গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক খালেদা জিয়া : সংগ্রাম, ত্যাগ ও আত্মমর্যাদার অনন্য অধ্যায়
তানজির আহমেদ রাসেল

৩০ ডিসেম্বর সকালটি নেমে এলো গভীর শোক আর নীরবতার ভার নিয়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অম্লান অধ্যায়, এক সাহসী সংগ্রামী চরিত্র বেগম খালেদা জিয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্রের অটল প্রহরী, বিএনপি’র চেয়ারপার্সন এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি রাজনীতির ময়দানে যে দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের ছাপ রেখে গেছেন, তা জাতির স্মৃতিতে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন ছিল আপসহীন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষায় তিনি কখনো মাথা নত করেননি। প্রবল প্রতিকূলতা, নির্যাতন ও সংকটের মাঝেও তিনি অবিচল থেকেছেন, সাহস জুগিয়েছেন কোটি মানুষের মনে। তাঁর নেতৃত্ব শুধু বাংলাদেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও তিনি পরিচিত ছিলেন দৃঢ়চেতা ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এক নেত্রী হিসেবে। আজ আমরা কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীকে হারাইনি – হারিয়েছি একটি যুগ, একটি আদর্শ, একটি সাহসী কণ্ঠস্বর। তাঁর বিদায়ে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা শুধু রাজনীতির অঙ্গনে নয়, জাতির হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে যাবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন সংগ্রাম, সংকল্প এবং জনগণের পক্ষে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপার্সন এবং গণতন্ত্রের আপসহীন এক প্রতীক – যিনি ৮০ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁর প্রয়াণের সংবাদ শুধু বাংলাদেশের মানুষকেই নয়, বিশ্ব রাজনীতির বিস্তৃত পরিমণ্ডলকেও শোকাহত করেছে। এই মৃত্যু কেবল একজন রাজনীতিবিদের বিদায় নয় – এটি এক দীর্ঘ সংগ্রাম, এক অদম্য সাহস এবং এক আপসহীন নেতৃত্বের সমাপ্তি। বেগম খালেদা জিয়া চলে গেছেন, কিন্তু গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর অবিচল অবস্থান ইতিহাসের বুকে চিরকাল দীপ্যমান থাকবে। জীবনের দীর্ঘ ও বন্ধুর রাজনৈতিক পথে তিনি স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, বারবার কারাবরণ ও নির্যাতনের মুখেও মাথা নত করেননি। একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদার স্বাক্ষর রেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি ভেঙে দিয়েছেন রাজনীতির পুরুষতান্ত্রিক দেয়াল, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে হয়ে উঠেছেন সাহস ও অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত প্রতীক। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর সংগ্রাম, ত্যাগ ও আদর্শ বাংলার রাজনীতিতে আলোকবর্তিকা হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখিয়ে যাবে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু সংবাদে বিশ্বমঞ্চের প্রতিক্রিয়া ছিল গভীর, শ্রদ্ধাশীল ও বহুমাত্রিক। বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব ও সংগঠনগুলো বেগম খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণ করে শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার তিন দিনের জাতীয় শোক ও একদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে, যা রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাঁর অপরিসীম গুরুত্বেরই প্রতিফলন। বাংলাদেশের জাতিসংঘ অফিসিয়াল পেজ থেকে প্রকাশিত বার্তায় জাতিসংঘ গভীর শোক প্রকাশ করে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রামের কথা স্মরণ করেছে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দও এই শোকে শামিল হয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগত শোকবার্তায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর সৌহার্দ্যপূর্ণ সাক্ষাৎ ও ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক গঠনে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একইভাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি ও প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, খালেদা জিয়া আজীবন দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন এবং তাঁর ইন্তেকালে পাকিস্তানও বাংলাদেশের জনগণের শোকের অংশীদার।
রাশিয়া তাঁকে বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক সমাজের এক শক্তিশালী রূপকার হিসেবে স্মরণ করেছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নারীর নেতৃত্বের দৃঢ় ও সাহসী প্রতীক হিসেবে তাঁর অবস্থানকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস এক শোকবার্তায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আখ্যা দিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সসহ বিশ্বের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো তাঁকে একজন “প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা” এবং নারী রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথপ্রদর্শক হিসেবে অভিহিত করেছে। তাঁর জানাজায় অংশ নিতে একাধিক দেশের প্রতিনিধিদের ঢাকায় আগমন প্রমাণ করে যে, বেগম খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশের নন, তিনি ছিলেন বিশ্ব রাজনীতির এক সম্মানিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। এই সব আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া শুধু একটি রাজনৈতিক নেত্রীর মৃত্যু সম্পর্কে নয় বরং একজন মানুষের, এক নারীর ও এক সংগ্রামী নেতার জীবনের প্রতিফলন, যিনি সর্বদা গণতন্ত্রের পথ ধরে চলেছেন, মানুষের কল্যাণ ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় অবিচল থেকেছেন এবং তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি জনগণের সাথে অংশীদার হয়েছেন।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের এই দীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে তাঁর ভূমিকা কেবল বাংলাদেশের আয়ত্বেই সীমাবদ্ধ নয় – তিনি ছিলেন একের পর এক প্রজন্মের অনুপ্রেরণা, একজন গণতন্ত্রের প্রতীক এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, যাঁর স্মৃতি সর্বদা একটি চিরন্তন অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে উজ্জ্বল থাকবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বর্ণাঢ্য, সংগ্রামী ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। বেগম খালেদা জিয়ার জীবন কেবল একজন রাজনীতিবিদের জীবনী নয়, ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ক্ষমতা ও বিরোধিতার টানাপোড়েন, কারাবরণ ও প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েও তিনি যে অবিচল দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা তাঁকে সমসাময়িক রাজনীতির ঊর্ধ্বে তুলে দিয়েছে।
খালেদা জিয়ার সাহস ও নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিকে বহুবার নতুন মোড় দিয়েছে। সংকটের সময় তিনি কখনো আপসের পথ বেছে নেননি, বরং প্রতিকূলতার মাঝেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালীন যেমন তিনি দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তেমনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে একজন এমন নেত্রী হিসেবে, যাঁর শক্তি ছিল তাঁর আপসহীনতা এবং যাঁর পরিচয় ছিল সংগ্রাম। নারী হয়েও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তিনি ভেঙে দিয়েছেন বহু সামাজিক ও রাজনৈতিক দেয়াল। পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন নেতৃত্বের মানদণ্ড লিঙ্গে নয়, দৃঢ়তায়। তিনি শুধু নারী রাজনীতিবিদদের জন্যই নন, বাংলাদেশের প্রতিটি সংগ্রামী মানুষের জন্য হয়ে উঠেছিলেন সাহস ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। তাঁর পথচলা অসংখ্য নারীর রাজনৈতিক সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছে।
আজ বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শ ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অধিকার ও নেতৃত্বের যে দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলা—তার বহু অধ্যায় জুড়ে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকবে এই নাম। সময়ের প্রবাহে অনেক কিছু বদলে যাবে, প্রেক্ষাপট পাল্টাবে, কিন্তু খালেদা জিয়ার সাহস, ত্যাগ ও আপসহীন নেতৃত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে থেকে যাবে এক অনির্বাণ অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে। তাঁর প্রস্থান মানে শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর বিদায় নয়; এটি সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও দৃঢ়চেতা নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘ সময়ের অবসান। গণতন্ত্রের পক্ষে তাঁর অবিচল অবস্থান, স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে দৃঢ় ভূমিকা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সাধারণ এক গৃহবধূ থেকে ইতিহাসের কঠিনতম দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার গল্পটি বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বেদনাবিধুর ও গৌরবময় অধ্যায়। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হারিয়ে হঠাৎ বদলে যাওয়া বাস্তবতায় তিনি ভেঙে পড়েননি; বরং শোককে শক্তিতে রূপ দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জাতির সামনে। এক–এগারোর দুঃসময়েও তিনি দেশ ত্যাগ করতে রাজি হননি, আপস করেননি নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে। ভয়, নিপীড়ন ও একাকীত্বের মাঝেও তিনি মাতৃভূমিকে আঁকড়ে ধরেছিলেন কারণ তাঁর কাছে দেশ ছিল শুধু ভূখণ্ড নয়, ছিল আত্মপরিচয় ও দায়িত্ব। এই অবিচলতা, এই আত্মমর্যাদা আর এই ত্যাগই তাঁকে সাধারণের ঊর্ধ্বে তুলে এনে ইতিহাসের এক অনন্য উচ্চতায় স্থাপন করেছে। সময় বদলাবে, প্রেক্ষাপট পাল্টাবে কিন্তু খালেদা জিয়ার নাম, তাঁর সাহস, ত্যাগ ও আপসহীন নেতৃত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। তিনি থাকবেন এক অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখাবে।




