ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে প্রাণ গেল মৌলভীবাজারের মুহিবুরের

Published: 22 April 2026

পোস্ট ডেস্ক :


হতদরিদ্র পরিবারের একমাত্র আশার প্রদীপ ছিলেন মুহিবুর রহমান (২৬)। ৩ ভাই আর ২ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। হঠাৎ তার মৃত্যুর সংবাদে এখন পরিবার ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির আশপাশের পরিবেশ। বাড়ির দূর থেকেই ভেসে আসছে স্বজনদের কান্নার আওয়াজ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম শিক্ষিত ছেলেকে হারিয়ে বিলাপ আর আহাজারি করছেন বৃদ্ধ বাবা-মা, নববধূ, ভাই-বোনসহ স্বজনরা। এখন তার লাশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন তারা। আর্থিক অভাব- অনটনের মধ্যেও মেধাবী শিক্ষার্থী মুহিবুর রহমান সকলের সার্বিক সহযোগিতায় কৃতিত্বের সঙ্গে প্রাথমিক, মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্য নির্মমতায় তাকে নিয়ে যায় সরাসরি রণক্ষেত্রে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীর হয়ে লড়াই করতে গিয়ে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান মুহিবুর।

নিহত মুহিবুর রহমান মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আমতৈল ইউনিয়নের সম্পদপুর গ্রামের মশহুদ মিয়া ও সুফিয়া বেগম দম্পতির ছেলে। জানা গেছে, মুহিবুর এসএসসি আমতৈল উচ্চ বিদ্যালয় ও মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। এরপর সিলেট এমসি কলেজে ভর্তি হলে সেখান থেকে রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। সেখান থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ২০২৩ সালে মেক্সিকোতে পাড়ি দেন। কিন্তু সেখানে কোনো কারণে তার ভিসা বাতিল হয়ে গেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি দিশাহারা হয়ে যান। একপর্যায়ে দালালের খপ্পরে পড়েন। দালালরা তাকে প্ররোচনা দেয় রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিলে ভালো বেতনও পাবেন এবং যুদ্ধ শেষে মিলবে রাশিয়ার নাগরিকত্ব। এমন স্বপ্ন নিয়ে তিনি ২০২৫ সালে দেশে ফিরেন। দেশে অবস্থান কালে একই ইউনিয়নের খুশহালপুর গ্রামের মখলিছ মিয়ার কলেজ পড়ুয়া কন্যা রায়িসা জান্নাতের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তিনি কিছুদিন দেশে অবস্থান করে পরিবারের আর্থিক দৈন্যদশা লাঘবে দালালদের সেই প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমান। যে ছেলের হাতে উচ্চশিক্ষার উপকরণ থাকার কথা ছিল, পরিস্থিতির শিকার হয়ে তার হাতে উঠে আসে মারণাস্ত্র। রাশিয়ায় দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে তাকে পাঠানো হয় সম্মুখ যুদ্ধে। দীর্ঘদিন রাশিয়ার হয়ে লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান তিনি।

রাশিয়ান সৈনিকদের খাবার সরবরাহকারী তার এক বাংলাদেশি বন্ধুর মাধ্যমে শুক্রবার পরিবারের সদস্যরা তার মৃত্যুর খবর পান। রাশিয়ায় যাওয়ার পর মুহিবুর প্রথম দিকে ফোনে পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখলেও প্রায় ৩-৪ মাস থেকে তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ হচ্ছিল না। এ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা চরম দুশ্চিন্তায় ছিলেন। নিহত মুহিবুরের পরিবারের সদস্যরা জানান মুহিবুর একটি বাংকারের ভেতরে অবস্থান করছিলেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় বাংকারটি বিধ্বস্ত হলে তিনি মারা যান। তবে ঠিক কবে তার মৃত্যু হয়েছে তা পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। গতকাল (মঙ্গলবার) বিকালে সরজমিন মুহিবুরের গ্রামের বাড়িতে গেলে সেখানে উপস্থিত সম্পদপুর গ্রামের বাসিন্দা মুহিবুর রহমানের প্রতিবেশী মো. ফখরুল ইসলাম, মো. আব্দুর রউফ, ওয়াহিদুর রহমান রাফি, রাহি মিয়াসহ অনেকেই মানবজমিনকে জানান- মুহিবুরের পরিবারটি হতদরিদ্র পরিবার। দিনমজুর বাবার কষ্টার্জিত আয়-রোজগার, আত্মীয় স্বজন ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় সে পড়ালেখায় অগ্রসর হয়েছিলো। সে অত্যন্ত মেধাবী, নম্র ও ভদ্র ছিল। রাশিয়ায় যাওয়ার আগে সে ধার-দেনা করে টাকা যোগাড় করেছিলো। তাকে হারিয়ে এই দরিদ্র পরিবারটি চরম অসায়। তারা সরকারের কাছে জোর দাবি জানান যাতে দ্রুত তার লাশটি আনার ব্যবস্থা করেন। সেই সঙ্গে ঋণগস্ত এই দরিদ্র পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে সহযোগিতা করেন।