ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই ইন দ‍্য ইউকের মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন

Published: 31 March 2026

” নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে আত্ম আত্মোৎসর্গকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন”

লন্ডন: ইউকেতে অবস্থানরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই ইন দ্য ইউকে (DUAUK) যথাযোগ্য মর্যাদা, শ্রদ্ধা ও দেশাত্মবোধের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৬তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন করেছে। শনিবার ২৮শে মার্চ পূর্ব লন্ডনের একটি হলে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি সিরাজুল বাসিত চৌধুরী এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কামরুল হাসান। অনুষ্ঠানের সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ জাফর।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তারা ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর পরিচালিত বর্বর সামরিক অভিযান “অপারেশন সার্চলাইট”-এর মাধ্যমে সংঘটিত গণহত্যার শিকারদের স্মরণ করেন। বক্তারা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসব্যাপী সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী লক্ষ লক্ষ শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

অনুষ্ঠানের সূচনায় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অনুষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন। পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক সম্পাদক এরিনা সিদ্দিকী সুপ্রভার পরিচালনায় ‘ধন ধান্যে পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ দেশাত্মবোধক গান সকল সদস্যের অংশগ্রহনে সমবেতভাবে পরিবেশন করা হয়।

এরপর বক্তব্য প্রদান করেন সভাপতি সিরাজুল বাসিত চৌধুরী। সভাপতি তাঁর বক্তব্যে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হওয়ার পেছনে যে সকল শ্রদ্ধেয় নেতাদের অবদান আছে তাঁদের সবাইকে স্মরণ করে তাঁদের অবদান তুলে ধরেন।

সহ সভাপতি ও অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী নিলুফা ইয়াসমীন হাসান তাঁর বক্তব্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল আন্দোলন সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর রোষাণলের শিকার হয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের উপর হত্যাযজ্ঞ এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের বিজয়ের দু’দিন আগে ১৪ই ডিসেম্বর সারা দেশে যে বুদ্ধিজীবী নিধন করেছিল রাজাকার, আলবদর, আলশামস সেখানে ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে হত্যা করা হয় তা বিস্তারিত তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত লেখক ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স এর অধ্যাপক ড. শাহাদুজ্জামান। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং নৈতিক গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য প্রদান করে বলেন, বাংলাদেশের একটা স্বর্ণালী ইতিহাস আছে, একটা গৌরবের ইতিহাস আছে। তিনি বলেন, আমরা যারা মনে করি মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের অস্তিত্বের সত্তার অংশ, সেই মুক্তিযুদ্ধকে পাহারা দেয়াও আমাদের দায়িত্ব।
বাংলাদেশকে একটি অনেক সম্ভাবনাময় দেশ উল্লেখ করে ড. শাহাদুজ্জামান বলেন, আমরা অনেক দুঃখ, ত্যাগ ও বেদনার মধ্যে দিয়ে গেছি। আমার মনে হয়, ৫৬ বছর পর সময় এসেছে, এখন আমাদের একটি স্হিতিশীল এবং সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ চাই। সবাই মিলে আমাদের আরো গভীর ভাবনার ভেতর দিয়ে, চর্চার ভেতর দিয়ে যেতে হবে যাতে সত্যিকার অর্থে আমাদের বাংলাদেশটা আমাদের মধ্যে ফেরত পাই।

অনুষ্ঠানে সৈয়দ ইকবাল ও ইসমাইল হোসেন নির্মিত একটি প্রামাণ্য ভিডিও প্রদর্শন করা হয়, যা বাংলাদেশ গণহত্যা স্মরণ দিবস ২৫শে মার্চ উপলক্ষে নির্মিত। ভিডিওতে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরিচালিত অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চালানো নির্মম গণহত্যার চিত্র তুলে ধরা হয়। পরবর্তীকালে সংঘটিত নৃশংসতার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় এবং স্বাধীনতার সংগ্রামকে আরও তীব্র করে তোলে।

অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল সংগঠনের সদস্য দুজন বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান গৌস সুলতান এবং আবু মুসা হাসান-এর বক্তব্য। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা দিক তুলে ধরেন। উপস্থিত সবাই তাঁদের সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পরে তাঁদের ফুল দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়। এই পর্বটি পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক ব‍্যারিষ্টার মোঃ কামরুল হাসান।

অনুষ্ঠানে “মুক্ত চিন্তা” শীর্ষক আলোচনা পর্ব পরিচালনা করেন সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ জাফর। এ পর্বে হাবিব রহমান, মোহাম্মদ আবদুর রাকীব, নাজির উদ্দিন চৌধুরী এবং মাহরুন আহমেদ মালা মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য এবং নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেন। আলোচনা সম্পর্কে মতামত তুলে ধরেন মারুফ চৌধুরী, সহুল আহমেদ মকু, রিপা সুলতানা রাকীব, সৈয়দ এনামুল ইসলাম, মাহফুজা রহমান, এম কে মিলন, মইন উদ্দিন, মির্জা আছাব বেগ এবং কঙ্কন কান্তি ঘোষ তাদের মতামত তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘোষণা করেন সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি মিসবাহ উদ্দিন ইকো। অনুষ্ঠানে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই ইন দ্য ইউকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষণ এবং যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে স্বাধীনতার আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রচারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। এ সময় তিনি সংগঠনের সভাপতি সিরাজুল বাসিত চৌধুরীর ও সাধারণ সম্পাদক এমকিউ হাসান এবং সহ-সভাপতি ও সমন্বয়ক নিলুফা ইয়াসমীন হাসানের সঙ্গে প্রধান বক্তা ড. শাহাদুজ্জামান-এর প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে তাঁকে উত্তরীয় প্রদান করেন।

আলোচনা পর্ব শেষে একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দেশাত্মবোধক গান, কবিতা আবৃত্তি এবং নৃত্য পরিবেশিত হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সাংস্কৃতিক সম্পাদক এরিনা সিদ্দিকী সুপ্রভা।

নৃত্যশিল্পী পুনন কুন্ডু দেশাত্মবোধক গান “ও আমার বাংলা মা তোর”-এর সঙ্গে মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশন করে উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ ও আবেগাপ্লুত করে।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন রিপা সুলতানা রাকীব, তারেক সৈয়দ, সৈয়দ জুবাইয়ের, মাহফুজা রহমান, এমকিউ হাসান, সায়েদা তামান্না, রাশেদা বানু, সৈয়দ ইকবাল, নিলা নিকি খান, মিজানুর রহমান, কাজী কলপনা, সৈয়দ হামিদুল হক, হাসনীন চৌধুরী, মাহমুদা চৌধুরী এবং মনির চৌধুরী।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশের দুইজন খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সৈয়দ জুবাইয়ের ও তারেক সাইয়েদ। তারা উভয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। তাদের প্রাণবন্ত ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা অনুষ্ঠানে এক উচ্ছ্বসিত পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং উপস্থিত দর্শকদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে দেশাত্মবোধক আবহে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

উল্লেখ্য, সংগঠনের সদস্যরা মহান স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে অবস্থিত শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।