নারী ও অ্যালগারিদমের ফাঁদ

Dr Zaki Rezwana Anwsr FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে প্রযুক্তি পক্ষপাতহীন ও নিরপেক্ষ, কারণ এর নিজস্ব কোনো আবেগ বা অনুভূতি নেই। তবে বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এআই নিজে থেকে কোনো জ্ঞান তৈরি করে না; এটি মূলত মানুষের দেওয়া ঐতিহাসিক ড্যাটা (Data) বিশ্লেষণ ক’রে সিদ্ধান্ত নিতে শেখে। এই ঐতিহাসিক ড্যাটাই যখন বৈষম্যমূলক বা একপেশে হয়, তখন এআই-এর সিদ্ধান্তেও সেই বৈষম্য ফুটে ওঠে, যাকে বলা হয় ‘অ্যালগরিদমিক বায়াস’ (Algorithmic Bias)। আমাদের মনে রাখতে হবে, এআই কোনো সমান বা সমানাধিকারভিত্তিক বিশ্বমঞ্চে প্রবেশ করেনি। তাই মানুষের মস্তিষ্ক থেকে তৈরি এই প্রযুক্তি অলক্ষ্যেই বহন ক’রে চলেছে মানুষেরই দীর্ঘকালের গড়ে তোলা সামাজিকভাবে লালিত লিঙ্গবৈষম্য ও সংস্কারসমূহ। আর সেজন্যেই সমাজের লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও ক্ষমতার সমীকরণ প্রযুক্তির ভেতরেও প্রতিফলিত হচ্ছে। ফলে এআই কেবল অতীতে সৃষ্ট বৈষম্যগুলোকে গ্রহণই করছে না, বরং অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সেগুলোকে নতুন ক’রে পুনরুৎপাদন ও শক্তিশালী করছে আর আমরা দেখছি, ড্যাটার ফাঁদে লিঙ্গবৈষম্য। জেন্ডার বৈষম্য নিরসনে এআই প্রযুক্তির ভূমিকা এখন বিশ্বব্যাপী একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Screenshot
এআই একদিকে যেমন নারীদের জন্যে নতুন কাজের সুযোগ, ক্ষমতায়ন এবং স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রগতির নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি অ্যালগরিদমীয় বৈষম্য, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ডিপফেকের (deepfake) মতো ডিজিটাল নিরাপত্তার ঝুঁকিসমূহ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে, এআই এর যুগে নারী কেবল নিষ্ক্রিয় ব্যবহারকারী নাকি প্রযুক্তির নতুন বৈষম্যের শিকার – এই প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন আলোচিত হলেও আরো অনেক গুরুত্বের সাথে আলোচিত হওয়া প্রয়োজন । আসলে এআই কী কী করতে পারে সেদিকেই যেন আমাদের সমস্ত দৃষ্টি, কিন্তু এটি কোথায় প্রযুক্ত হচ্ছে সেদিকে আমাদের নজর নেই বললেই চলে।
কর্মক্ষেত্রে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য প্রকটভাবে ধরা পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজন (Amazon) যখন কর্মী বাছাইয়ের জন্যে একটি এআই চালিত অটোমেটেড টুল তৈরি করেছিল, তখন দেখা যায় সিস্টেমটি নারী আবেদনকারীদের জীবনবৃত্তান্ত (CV) সরাসরি বাতিল ক’রে দিচ্ছিল। এর কারণ ছিল, বিগত ১০ বছরের আমাজনের সফল কর্মীদের ডেটা বিশ্লেষণ ক’রে এআই ধরে নিয়েছিল যে ‘পুরুষ হওয়া’ সফলতা লাভের অন্যতম শর্ত। এভাবে সমাজে বিদ্যমান চাকরির বাজারের বৈষম্যই প্রযুক্তিতে প্রতিফলিত হয়েছিল।
একই ঘটনা ঘটে আর্থিক ক্ষেত্রেও। এআই-ভিত্তিক অ্যালগরিদমগুলো ব্যাংক ঋণ অনুমোদন বা ক্রেডিট কার্ডের সীমা নির্ধারণের সময় অনেক ক্ষেত্রে নারীদের কম যোগ্য বলে বিবেচনা করে, কারণ তাদের ট্রেনিং ড্যাটায় নারীদের বেতন বা ঐতিহাসিক সম্পদ অর্জনের পরিমাণ ছিল তুলনামূলক কম।
এআই বিশ্ব অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে আমূল পরিবর্তন আনছে। এই পরিবর্তন নারীদের কর্মসংস্থানে দ্বিমুখী প্রভাব ফেলছে। এআই চালিত ফ্রিল্যান্সিং, রিমোট ওয়ার্ক এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো গৃহকেন্দ্রিক কাজের পাশাপাশি নারীদের আর্থিক স্বাবলম্বী হতে নজিরবিহীন সুযোগ তৈরি করেছে। এআই-ভিত্তিক লার্নিং টুলস ব্যবহার করে নারীরা ঘরে বসেই কোডিং, ডেটা অ্যানালিসিস ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন।
তবে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে, অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়করণের ফলে সবচাইতে বেশী ঝুঁকিতে রয়েছেন নারীরাই। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব চাকরিতে এআই অটোমেশনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, যেমন: ড্যাটাএন্ট্রি, কাস্টমার সার্ভিস, প্রশাসনিক সহকারী, ক্যাশিয়ার ও রিটেইল সেলস – সেগুলোতে বিশ্বজুড়ে নারী কর্মীদের আধিপত্য বেশী। এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে এই কাজগুলো বিলুপ্ত হতে চলেছে, যার সরাসরি ধাক্কা গিয়ে পড়ছে নারী কর্মীদের ওপর।

Screenshot
এআই প্রযুক্তিতে জেন্ডার বৈষম্যের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো প্রযুক্তি খাতে নারীদের উপস্থিতির আনুপাতিক হারের স্বল্পতা। পুরুষরা technology বেশী বোঝে এমন একটি ষ্টেরিওটাইপ ধারণাও এর কারণ। ফলে প্রযুক্তি জগতে নারীর অংশগ্রহণও কম। ইউনেস্কোর (UNESCO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এআই এবং ড্যাটা সাইন্স পেশাদারদের মধ্যে নারীদের হার অত্যন্ত অপ্রতুল (মাত্র ২২ শতাংশের কাছাকাছি)। গ্লোবাল আইটি জায়ান্টগুলোতে এআই গবেষণাগারের শীর্ষ পদে নারীদের উপস্থিতি আরও নগণ্য। কাজেই যখন এআই অ্যালগরিদম ডিজাইন করার টিমে মূলত পুরুষরাই থাকেন, তখন সেখানে নারীদের সমস্যা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রয়োজনগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়। যেমন, প্রথম দিকের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টগুলো (যেমন Siri বা Alexa) বাই-ডিফল্ট নারী কণ্ঠে তৈরি করা হয়েছিল এবং সেগুলোকে আদেশ পালনকারী সাবজেক্ট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সমাজবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নারীদের সম্পর্কে প্রচলিত একটি ক্ষতিকর ধারণাকেই উস্কে দেয় যে, নারীরা মূলত আজ্ঞাবহ ও সেবামূলক কাজের জন্যই উপযুক্ত। প্রযুক্তি রূপায়নের টেবিলে নারীদের অনুপস্থিতির কারণে পণ্যের ডিজাইন ও ব্যবহারে লিঙ্গভিত্তিক স্টিরিওটাইপ (Stereotype) ফুটে ওঠে।
এআই প্রযুক্তি শুধু লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যই নয়, বরং লিঙ্গ ও বর্ণের (Race and Gender) মিশ্রণে আরও মারাত্মক ভুল করে থাকে। এটি ‘ইন্টারসেকশনাল বায়াস’ নামে পরিচিত। এমআইটি (MIT)-এর গবেষক জয় বুওলামউইনির (Joy Buolamwini) গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখাবয়ব শনাক্তকরণ সফটওয়্যারগুলো ফর্সা পুরুষের মুখ শনাক্তকরণে প্রায় শতভাগ নির্ভুল হলেও, কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ক্ষেত্রে ভুল করার হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। এর মূল কারণ, সফটওয়্যারগুলোকে ট্রেনিং দেওয়ার সময় ব্যবহৃত ড্যাটাসেটে সাদা চামড়ার পুরুষদের প্রাধান্য ছিল। তাই অপরাধী শনাক্তকরণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তখন নিরপরাধ কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা ভুলবশত অভিযুক্ত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে পড়েন।
এআই এর অন্যতম অনৈতিক রূপ দেখা যাচ্ছে ‘জেনারেটিভ এআই’ (Generative AI), যা নারীদের নিরাপত্তার জন্যে সরাসরি হুমকি তৈরি করছে। ‘ডিপফেক’ (Deepfake) প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব সহজেই এআই ব্যবহার ক’রে কোনো নারীর সাধারণ ছবিকে ভুয়া অশ্লীল ছবি বা ভিডিওতে রূপান্তরিত ক’রে ডিজিটাল সহিংসতা নারীদের জন্যে এযুগে এক বাড়তি হুমকি । ডিপফেক ছাড়াও এআই-চালিত বট দিয়ে নারীদের অনলাইন বুলিং, ব্ল্যাকমেইলিং এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। বিশেষ ক’রে ‘জেনারেটিভ এআই’ প্রযুক্তি আসার পর জেন্ডার-বেসড সাইবার ভায়োলেন্স বা লিঙ্গভিত্তিক ডিজিটাল সহিংসতা মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেটে থাকা মোট ডিপফেক কনটেন্টের ৯০ শতাংশেরও বেশি কনটেন্ট নারীদের সম্মতি ছাড়া তৈরী করা আপত্তিকর কন্টেন্ট। এর শিকার হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু ক’রে রাজনীতিবিদ ও তারকারা। ডিপফেক প্রযুক্তি অনলাইন স্পেসে নারীদের মুক্তচিন্তা বাকস্বাধীনতা সংকুচিত, মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং যা সামাজিক জীবনে নারীদের নিরাপত্তার জন্যে এক বড় হুমকি তৈরী করেছে।
তবে আশার দিক হচ্ছে, এআই-এর এই জেন্ডার বৈষম্য কোনো অপরিবর্তনীয় সত্য নয়। সদিচ্ছা থাকলে এটি সমাধান করা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নারীর জন্য হুমকি না বানিয়ে ক্ষমতায়নের হাতিয়ারে পরিণত করতে হলে বিশ্বব্যাপী সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এর জন্যে আমাদের যা করতে হবে তা হচ্ছে:
১. অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরপেক্ষ ড্যাটাসেট: এআই অ্যালগরিদমকে যে ড্যাটা দিয়ে ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে, তা হতে হবে অন্তর্ভুক্তীমূলক ও নিরপেক্ষ। এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত ডেটা হতে হবে বৈচিত্র্যময় এবং লিঙ্গ-নিরপেক্ষ। তপক্ষপাতদুষ্ট ডেটা বর্জন করে ডেটা ফিল্টারিংয়ের কাজে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে ও তথ্যে কোনো বৈষম্য আছে কিনা তা নিয়মিত ‘জেন্ডার অডিট’ এর মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।
২. প্রযুক্তি খাতে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো: STEM (Science, Technology, Engineering, and Mathematics) শিক্ষায় মেয়েদের বেশী মাত্রায় উৎসাহিত করতে হবে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই নারীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত (STEM) শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, যাতে এআই ডেভেলপার ও নীতিনির্ধারক হিসেবে নারীর সংখ্যা বাড়ে এবং এআই তৈরী ও নীতিনির্ধারণী টেবিলে পর্যাপ্ত নারী গবেষক ও প্রকৌশলী থাকে।
৩. আইনী ও নৈতিক (Ethical AI) ফ্রেমওয়ার্ক: ডিপফেক বা সম্মত্যতিহীন অনলাইন কনটেন্ট তৈরীর বিরুদ্ধে কঠোর আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন করতে হবে। এআই কোম্পানিগুলোর জন্যে তাদের অ্যালগরিদমের নৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এআই নীতিমালায় জেন্ডার ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (Gender Impact Assessment) বাধ্যতামূলক করা উচিত। কোনো অ্যালগরিদম নিয়োগ বা ঋণের ক্ষেত্রে নারীরা বৈষম্যরেখে স্বীকার হচ্ছে কিনা তা নিরীক্ষা করার জন্যে স্বাধীন থার্ড-পার্টি অডিট ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৪. উপযুক্ত প্রশিক্ষণ : অটোমেটেড সিস্টেম ব্যবহারের ফলে বহু নারী চাকরি হারাচ্ছেন। কাজেই এআই ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে তাঁদের জায়গা নেওয়ার মতো উপযুক্ত প্রশিক্ষণ বা সুযোগ তৈরী করতে হবে।
এআই হলো এক বিশাল সম্ভাবনার নাম, যা মানবসমাজকে অনেক দূরে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তবে সমাজের অর্ধেক অংশকে বাদ দিয়ে প্রযুক্তি চলতে পারে না। এআই-কে প্রকৃত অর্থেই কল্যাণকর করতে হলে একে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে গড়ে তুলতে হবে। তবেই একটি বৈষম্যহীন, সমতাভিত্তিক ও সুরক্ষিত ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এআই যদি সমাজের পুরোনো লিঙ্গবৈষম্যকেই বাঁচিয়ে রাখে, তবে তা প্রযুক্তির অগ্রগতির বদলে মানবিকতার পশ্চাদপসরণ ঘটাবে আর সমাজের পুরোনো লিঙ্গবৈষম্যকে নতুন ও আধুনিক রূপ দান করবে॥
লেখক Dr Zaki Rezwana Anwar FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD একজন চিকিৎসক, জনপ্রিয় সিনিয়র সংবাদ পাঠক, কলামিষ্ট ও আন্তর্জাতিক স্পীকার।





