ইরানের ১০,০০০ কোটি ডলারের জব্দ সম্পদ কী এবং কোথায় রাখা আছে?

Published: 16 April 2026

পোস্ট ডেস্ক :


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনাকে কেন্দ্র করে একটি বড় বিতর্ক সামনে এসেছে। তাহলো বিদেশে রাখা তেহরানের ‘ফ্রোজেন অ্যাসেটস’ বা জব্দ করা সম্পদ। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের পর প্রথম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পরে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এই নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়। ফলে তেল বিক্রির আয়সহ ইরানের নিজস্ব সম্পদ বিদেশি ব্যাংকগুলোতে আটকে যায়।

১০ এপ্রিল পাকিস্তানে যুদ্ধবিরতি আলোচনা শুরু হওয়ার আগে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে বলেন, বিদেশে থাকা ইরানের জমাট সম্পদ মুক্ত না হলে কোনো আলোচনা শুরু করা উচিত নয়। একদিন পর ইসলামাবাদে বৈঠকের সময় কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কিছু সম্পদ ছাড়তে রাজি হয়েছে। কিন্তু দ্রুতই মার্কিন সরকার তা অস্বীকার করে এবং জানায়, সম্পদগুলো এখনও জব্দ অবস্থায় রয়েছে। ২২ এপ্রিল মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এই ইস্যু আবার সামনে আসবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানের জমাট সম্পদের পরিমাণ কত?
সঠিক পরিমাণ নির্দিষ্ট না হলেও ইরানের সরকারি সূত্র ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে আটকে থাকা সম্পদের পরিমাণ ১০,০০০ কোটি ডলারের বেশি। মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ফ্রেডেরিক শ্নাইডার আল জাজিরাকে বলেন, এই অর্থ ইরানের বার্ষিক তেল ও গ্যাস আয়ের প্রায় তিন গুণ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় ভোগা একটি দেশের জন্য এটি অত্যন্ত বড় অঙ্ক। তবে তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্পদ মুক্ত করলেও তা কীভাবে ব্যবহার হবে, সে বিষয়ে শর্ত আরোপ করতে পারে তারা। ২০১৬ সালে মার্কিন সাবেক ট্রেজারি সেক্রেটারি জ্যাকব লিউ বলেন, সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলেও ইরান তার জব্দ করা সম্পদের পুরোটা ব্যবহার করতে পারবে না। কারণ অনেক অর্থ আগেই বিনিয়োগ বা ঋণ পরিশোধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমানে ইরান আলোচনায় কমপক্ষে ৬০০ কোটি ডলার ছাড় দেয়ার দাবি করছে, যা আস্থা বৃদ্ধির পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‘ফ্রোজেন অ্যাসেটস’ কী?
কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা দেশের সম্পদ (টাকা, সম্পত্তি বা সিকিউরিটিজ) অন্য দেশের সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থা সাময়িকভাবে আটকে দিলে তাকে ‘ফ্রোজেন অ্যাসেটস’ বলা হয়। নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ বা নিয়ন্ত্রণের কারণে এসব সম্পদ ব্যবহার বা বিক্রি করা যায় না। সমালোচকদের মতে, এই ব্যবস্থা প্রায়ই পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। উদাহরণ হিসেবে ইরান, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, লিবিয়া, ভেনেজুয়েলা ও কিউবার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।

কেন ইরানের সম্পদ জব্দ?
১৯৭৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার প্রথম ইরানের সম্পদ জব্দ করেন। কারণ তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ৬৬ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল। ১৯৮১ সালে আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কিছু সম্পদ মুক্ত করে, বিনিময়ে ইরান ৫২ জন জিম্মিকে মুক্তি দেয়। পরবর্তীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ইরান দাবি করে এটি বেসামরিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল অভিযোগ করে এটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা। ২০১৫ সালে মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তির মাধ্যমে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করে এবং কিছু সম্পদ ফেরত পায়। কিন্তু ২০১৮ সালে ডনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ২০২৩ সালে বন্দি বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা ৬০০ কোটি ডলার কাতারে স্থানান্তর করা হয়। তবে পরে নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান আবার সেই অর্থে প্রবেশাধিকার হারায়।

কোন দেশগুলো ইরানের সম্পদ ধরে রেখেছে?
ইরানের জব্দকৃত সম্পদ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। আনুমানিক হিসাবে চীনে আছে কমপক্ষে ২০০০ কোটি ডলার। ভারতে আছে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার। ইরাকে আছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। জাপানে আছে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার। কাতারে আছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে আছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ, যেমন লুক্সেমবার্গে আছে প্রায় ১৬০ কোটি ডলার।

কেন এই সম্পদ ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি সংকটে। মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে, রিয়ালের মূল্য কমেছে। দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ১০,০০০ কোটি ডলার- যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ, তা ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রোক্সান ফরমান ফরমাইয়ান বলেন, এই অর্থ মুক্ত হলে ইরান তার তেল বিক্রির আয় দেশে ফিরিয়ে আনতে পারবে এবং মুদ্রা স্থিতিশীল রাখতে পারবে। তিনি বলেন, ইরানের তেলক্ষেত্র, পানি ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়নে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পুনর্গঠনেও এটি সহায়ক হবে। ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্রিস ফেদারস্টোন বলেন, এই সম্পদ মুক্ত করা হলে আন্তর্জাতিকভাবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কমানোর ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চিত নীতির কারণে এটি আবার বিভ্রান্তির কারণও হতে পারে। বিষয়টি মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়ের জন্যই।