যুক্তরাষ্ট্রে হুমকির মুখে ট্রান্সজেন্ডারদের স্বাস্থ্যসেবা

Published: 21 May 2026

পোস্ট ডেস্ক :


যুক্তরাষ্ট্রে ট্রান্সজেন্ডার ও নন-বাইনারিদের (লিঙ্গ নির্দিষ্ট নয়) স্বাস্থ্যসেবা সীমিত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এতে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংকট দেখা দেওয়ায় বেশির ভাগ পরিবার টেলিহেলথ, অর্থাৎ ডিজিটাল মাধ্যমে দূর থেকে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ওপর নির্ভর করছে।

দিন দিন এই সংটক তীব্র হওয়ায় এসব পরিবারগুলো চিকিৎসা ব্যবস্থাসহ বিকল্প পথ খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থায় অনেকে ওষুধ মজুদ করছে, আবার কেউ বিদেশে চিকিৎসার পথ খুঁজছে।
চিকিৎসক, রোগী, নীতিনির্ধারণ বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীদের বরাতে এমন তথ্য উঠে এসেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সে এক প্রতিবেদনে।

স্বাস্থ্যসেবায় আইন জারি

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৯ বছরের কম বয়সীদের জন্য লিঙ্গ-স্বীকৃতিমূলক বা লিঙ্গ-স্বীকৃতিমূলক চিকিৎসা সীমিত করতে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন।

এর আগে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত ২৭টি অঙ্গরাজ্যে এমন চিকিৎসাসেবা সীমিত করতে আইন বা বিধি-নিষেধ চালু হয়েছিল। যদিও আদালত সাময়িকভাবে ওই আদেশ স্থগিত করেছেন। তবু প্রশাসন নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে মার্কিন বিচার বিভাগ যখন লিঙ্গ-স্বীকৃতিমূলক চিকিৎসাসংক্রান্ত রোগীদের নথি চেয়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কাছে সমন পাঠাতে শুরু করে, তখন আলাবামার ১৯ বছর বয়সী ট্রান্সজেন্ডার তরুণী হারলেই ওয়াকার ও তার পরিবার অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করে।

হারলেই ওয়াকার বলেন, ‘আমি আলাবামার অবার্নে বড় হয়েছি। কিন্তু সেখানে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না, কারণ আমার বাবা-মা, চিকিৎসক এবং আমাকেই যেন অপরাধী বানানো হচ্ছিল।’

বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে কলেজে পড়ছেন। মেরিল্যান্ডে রাজ্যে লিঙ্গ-স্বীকৃতিমূলক চিকিৎসায় আইনি সুরক্ষা পাওয়া যায়। তার ভাষায়, ‘এখানে নিরাপত্তার অনুভূতি আছে।

এটি অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও প্রগতিশীল অঙ্গরাজ্য।’
তার বাবা জেফ ওয়াকার রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমরা এখনো প্রতিদিন আমাদের নিরাপত্তার জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ রাজ্যে অথবা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করি।’

ট্রেভর প্রজেক্ট নামের একটি অলাভজনক সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে অক্টোবরের মধ্যে জরিপে অংশ নেওয়া ১৩ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ১৬ হাজার এলজিবিটিকিউ তরুণ-তরুণীর এক-তৃতীয়াংশ নিজেদের বা পরিবারের অন্য অঙ্গরাজ্যে চলে যাওয়ার কথা বিবেচনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ১৫ লাখ মানুষ নিজেদের ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে পরিচয় দেয়।

নীতি বনাম চিকিৎসা বিজ্ঞান

লিঙ্গ-স্বীকৃতিমূলক চিকিৎসার মধ্যে পছন্দের নাম বা সর্বনাম ব্যবহার থেকে শুরু করে বয়ঃসন্ধি বিলম্বকারী ওষুধ, হরমোন থেরাপি বা অস্ত্রোপচার পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, লিঙ্গ বৈষম্যে ভোগা ব্যক্তিদের জন্য এ ধরনের সেবা অনেক ক্ষেত্রে জীবন রক্ষাকারী হতে পারে।

আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, এন্ডোক্রাইন সোসাইটি ও আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসসহ বেশিরভাগ বড় চিকিৎসা সংস্থা লিঙ্গ-স্বীকৃতিমূলক চিকিৎসাকে সমর্থন করে।

তবে গত ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকান সোসাইটি অব প্লাস্টিক সার্জনস তরুণদের জেন্ডার-সংক্রান্ত অস্ত্রোপচার বিলম্বিত করার সুপারিশ করে। ট্রেভর প্রজেক্টের সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ তরুণ-তরুণী লিঙ্গ-স্বীকৃত সেবা পেতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছেন।

আইনি জটিলতায় জটিল স্বাস্থ্যসেবা

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৩ বছর বয়সী ক্লেয়ার ক্যাবরেরা তার কিশোর সন্তানের জন্য লিঙ্গ-স্বীকৃতিমূলক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করছেন। গ্রামীণ এলাকা থেকে তাদের নিয়মিত দূরে ভ্রমণ করতে হয়েছে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার জন্য। তার সন্তানের জেন্ডার পরিচয়ের যাত্রা শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে। তখন নতুন সর্বনাম ব্যবহার ও পোশাক পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিচয়ের প্রকাশ শুরু হয়।

পরবর্তীতে সে বয়ঃসন্ধি বিলম্বকারী ওষুধ ও টেস্টোস্টেরন থেরাপি গ্রহণ করে। তবে সাম্প্রতিক বিধিনিষেধ ও চিকিৎসাসেবা সংকটের কারণে তার তিন মাসের টেস্টোস্টেরন সরবরাহ শেষ হয়ে গেলে পরিবারটি এখন টেলিহেলথ সেবার ওপর নির্ভর করছে।

কারণ নির্ধারিত ইনজেকশন মিস হলে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, মাসিকজনিত ব্যথা এবং উদ্বেগের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এ বিষয়ে ক্যাবরেরা বলেন, ‘আমাদের সন্তানের পাশে দাঁড়াতে যা যা প্রয়োজন সবই করব। প্রয়োজনে অঙ্গরাজ্যের বাইরে বা দেশের বাইরেও বিকল্প খুঁজব।’

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ৪০টিরও বেশি হাসপাতাল তরুণদের জন্য এ ধরনের চিকিৎসা সীমিত করেছে বলে জানিয়েছে স্ট্যাট নিউজ।

মিশিগান ইউনিভার্সিটি হেলথ গত আগস্টে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য হরমোন থেরাপি ও বয়ঃসন্ধি বিলম্বকারী ওষুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। ‘অভূতপূর্ব আইনি ও নিয়ন্ত্রক চাপের’ কথা উল্লেখ করে এ সিদ্ধান্তের কথা জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

অন্যদিকে, কিছু হাসপাতাল আদালতের রায়ের পর আবারও সেবা চালু করেছে।

বিকল্প নাকি দেশান্তরী

যুক্তরাষ্ট্রে লিঙ্গ-স্বীকৃতিমূলক চিকিৎসাসেবা সংকুচিত হওয়ায় কানাডা ও ইউরোপের দেশগুলো অনেক ট্রান্সজেন্ডার পরিবারের কাছে আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠছে। এমনটাই জানিয়েছেন ট্রান্সজেন্ডার অধিকারবিষয়ক থিংক ট্যাংক মুভমেন্ট অ্যাডভান্সমেন্ট প্রজেক্টের স্বাস্থ্যনীতি উপদেষ্টা কেলান বেকার।

তিনি বলেন, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিধিনিষেধ বাড়তে থাকায় পরিবারগুলো এখন চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে।

এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার খ্যাতনামা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান চিলড্রেনস হসপিটাল লস অ্যাঞ্জেলেস ৩০ বছর পরিচালনার পর ২০২৫ সালে তাদের জেন্ডার ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ‘বাহ্যিক চাপ’ এবং কার্যকরভাবে এগিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই- উল্লেখ করে এ সিদ্ধান্ত নেয়।

লস অ্যাঞ্জেলেস এলজিবিটি সেন্টারের সংগঠক মারিয়া ডো বলেন, ক্লিনিকটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিবারগুলো বিকল্প খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেকে ওষুধ মজুত করছে, আবার কেউ বিদেশে চিকিৎসার পথ খুঁজছে।

রোড আইল্যান্ডের চিকিৎসক বেথ ক্রোনিন জানান, টেক্সাস ও ফ্লোরিডার মতো অঙ্গরাজ্য থেকে রোগীরা তার কাছে আসছেন ‘স্থিতিশীল’ চিকিৎসা পরিবেশের আশায়। তবে তিনি বলেন, বিদেশে চলে যাওয়া অধিকাংশ পরিবারের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান নয়।