সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত।। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে ভীড়

Published: 19 May 2022, 9:34 AM

সিলেট অফিস :

সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পানি বাড়ছে হু হু করে। পানি বাড়ার সাথে সাথে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ সুরমা ডাইকে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট ও ছাতকের সাথে সিলেটসহ সারা দেশের। নৌকার সংকট থাকায় লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে পারছেন না। বন্যার্তদের মাঝে খাবার সংকট বিরাজ করছে। সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বন্যার পানি। বন্ধ হয়ে যেতে পারে যান চলাচল। বন্যার পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির সাপের উপদ্রব দেখা গেছে। গৃহপালিত পশু নিয়ে বিপাকে আছেন কৃষকরা। পানি বাড়তে থাকলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে মর্মে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্যায় সুনামগঞ্জ জেলার দুই শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে।

কানাইঘাট সংবাদদাতা জানান, কানাইঘাট উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গোটা উপজেলার ৯৫ ভাগ এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পানি বাড়ার সাথে সাথে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ সুরমা ডাইকে ভাঙ্গন দেখা দিচ্ছে। ২ লক্ষের অধিক মানুষ গ্রামীণ রাস্তা-ঘাট ডুবে যাওয়ার কারণে পানিবন্দি অবস্থায় দুর্বিষহ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের কাছে ত্রাণসামগ্রী সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না। তারা অনাহারে-অর্ধাহারে রয়েছেন।

গতকাল বুধবার সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১৫৯ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আগের দিন মঙ্গলবার পানি বিপদসীমার ১৪২ সে. মি. ওপর প্রবাহিত হয়। মঙ্গলবার সকালের দিকে পানি হু হু করে বাড়লেও রাতের বেলা পৌর শহরের অধিকাংশ এলাকা থেকে ২ থেকে ৩ ফুট নেমে যায়। কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে বুধবার সকাল থেকে বন্যার পানি আবার বাড়তে থাকে। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই কানাইঘাট বাজার বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। উপজেলা রোড থেকে শুরু করে প্রশাসন পাড়ায় তীব্র স্রোতে পানি ঢুকতে থাকে। অনেক এলাকা নতুন করে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। স্থানীয়রা বলছেন, ২০০৪ সালের বন্যা অতিক্রম করেছে এবারের ভয়াবহ বন্যা। বিশেষ করে কানাইঘাট সদরের সাথে সিলেট শহরের তিনটি যোগাযোগ সড়কের অধিকাংশ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এ কারণে সম্পূর্ণভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা ৫ দিন থেকে বন্ধ রয়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সংকট দেখা দিয়েছে। ১৭টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রের পাশাপাশি উঁচু স্থানে অবস্থিত অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে ২ হাজারের অধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার দিনভর উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব, লক্ষ্মীপ্রসাদ পশ্চিম ইউপির বেশ কিছু বন্যাদুর্গত এলাকা স্পিডবোট নিয়ে পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন্ত ব্যানার্জি। এ সময় তিনি বন্যার্তদের মাঝে শুকনো খাবার ও ত্রাণের চাল বিতরণ করেন। এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কানাইঘাট উপজেলার বন্যা দুর্গতদের জন্য ৩৯ মেট্রিক টন চাল, কয়েক’শ শুকনো খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা পরিষদের ফান্ড থেকে আরো শুকনো খাবার কিনে বিতরণ করা হবে বলে নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন্ত ব্যানার্জি জানান। তিনি বলেন, উপজেলাবাসী ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। বন্যার্ত মানুষের দু:খ-দুর্দশা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বন্যার্তদের সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হচ্ছে। প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিরা বরাদ্দকৃত ত্রাণ বন্যা দুর্গতদের মাঝে পৌঁছে দিচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভয়াবহ বন্যার কারণে পুরো উপজেলায় নৌকা সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে অনেক মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। বন্যা কবলিত লোকজনকে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
জকিগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, জকিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। একের পর এক এলাকায় নদী ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় অচল হওয়ার পথে। উজানের ঢলে হু হু করে কুশিয়ারা-সুরমা নদীর পানি বাড়ছে। বালুভর্তি বস্তা ফেলেও কোথাও কোথাও ডাইকের উপর দিয়ে আসা পানি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। প্লাবিত হয়ে পড়েছেন প্রায় সকল ইউপির মানুষ। চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষজন। বন্যার পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির সাপের উপদ্রবও দেখা গেছে। গৃহপালিত পশু নিয়ে বিপাকে আছেন কৃষকরা। পানি বাড়তে থাকলে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, উপজেলার ৯টি ইউনিয়নই বন্যাকবলিত। পানি বেড়ে ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে নতুন করে ভেঙে গেছে জকিগঞ্জ সদর ইউপির কুশিয়ারা নদীর ডাইক, বিরশ্রী ইউপির সুপ্রাকান্দী গ্রামের ডাইক। তাছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ডাইকের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। পুরো উপজেলায় প্রায় অর্ধলাখের বেশি মানুষ বন্যা আক্রান্ত হয়েছেন। সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বন্যার পানি। বন্ধ হয়ে যেতে পারে যানবাহন চলাচল। কৃষি ও মৎস্যখাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ইউপিতে ১৮টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

বিভিন্ন এলাকার একাধিকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিরশ্রী ইউপির উজিরপুর, বড়চালিয়া, সোনাপুর, খলাছড়া ইউপির বিভিন্ন স্থানে, জকিগঞ্জ পৌর এলাকার কেছরী ও মাইজকান্দী গ্রামে, জকিগঞ্জ সদর ইউপির বাখরশাল, মানিকপুর, রারাই, লালোগ্রাম, সুলতানপুর ইউপির ইছাপুর, সহিদাবাদ, ভক্তিপুর, পিল্লাকান্দী, গঙ্গাজল, বারঠাকুরী ইউপির উত্তরকুল, আমলশীদ, বারঠাকুরী, কসককনপুর ইউপির বিভিন্ন স্থানে ডাইকের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পৌর এলাকার কেছরীগ্রামের ডাইকে ভাঙন দেখা দিলে জকিগঞ্জ শহর বন্যার কবলে পড়বে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে। মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে বন্যা কবলিত এলাকার মানুষের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে ১শ মেট্রিকটন চাল ও ১০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনে ত্রাণ আরও বৃদ্ধি করা হবে। বন্যা কবলিত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি বেশি অবনতি ঘটলে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে আনা হবে।

জকিগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউএনও পল্লব হোম দাস জানান, বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতি ঘটছে। বিভিন্ন স্থানে নদীর ডাইক উপচে পানি গ্রামে ঢোকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে ১০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবারের চাহিদার কথা জেলা প্রশাসনের কাছে জানিয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

গোয়াইনঘাট সংবাদদাতা জানান, গোয়াইনঘাটে পুনরায় পানি বাড়ছে। বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। তবে সময় যত বাড়ছে, পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এতে ৩৬১ জন পানিবন্দি মানুষ অবস্থান করছেন। তাছাড়া ২২০টি গবাদিপশু আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো হলো-রস্তমপুর ইউনিয়নে ৩টি, লেঙ্গুড়া ইউনিয়নে ১টি, পুর্ব আলীরগাঁও ইউনিয়নে ১টি, নন্দীরগাঁও ইউনিয়নে ৩টি এবং পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়নে ২টি আশ্রয়কেন্দ্র। উপদ্রুত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাব দেখা দিয়েছে। চলমান ভারি বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের পানিতে প্লাবিত গোয়াইনঘাট উপজেলা। মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত পানি কিছুটা কমলেও গতকাল বুধবার দুপুর থেকে ভাটি অঞ্চল থেকে আসা সুরমা নদীর পানি গোয়াইনঘাটে প্রবেশ করছে। সিলেট জেলা সদরের সাথে এখনও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অফিসপাড়া রয়েছে ফাঁকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

কোম্পানীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় বন্যাপরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গত মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত কিছুটা কমে দিনে পানি বেড়েছে। গতকাল বুধবার আকাশে সূর্যের দেখা মিললেও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত আছে। প্লাবিত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। বানভাসি মানুষজন গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

প্লাবিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেকের ঘরের ভেতর দুই থেকে তিন ফুট পানি। অনেকে পরিবার নিয়ে খাটের উপরে বসবাস করছেন। ঘরে খাবার নেই। নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছেন না। সরকারি বা বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণের কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। এই অবস্থায় অত্যন্ত কষ্টে আছেন ইউনিয়নবাসী।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার লুসিকান্ত হাজং বলেন, প্লাবিত এলাকার মানুষজনের মধ্যে ইতিমধ্যে ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ছয়টি ইউনিয়নে ১২ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় বরাদ্দের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।

জৈন্তাপুর সংবাদদাতা জানান, জৈন্তাপুর কয়েক দিনের পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। আজও পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সারী ও বড় নয়াগং নদীর পানি স্বাভাবিক পর্যায়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল বুধবার সরজমিনে বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন কালে দরবস্ত, ফতেপুর, চিকনাগুল, নিজপাট ও জৈন্তাপুর ইউপির নিম্নাঞ্চলের পানি কিছুটা কমেছে। তবে, দুপুর ১২টার পর হতে পুনরায় পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি বৃদ্ধির কারণে মানুষজন আতঙ্কিত। অপরদিকে বন্যা কবলিত মানুষের খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ হতে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

এদিকে, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে উপজেলা ২১টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এ সকল আশ্রয়কেন্দ্রে গত ২৪ ঘন্টায় প্রায় ১০ হাজারের বেশি লোক আশ্রয় নিয়েছেন। নিম্নাঞ্চলের লোকজন তাদের গৃহপালিত গবাদিপশু গরু ছাগল ও মহিষ নিয়ে রাস্তার পাশে অবস্থান করেছেন। এছাড়া, পানি বৃদ্ধি শুরু হওয়ায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে নিম্নাঞ্চলের পানিবন্দি লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনা হচ্ছে। তবে আশ্রয়কেন্দ্রের চেয়ে বেশিরভাগ লোক নিকট আত্মীয়দের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছেন।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামাল আহমদ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল বশিরুল ইসলামসহ বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যানগণ বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন এবং বন্যা কবলিতদের মধ্যে বাড়িতে গিয়ে সরকারিভাবে বরাদ্দ ত্রাণসহ ব্যক্তি উদ্যোগে বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ : ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ জেলার ৪টি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ ষোলঘর পয়েন্টে বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শামসুদ্দোহা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে, সৃষ্ট বন্যায় জেলার দুই শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে। এ কারণে গতকাল বুধবার ২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এসএম আব্দুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, জেলার দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলা প্লাবিত হয়েছে বেশি। এছাড়াও সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, শান্তিগঞ্জ উপজেলাসহ পাঁচটি উপজেলার ২২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা না আসতে পারলেও শিক্ষকতা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, বিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চারদিকে পানির কারণে অভিভাবকরা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। তবে বিদ্যালয়ে সকল শিক্ষকের উপস্থিতি আগের মতোই বাধ্যতামূলক রয়েছে।
সুনামগঞ্জ কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানান, ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলা ৭ শত হেক্টর ইরি জমির ধান তলিয়ে গেছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, জেলার ছাতক, দোয়ারাবাজার ও বিশ^ম্ভরপুরে ২৫ টন চাল, সাড়ে ৪ লাখ নগদ টাকা ও এক হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ছাতক উপজেলায় ৭টি ও দোয়ারাবাজারে ৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে দোয়ারাবাজারে একটি গবাদিপশুর আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
বিশ্বনাথ : টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে আকস্মিক বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে বিশ্বনাথ উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন। গত ৩দিনে প্লাবিত হয়েছে উপজেলার লামাকাজী, খাজাঞ্চী ও অলংকারী ইউনিয়ন। প্লাবিত হয়েছে বাড়িঘর, হাটবাজার, গুচ্ছগ্রাম, ধর্মীয় উপসনালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্লাবনে উপজেলার ৫ হেক্টর বোরো ধান, ৩০ হেক্টর আউশ ধানের বীজতলা ও ১৫ হেক্টর সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে উপজেলার লামাকাজী ও খাজাঞ্চী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। লামাকাজীর মির্জারগাঁও, মাহতাবপুর, মাধবপুর, শাহপুর, সাবেহ নগর, শাখারীকোনা, মাখরগাঁও, আকিলপুর, রসুলপুর, হাজারীগাঁও, তিলকপুুর, সৎপুর ও খাজাঞ্চী ইউনিয়নের বাওনপুর, চরগাঁও, তেঘরী, মুছেধর, তবলপুর, রহিমপুর, এনায়েতপুর, অষ্টগ্রাম, মাইজলামাল, হোসেনপুর, কিশোরপুর, ইসলামপুর, রঘুপুর, বন্ধুয়া এবং অলংকারী ইউনিয়নের রামপুর ও খুরমা এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। সুরমা নদীর পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসব এলাকায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আকস্মিক এই বন্যায় উপজেলার ওই তিনটি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ায় চরম দুর্ভোগ-ভোগান্তিতে দিন কাটছে তাদের। গবাদী পশু নিয়ে অনেকেই পড়েছেন বিপাকে। এমন পরিস্থিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ওইসব এলাকার পানিবন্দী মানুষ। গতকাল বুধবার সরেজমিন লামাকাজী ইউনিয়নের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনকালে দেখা যায়, মির্জারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাহতাবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দিঘলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানীয় এলাকার বন্যাকবলিত প্রায় অর্ধশত পরিবারের লোকজন আশ্রয় নিলেও এখন অনেক পরিবারের লোকজন পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। লামাকাজী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবির হোসেন ধলা মিয়া, খাজাঞ্চী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হবিবুল ইসলাম ও অলংকারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজমুল ইসলাম রুহেল জানান, যত সময় যাচ্ছে পানি তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানবেতর দিনযাপন করছেন পানিবন্দী মানুষ। তাদের সহযোগিতার জন্যে সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা খুবই জরুরী। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্র জানায়, উপজেলায় বন্যাকবলিতদের জন্যে ১৩টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, যে সকল বিদ্যালয় পানিবন্দী অবস্থায়, সেগুলোতে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক নুসরাত জাহান বলেন, পানিবন্দী এলাকা পরিদর্শন অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে, জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত ৬ মেট্টিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি আমাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
ছাতক সংবাদদাতা জানান, টানা তিনদিন ধরে ছাতকের সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। উপজেলার পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগের মাঝে দিন কাটাচ্ছে। ছাতক শহরে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও নিম্নাঞ্চলের মানুষ অনেকটাই আশ্রয়হীন অবস্থায় রয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি প্রবেশ করায় শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন গ্রামে পানিবন্দি অবস্থায় চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন কয়েক শ’ পরিবার। এসব পানিবন্দি মানুষ ত্রাণ সহায়তা থেকেও বঞ্চিত রয়েছে। ছাতক শহরের বৌলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তাঁতিকোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও এসপিপিএম উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া, ছাতক সরকারি বহুমুখী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, কুমনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছাতক সদর ইউনিয়ন পরিষদের পুরাতন কার্যালয়সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে বন্যাকবলিত মানুষ। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক আশ্রয়কেন্দ্রসহ পানিবন্দি মানুষের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেছেন। চিড়া, মুড়ি, গুড় সহ শুকনো খাবার বিতরণকালে এমপি মুহিবুর রহমান মানিকের সাথে ছিলেন সাবেক পৌর মেয়র আলহাজ্ব আব্দুল ওয়াহিদ মজনু, উত্তর খুরমা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিল্লাল আহমদ, পৌর মহিলা কাউন্সিলর তাছলিমা জান্নাত কাকলী, মুক্তিযোদ্ধা আজাদ মিয়া, এসপিপিএম উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ তানভীর, সাবেক পৌর কাউন্সিলর আছাব মিয়া, আওয়ামী লীগ নেতা জামাল উদ্দিন, জসিম উদ্দিন, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সভাপতি শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
এদিকে, ছাতক পৌরসভার উদ্যোগে বিকেলে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যা কবলিত মানুষের মাঝে রান্না করা ভুনা খিচুড়ি বিতরণ করা হয়েছে। অপরদিকে, পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন সুমেনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ওয়ার্ডের পানিবন্দি মানুষের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।