কোহিনূর বিতর্কে ভারত-ইউকে মুখোমুখি
পোস্ট ডেস্ক :
ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লসের আনুষ্ঠানিক রাজ্য অভিষেকের অনুষ্ঠানে কুইন কনসর্ট (রাজার স্ত্রী) ক্যামিলা পার্কারকে কোহিনূর হীরা খচিত রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মুকুট না পরাতে, বাকিংহাম প্যালেসকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এ খবর দিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট ও দ্য টেলিগ্রাফ। ব্রিটেনের ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবেতে আগামী বছরের ৬ মে নতুন রাজা তৃতীয় চার্লসের রাজ্য অভিষেক অনুষ্ঠিত হবে। এ অনুষ্ঠানে রীতি অনুযায়ী কুইন কনসর্ট ক্যামিলা পার্কারকে রাজপরিবারের ঐতিহ্যের অংশ রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের কোহিনূর হীরা খচিত মুকুটটি পরতে হয়। রাজ্য অভিষেকের সময় এই মুকুটটি যাতে কুইন কনসর্ট ক্যামিলার মাথায় না উঠে সেজন্য বাকিংহাম প্যালেসকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ভারতীয় জনতা পার্টি বলেছে, কুইন কনসর্ট ক্যামিলার মাথায় কোহিনূর উঠলে তা ভারতীয়দের মনে ঔপনিবেশিক অতীতের বেদনাদায়ক স্মৃতি উসকে দিতে পারে। ভারতীয় জনতা পার্টি ব্রিটিশ রাজপরিবারের কোহিনূর হীরা ব্যবহার করার রীতির তীব্র বিরোধিতা করে, হীরাটি ভারতের বলে দাবি করেছে। তবে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানও কোহিনূর হীরার মালিকানা দাবি করেছে। যা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের হাতে আসার আগে ভারতের মুঘল সম্রাটসহ অনেক শাসকের দখলে ছিল।
ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির আইনপ্রণেতা রাকেশ সিনহা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, কোহিনূর ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ক্ষমার অযোগ্য অতীতের বর্বর এবং শোষণমূলক অপরাধের প্রতীক। এটি অবশ্যই ভারতকে ফিরিয়ে দিতে হবে।
ক্যামিলা যদি কোহিনূর মুকুটটি পরেন, তাহলে এটা মনে হবে যে ব্রিটিশ সরকার ও জনগণ তাদের ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার বহন করছে। এতে
ব্রিটেন কর্তৃক ভারতকে লুণ্ঠন, শোষণ ও ঔপনিবেশিক অতীতের বেদনাদায়ক স্মৃতি ফিরিয়ে আনে । তিনি বলেন, সবচেয়ে আফসোসের বিষয় হলো ব্রিটেন তাদের অতীতের ভুল সংশোধন না করে চুরি যাওয়া রত্ন কোহিনূরকে তাদের সার্বভৌমত্বের অংশ হিসাবে দেখাতে প্রস্তুত ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজ্য অভিষেকের সময় কুইন কনসর্ট ক্যামিলা কোহিনুর মুকুট পরলে ঔপনিবেশিক অতীতের বেদনাদায়ক স্মৃতি ফিরে আসবে।
অতীতের নিপীড়নের স্মৃতি বেশির ভাগ ভারতীয়দের খুব কমই মনে আছে। ভারতীয়দের পাঁচ থেকে ছয় প্রজন্ম গত পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন বিদেশী শাসকের অধীনে কাটিয়েছে। রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর নতুন রাণী ক্যামিলার রাজ্য অভিষেক ও কোহিনূর হীরার ব্যবহার কিছু ভারতীয়কে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দিনগুলিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
কোহিনূর : ‘দ্য হিস্ট্রি অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ইনফেমাস ডায়মন্ড’ বইয়ের সহ-লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পল বলেছেন, ভারতের প্রতিটি মানুষ কোহিনূর হীরার কথা শুনেছে এবং এটি তারা ফেরত চায়। স্পষ্টতই এটি ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।
কোহিনূর হীরাটি ব্রিটেনের ইতিহাসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এটি বিশ্বব্যাপী বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসক হিসাবে অর্জিত বিভিন্ন রত্নের অন্যতম। কোহিনূর সমন্বিত মুকুটটি ১৯৩৭ সালে রাজা জর্জ ষষ্ঠের রাজ্য অভিষেকের সময় রাণী এলিজাবেথের মায়ের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এটি রাজা এডওয়ার্ড সপ্তমের স্ত্রী রাণী আলেকজান্দ্রা, রাজা পঞ্চম জর্জের স্ত্রী কুইন মেরী আর অবশেষে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মা তার স্বামী রাজা ষষ্ঠ জর্জের রাজ্য অভিষেকের সময় পরেছিলেন। পরে, এটি রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাছে যায়। তাকে শেষবার ২০১৬ সালের স্টেট ওপেনিংয়ে মুকুটটি পরতে দেখা গেছে। মুকুটটিতে মোট ২,৮০০টি হীরা রয়েছে। তবে, মুকুটটির শোভা অনেকগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে ১০৫ ক্যারেটের কোহিনূর হীরা। এটি রাণীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় কফিনে স্থাপন করা হয়েছিল এবং তারপর থেকে লন্ডন টাওয়ারে সর্বজনীন প্রদর্শন করা হয়েছে। অমূল্য কোহিনূর হীরাটি ১৭ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসনে শোভা পেতো। ইরানের শাসক নাদির শাহ আক্রমণ করে ১৭৩৯ সালে ভারত থেকে এটি তিনি কেড়ে নিয়ে যান। হাত ঘোরে এটি পাঞ্জাবের শিখ শাসক মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের দখলে ছিল, যার উত্তরাধিকারী ১৮৫০ সালে ব্রিটিশদের হাতে শিখ সাম্রাজ্য পরাজিত হওয়ার পরে রাণী ভিক্টোরিয়ার কাছে হস্তান্তর করে ।
এদিকে, ভারতীয় জনতা পার্টি কর্তৃক সতর্ক করার পর বাকিংহাম প্যালেসের কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে রাজ্য অভিষেকের সময়ে কোহিনূর হীরাটি মুকুট থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে বা রাণী রাজকীয় সংগ্রহ থেকে অন্য কোনো মুকুট ব্যবহার করতে পারেন।
ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাবার পরও যুক্তরাজ্যে থেকে যাওয়া ভারতীয়দের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেয়া হবে, সম্প্রতি ব্রিটিশ হোম সেক্রেটারি সুয়েলা ব্র্যাভারম্যানের এমন মন্তব্যের পর ভারতের বিজেপি সরকার ক্ষুব্ধ। এরপর ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় ভারত-ইউকে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) ভেস্তে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে । এই অবস্থায় আগুনে ঘি ঢাললো কোহিনূর হীরা মুকুট বিতর্ক ।




