ওমিক্রন, ডেল্টাক্রন, ফ্লুরোনা—আসলে কী?

Published: 15 January 2022, 7:25 AM

অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ

শীতের এই সময়টাতে বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণ বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশেও হঠাৎ করোনা সংক্রমণ বেশি দেখা দিচ্ছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির এই সময়ে ওমিক্রন, ডেল্টাক্রন, ফ্লুরোনার মতো কিছু নাম শোনা যাচ্ছে। তবে এগুলো করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট কি না এ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে।

করোনার বিভিন্ন ধরন নিয়ে নানা গবেষণা চলমান। অনেকের ধারণা, করোনা দুর্বল হয়ে ওমিক্রনের মাধ্যমেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। কিছু গবেষণা বলেছে, ওমিক্রন সংক্রমণ হলে ডেল্টা প্রজাতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠতে পারে। তবে করোনা ভাইরাসের গতিবিধির কথা বলা খুব মুশকিল।

ওমিক্রন
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ওমিক্রন একটি নতুন ভ্যারিয়েন্ট। সাধারণ ফ্লু ও ওমিক্রনের উপসর্গ অনেকটা একই রকম। নাক দিয়ে সর্দি পড়া, ঠাণ্ডা লাগা, গলা ব্যথা, হাঁচি-কাশি হলো সাধারণ ফ্লুর লক্ষণ। তবে ওমিক্রনে আক্রান্ত হলে জ্বর, গলা ব্যথা, শুকনো কফ, জ্বর, সর্দি, শরীরে ব্যথা, খুসখুসে কাশি থেকে শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ইত্যাদি উপসর্গ বেশি দেখা দেয়।

তবে আশার কথা হলো, ওমিক্রনে আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে ভর্তির প্রবণতা অথবা মৃত্যুর ঝুঁকি ডেল্টার চেয়েও এখন পর্যন্ত কম। তবে এর মানে এই নয় যে ওমিক্রন কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করবে না। যেকোনো মুহূর্তে এটি ভয়ংকর রূপ ধারণ করতেই পারে। এ জন্য সচেতন থাকতে হবে।

ফ্লুরোনা
কারোর যদি একই সঙ্গে সাধারণ ফ্লু ও করোনা—এই দুইয়ের উপসর্গ থাকে তাহলে তাকে বলা হচ্ছে ফ্লুরোনা। এর লক্ষণগুলো হলো জ্বর, কাশি, ক্লান্তি, সর্দি, গলা ব্যথা ইত্যাদি। তবে এটি করোনাভাইরাসের নতুন কোনো ভ্যারিয়েন্ট বা রূপ নয়। একে অনেকে ডাবল সংক্রমণও বলছেন।

ডেল্টাক্রন
সম্প্রতি সাইপ্রাসে মিলেছে ডেল্টাক্রন। বলা হচ্ছে, করোনার আগের দুই স্ট্রেইন ডেল্টা ও ওমিক্রন মিলিয়ে নতুন এই স্ট্রেইন। অর্থাৎ ওমিক্রন ও ডেল্টার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে এর মধ্যে। তবে এ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি আসলে কোনো স্ট্রেইন নয় এবং একে নিয়ে এখনই ঘাবড়ে যাওয়ার মতো কিছু নেই। কিছু বিজ্ঞানীর মতামত, ওমিক্রনের পরই এত দ্রুত আরো একটি ভ্যারিয়েন্ট আসার কথা নয়। হতে পারে, এটি দুটি রূপের মিশ্রণ; কিন্তু কোনো ধরন নয়। গবেষণার ফলাফল পেতে আরো অপেক্ষা করতে হবে।

করণীয়
ভ্যারিয়েন্ট বা ধরন আর যাই হোক না কেন—করোনা সংক্রমণ থেকে দূরে থাকতে পারাটাই আসল কথা। এ জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত করোনার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই।

মাস্ক অবশ্যই পরবেন
এখন পর্যন্ত এটাই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য যে মাস্ক ব্যবহারে মিলতে পারে সুরক্ষা, তবে তা ব্যবহার করতে হবে সঠিকভাবে। শিশুদেরও সঠিকভাবে মাস্ক পরতে শেখান। মাস্ক শুধু ভাইরাস প্রতিরোধই করে তা নয়, বরং ধুলাবালি আর বাতাসে মিশে থাকা বিভিন্ন আবর্জনার কণা সৃষ্ট হাঁচি-কাশি থেকেও মানুষকে রক্ষা করে।

দূরত্ব বজায় রাখুন
অফিস, বাস, ট্রেন যেখানেই থাকুন না কেন—অন্য মানুষের কাছ থেকে অন্তত দুই মিটার বা ছয় ফুট দূরে থাকার চেষ্টা করুন। এতে হাঁচি-কাশি ছাড়াও বাতাসের মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে করোনাভাইরাস দেহে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি অনেকখানি কমবে। তবে বাড়ির ভেতর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এমন দূরত্বে থাকার দরকার নেই, যদি না কেউ অসুস্থ থাকে। পারতপক্ষে ঘরের বাইরে যতটা সম্ভব কম যাওয়ার চেষ্টা করুন। খুব প্রয়োজনে গেলেও ভিড় এড়িয়ে চলুন।

হাত ধুয়ে খাবার খান
সব সময় হাত ধুতে হবে। পরিবারের সবাই সব সময় হাত ধুয়ে খাওয়ার অভ্যাস করুন। শিশুরা যেন কোনোভাবেই মুখে হাত না দেয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিন। হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবহার বাড়ান। হাত ধুয়ে ঘরে প্রবেশ করুন বা ঘরে প্রবেশ করে আগে হাত ধোন।

হাঁচি-কাশি থেকে দূরে থাকুন
হাঁচি-কাশির সঙ্গে বেরিয়ে আসে অগণিত পানির বিন্দু মিশ্রিত বাতাস, যাকে বলে ড্রপলেটস। একবার কাশি দিলেই বের হতে পারে এ রকম তিন হাজার ড্রপলেট। ওই বাতাসটা আসে সরাসরি ফুসফুস বা শ্বাসতন্ত্র থেকে, যেখানে করোনাভাইরাস বাসা বাঁধে। কাশি দেওয়ার পর থেকে ড্রপলেটের মধ্যে এই ভাইরাসটি তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। সুতরাং হাঁচি দেওয়া ব্যক্তিটি এরই মধ্যে সংক্রমিত হয়ে থাকলে তার প্রতিটি কাশির সঙ্গে বাতাসে ছড়িয়ে যাবে অসংখ্য করোনাভাইরাস। আর এতে যে কেউ সংক্রমিত হতে পারে। তাই যে কারোরই হাঁচি-কাশি থেকে দূরে থাকা খুব জরুরি।

বয়স্ক ও শিশুদের যত্ন নিন
বাসার অন্যান্য সদস্যের অসতর্কতার কারণে পরিবারে থাকা বয়স্ক ও শিশুরাও করোনার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করুন। অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের বিশেষ খেয়াল রাখুন। কোনো উপসর্গ দেখা দিলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান
সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান। শীতের সময় অনেকে কম পানি পান করেন। এটা ঠিক নয়। শীতকালে সুস্থ থাকতে প্রচুর পরিমাণ পানি পান করুন। দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে এমন খাবার বেছে নিন। এ সময় বাইরের খাবার পুরোপুরি বর্জন করুন, ঘরে তৈরি করা খাবার খান।

অসুখ হলে বিশ্রাম নিন
সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা ইত্যাদিতে কেউ আক্রান্ত হলে প্রচুর বিশ্রাম নিতে হবে। দৈনন্দিন কাজকর্ম স্বাভাবিক রেখে শরীরের ওপর চাপ দেওয়া যাবে না। এতে আরো বিপরীত ঘটতে পারে।

টেস্ট করান
কারোর সর্দি, নাক বন্ধ, গলা ব্যথা, কাশি, মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা, জ্বর বা ঠাণ্ডা উপসর্গ থাকলে প্রথমেই উচিত কভিড টেস্ট করে নিশ্চিত হওয়া। এতে পরবর্তী পদক্ষেপ ও চিকিৎসা নেওয়া সহজ হবে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও কমবে।

টিকা নিন
সংশ্লিষ্ট সবাই কভিড-১৯ টিকা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করুন। দুই ডোজ সম্পন্ন করা ব্যক্তিরা বুস্টার ডোজ নিন। এ ব্যাপারে কোনো অবহেলা করবেন না।

যা করবেন না
► আবদ্ধ রুমে মিটিং করা কমিয়ে দিন। কেননা রুমে কেউ হাঁচি-কাশি দিলে তা ওই ঘরের সর্বত্র ছড়িয়ে যায়। এ ছাড়া করোনাভাইরাস বদ্ধ ঘরে বেশিক্ষণ অবস্থান করে।

► শোবারঘরের দরজা-জানালা সারাক্ষণ বন্ধ রাখবেন না।

► লিফটের বাটন, দরজার হাতল সরাসরি আঙুল বা হাত দিয়ে ধরবেন না। ভাইরাস ছাড়াও ওসব স্থানে প্রচুর জীবাণু থাকে।

# সাবেক অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের প্রধান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ

  • 11
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    11
    Shares