েস হু ওয়ান্ট ওয়ার’ শিরোনামে প্রকাশিত তার নিবন্ধটির ভাবানুবাদ করেছেন নুসরাত জাহান নিশা]




