হরমুজ প্রণালী নিয়ে সিদ্ধান্তহীন ট্রাম্প

Published: 6 April 2026

পোস্ট ডেস্ক :


‘যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় কোনো তেল আমদানি করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না। আমাদের এর প্রয়োজন নেই। আগে ছিল না, এখনো নেই।’ গত বুধবার হোয়াইট হাউস থেকে দেয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এ কথা বলেন। কিন্তু রবিবার ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখলেন- ‘এই ফাকিং প্রণালি খুলে দাও, তোমরা পাগল বদমাশরা, না হলে নরকে বাস করবে-দেখে নিও!’
তাহলে কী বদলেছে?
একটি বড় কারণ হলো- তেলের দাম।

তার ভাষণের পরদিন বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম ১১ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের ওপরে ওঠে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং ইতিহাসে একদিনের সর্বোচ্চ বৃদ্ধির অন্যতম দিন। ভাষণের আগে দাম ছিল প্রায় ১০০ ডলার, আর যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ৭০ ডলারের নিচে।

ট্রাম্প ঠিকই বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর খুব কম নির্ভরশীল। বিশ্বে ব্যবহৃত তেলের প্রায় ২০ ভাগ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন যে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার করে, তার মধ্যে মাত্র প্রায় ৫ লাখ ব্যারেল আসে এই প্রণালি দিয়ে- যা খুবই কম এবং এই পরিমাণ তেল অন্য উৎস থেকে পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি একটি কঠিন বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তাহলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এই প্রণালির ওপর তার ধারণার চেয়েও বেশি নির্ভরশীল।

সরবরাহ ও চাহিদা
গত দেড় দশকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের জ্বালানি খাতকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করেছে। বিশেষ করে হাইড্রোলিক ফ্র্যাকিং ও অনুভূমিক ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে, বিশেষ করে টেক্সাসের পার্মিয়ান বেসিনে। এখন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ২২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা দ্বিতীয় স্থানে থাকা সৌদি আরবের দ্বিগুণ এবং নিজের চাহিদার চেয়েও সামান্য বেশি। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র এক অর্থে জ্বালানি স্বনির্ভর। তবে পুরোপুরি নয়।

যুক্তরাষ্ট্র এখনও প্রতিদিন ৬ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল আমদানি করে, যা তার মোট ব্যবহারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। একই সঙ্গে প্রতিদিন প্রায় ৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানিও করে। কারণ সব তেল একরকম নয়। যুক্তরাষ্ট্র হালকা ও পরিষ্কার তেল উৎপাদন করে, যা পেট্রোল তৈরির জন্য ভালো। কিন্তু ডিজেল বা ভারী জ্বালানির জন্য নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনেজুয়েলা ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো জায়গা থেকে ভারী তেল আমদানি করতে হয়।
এছাড়া তেলের বাজার বৈশ্বিক। এক অঞ্চলে সরবরাহ কমলে তার প্রভাব সব জায়গায় পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ক্রেতারা সীমিত তেলের জন্য প্রতিযোগিতা করে, ফলে দাম বেড়ে যায়।

জ্বালানি অর্থনীতি

তেলের উচ্চ দাম যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ও ইরানের হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের সরাসরি ফল। ট্রাম্পের হুমকির পরও তেলের দাম উচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ৪.১১ ডলারে পৌঁছেছে। এই উচ্চ দাম ইতিমধ্যেই অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষরা জ্বালানির খরচে কষ্ট পাচ্ছে। আর অনেক ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই বা খরচ কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আরও বড় সমস্যা হবে যদি এই দাম মানুষের জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তখন অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

অর্থনীতির ওপর প্রভাব

৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি সহজে ভেঙে পড়ে না। তবে অতীতে দেখা গেছে, বেশিরভাগ মন্দার আগে তেলের দাম বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি ০.১ থেকে ০.৪ শতাংশ কমে। এখনকার প্রায় ৪০ ডলারের বৃদ্ধি জিডিপি প্রায় ১ শতাংশ কমাতে পারে, যা উল্লেখযোগ্য হলেও বড় ধাক্কা নয়। তবে দাম যদি আরও বাড়ে- ১৫০ বা ২০০ ডলার হয়, তাহলে পরিস্থিতি অনেক ভয়াবহ হবে। এছাড়া শুধু তেল নয়, ডিজেলের দাম বাড়ায় সব ধরনের পণ্য পরিবহন খরচ বাড়বে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসা অন্যান্য পণ্য যেমন অ্যালুমিনিয়াম, হিলিয়াম, সার- এসবের দামও বাড়বে, যা নির্মাণ, প্রযুক্তি ও খাদ্য খাতে প্রভাব ফেলবে। মার্চ মাসে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি প্রায় ৩.৫ ভাগ হতে পারে, যা গত বছরের বেতন বৃদ্ধিকে কার্যত মুছে দেবে।

হরমুজের বাস্তবতা

এই কারণেই ট্রাম্প এখন হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে উদ্বিগ্ন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তিনি এ বিষয়ে পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন। তার প্রশাসন তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দেয়ার কথা বলেছে, আবার অন্য দেশগুলোকে নিজ দায়িত্বে প্রণালি খুলতে বলেছে। তিনি একসময় বলেন, ‘নিজেদের তেল নিজেরাই নিয়ে যাও!’ ট্রাম্পের এই পরিবর্তনশীল বক্তব্য তেলের দামে ওঠানামা ঘটিয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দাম বেড়েছে। কারণ স্পষ্ট হচ্ছে যে হরমুজ প্রণালিতে ইরানই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে সরে গেলেও প্রণালি পুরোপুরি খুলবে কি না তা নিশ্চিত নয়।

সামনে কী?

বিশ্লেষকরা উদ্বিগ্ন যে ট্রাম্প এখনও যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার কোনো স্পষ্ট কৌশল দেখাননি। তার উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য তেলের সরবরাহ আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এদিকে ইরান জানিয়েছে, তারা প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচলের জন্য টোল নিতে পারে, যা অনেক উপসাগরীয় দেশগুলো দিতে চাইবে না। এমনকি আংশিকভাবে প্রণালি খোলা থাকলেও প্রতিদিন ৪.৪ থেকে ৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের ঘাটতি হতে পারে। ট্রাম্প মঙ্গলবার রাত ৮টা (ইস্টার্ন টাইম) পর্যন্ত সময়সীমা দিয়েছেন প্রণালি খোলার জন্য। কিন্তু ইরান কী সিদ্ধান্ত নেবে বা যুক্তরাষ্ট্র আদৌ তাকে রাজি করাতে পারবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।