লন্ডনে কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬

লন্ডন, ০৫ অক্টোবর:
ব্রিটেনের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম সুগন্ধি অধ্যায়ের নাম ‘কারি’। দক্ষিণ এশীয় রান্নার সেই ঐতিহ্য আজ কেবল একটি খাবারের নাম নয়; এটি ব্রিটিশ অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও অভিবাসী উদ্যোক্তাদের সাফল্যের এক অনন্য প্রতীক। সেই সাফল্য, শ্রম, সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা-স্পৃহাকে সম্মান জানাতেই লন্ডনে অনুষ্ঠিত হলো ১৭তম কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬।
রোববার (৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় লন্ডনের অভিজাত ম্যাফেয়ার এলাকার পাঁচ তারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত আয়োজনটি ছিলো বরাবরের মতই অভিজাত, ঝাঁকালো ও উৎসবমূখর। ছিলো যুক্তরাজ্যের রেস্টুরেন্ট খাতের সফল উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ব্রিটিশ মূলধারার রাজনীতিক, মন্ত্রী, এমপি, লর্ড সভার সদস্যসহ বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আনন্দঘন উপস্থিতিতে মূখরিত। উদ্দেশ্য একটাই- যুক্তরাজ্যের বিশাল রেস্তোরাঁ খাতে বাংলাদেশিদের সাফল্যকে তুলে ধরা, উদযাপন করা এবং অনুপ্রেরণা দেয়া। বিবিসি’র জনপ্রিয় উপস্থাপক ও সাংবাদিক জন কে (Jon Kay) এবং লাক্সমি গোপাল (Luxmy Gopal)–এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত বর্ণাঢ্য এই আয়োজনে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাঁচ শতাধিক অতিথি অংশ নেন।
এবার মোট ৪১টি পুরস্কার প্রদান করা হয় চারটি প্রধান বিভাগে— সেরা রেস্তোরাঁ, সেরা শেফ, সম্পাদকীয় বিশেষ সম্মাননা (Editor’s Choice) এবং সেরা টেকঅ্যাওয়ে। হাজারো গ্রাহক তাঁদের প্রিয় রেস্তোরাঁ, টেকঅ্যাওয়ে ও শেফের পক্ষে ভোট দেন। এরপর বিচারকদের কঠোর মূল্যায়নের মধ্যদিয়ে চূড়ান্ত সংক্ষিপ্ত তালিকা ও বিজয়ীদের নির্বাচন করা হয়।
এ বছরের সম্মাননার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে ব্রাইটন থেকে বোল্টন, টনটন থেকে টিসসাইড—অর্থাৎ যুক্তরাজ্যের নানা শহরের সেরা কারি রেস্তোরাঁ ও শেফরা।
যুক্তরাজ্যের কারি শিল্পের অন্যতম কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করছে ‘কারি লাইফ ম্যাগাজিন’। এটি কারি লাইফ মিডিয়া গ্রুপের একটি প্রকাশনা। ১৭ বছর ধরে এই এওয়ার্ড অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ব্রিটেনের কারি শিল্পে অসামান্য অবদান রাখা পেশাজীবী, শেফ, রেস্তোরাঁ মালিক ও ব্যবসায়িক নেতাদের সম্মান জানিয়ে আসছে।
গত এক দশকেরও বেশি সময়ে কারি লাইফ এওয়ার্ডস ব্রিটিশ কারি শিল্পের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতিতে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সেরা রেস্তোরাঁগুলো এই পুরস্কারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য এটি হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার মঞ্চ।

ব্যয় বৃদ্ধি ও দক্ষ জনবলের সংকটের শঙ্কা
‘কারি লাইফ’ ম্যাগাজিনের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ নাহাস পাশা সূচনা বক্তব্যে বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬–এর বিজয়ীদের অভিনন্দন। এ বছর আমাদের পুরস্কারের ১৭তম আয়োজন—কারি শিল্পে উৎকর্ষ উদ্যাপন এবং এই খাতের কঠোর পরিশ্রম, স্থিতিশীলতা ও সৃজনশীলতাকে তুলে ধরার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের একটি প্রমাণ।”
তিনি আরও বলেন, “দেশজুড়ে রেস্তোরাঁগুলো মজুরি থেকে শুরু করে উপকরণের দাম—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বৃদ্ধির মুখোমুখি হচ্ছে। পাশাপাশি অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের কারণে দক্ষ কর্মীর সংকটেরও বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই পুরস্কারগুলো দেখিয়ে দেয় কেন এই শিল্পের আরও উল্লেখযোগ্য সহায়তা প্রয়োজন, যাতে এটি যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান অব্যাহত রাখতে পারে।”

‘কারি শিল্প ব্রিটেনের অনুপ্রেরণার গল্প’
অনুষ্ঠানে কারি লাইফ ম্যাগাজিনের সম্পাদক সৈয়দ বেলাল আহমেদ বলেন, “যুক্তরাজ্যের কারি শিল্পে দেশের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যবসায়ী ও রেস্তোরাঁ উদ্যোক্তাদের অনেকেই কাজ করছেন। আমরা আনন্দিত যে তাঁদের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত সাফল্যকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার একটি প্ল্যাটফর্ম দিতে পারছি, যাতে তাঁরা আরও এগিয়ে যেতে পারেন। ব্রিটিশ কারি শিল্প আবারও নিজেদের গৌরবময় অবস্থান প্রমাণ করেছে।”
‘ব্রিটেনের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লর্ড করণ বিলিমোরিয়া সিবিই, সাবেক সিবিআই সভাপতি, কোবরা বিয়ার–এর প্রতিষ্ঠাতা এবং কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডসের দীর্ঘদিনের সমর্থক।
তিনি বলেন, “কারি শিল্প ব্রিটেনের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রন্ধনশৈলীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের জীবিকা সমর্থন করে এবং অসাধারণ খাবারের প্রতি মানুষের ভালোবাসার মাধ্যমে সবাইকে একত্রিত করে।”
তিনি আরও বলেন, “কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডস সেই সব রেস্তোরাঁ উদ্যোক্তা, শেফ এবং দলের অসাধারণ প্রতিভা, নিষ্ঠা ও উদ্যোক্তা-স্পৃহাকে স্বীকৃতি দেয়, যাঁদের কঠোর পরিশ্রম এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।”
লর্ড বিলিমোরিয়ার ভাষায়, “তাঁদের অর্জনকে উদ্যাপন করা এবং নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে এই পুরস্কার ব্রিটেনের কারি শিল্পের শক্তিশালী ও উচ্চাভিলাষী ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সহায়তা করছে—যা তার গর্বিত ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের সুযোগকে গ্রহণ করবে।”

সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্রেন্ট ইস্ট আসনের এমপি ডন বাটলার। এছাড়া যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন আসনের একাধিক সংসদ সদস্য অংশ নেন এবং নিজ নিজ এলাকার পুরস্কারপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁগুলোর প্রতি সমর্থন জানান।
উপস্থিত ছিলেন ওয়েমাউথের এমপি লয়েড হ্যাটন, টনটনের এমপি গিডিওন অ্যামোস ওবিই, লেস্টারের এমপি শওকত আদম এবং রুশনারা আলী এমপি। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, পুরস্কারপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁগুলো শুধু ব্যবসা নয়, স্থানীয় কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং বৃহত্তর কারি শিল্পের অবদান ব্রিটেনজুড়ে উল্লেখযোগ্য।
চার বিলিয়ন পাউন্ডের শিল্পের উৎসব
ব্রিটেনের কারি শিল্পের বাজারমূল্য প্রায় ৪ বিলিয়ন পাউন্ড। হাজার হাজার রেস্তোরাঁ, টেকঅ্যাওয়ে ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার মাধ্যমে এই শিল্প লাখো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তাদের অবদান এই শিল্পে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাঁরা ব্রিটিশ কারি সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডস সেই ঐতিহ্যেরই এক বার্ষিক উদ্যাপন—যেখানে রান্নাঘরের নীরব শ্রম, অভিবাসী জীবনের সংগ্রাম এবং উদ্যোক্তার সাফল্য একই মঞ্চে সম্মানিত হয়।
আয়োজক ও পৃষ্ঠপোষক
কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬ আয়োজন করেছে কারি লাইফ মিডিয়া গ্রুপ। এবারের আয়োজনের পৃষ্ঠপোষক ছিল কোবরা বিয়ার, ওয়ার্ক পারমিট ক্লাউড, মিলগো (Mealgo) এবং হিলসাইড ট্রাভেলস।
কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬: পুরস্কৃত রেস্তোরাঁ ও শেফ
এবারের কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬–এ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের রেস্তোরাঁ, টেকঅ্যাওয়ে ও শেফরা সম্মাননা পেয়েছেন। Editor’s Choice of the Year, Best Restaurant of the Year, Best Chef of the Year এবং Best Takeaway of the Year—এই চার বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হয়।

এডিটর’স চয়েস অব দ্য ইয়ার- ২০২৬
সারে প্যালেস- ইওয়েল, সারে
লালা’স রেস্টুরেন্ট- লিডস/ব্র্যাডফোর্ড, ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ার
মনসুন ম্যাজেস্টিক ইন্ডিয়ান ডাইনিং- নিউক্যাসল-আন্ডার-লাইম, নিউক্যাসল
রিভারসাইড স্পাইস -কোললচেস্টার, এসেক্স
ডাউনহ্যাম তান্দুরি – ডাউনহ্যাম মার্কেট, নরফোক
চেন্নাই ইন্ডিয়ান কুইজিন – লিক, স্ট্যাফোর্ডশায়ার
সেলিব্রিটিজ ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট- কার্ডিফ
দ্য এবারডেইল পাব অ্যান্ড গ্রিল- উইগস্টন, লেস্টার
আমনি চেস্টার- চেস্টার
আই-নাগা রেস্টুরেন্ট- ওয়েস্ট উইকহ্যাম
বেস্ট রেস্টুরেন্ট অব দ্য ইয়ার-২০২৬
দিলরাজ রেস্টুরেন্ট- ব্রিজনর্থ, শ্রপশায়ার
রয়্যাল মাসালা- কিংসউইনফোর্ড, ডাডলি
দ্য বোম্বে সোয়ানলি- সোয়ানলি, কেন্ট
ইভসহাম বালতি- উর্সেস্টারশায়ার
দ্য ভাইসরয়- নিউহ্যাভেন, ইস্ট সাসেক্স
জালাপারি অব উডলি- উডলি, রিডিং
চৌরঙ্গী ইন্ডিয়ান কুইজিন- প্যাচাম, ব্রাইটন
কিংস লিন তান্দুরি- কিংস লিন, নরফোক
কাভালি- স্টোন, স্ট্যাফোর্ডশায়ার
লাসানি সাউথওয়েল- সাউথওয়েল, নটিংহ্যামশায়ার
চিলি’স রেসু্টরেন্ট- ওয়েমাউথ, ডরসেট
স্পাইস হেভেন – হুইচার্চ, শ্রপশায়ার
সীটন তান্দুরি- সীটন কেয়ারু, হার্টলপুল
ডা মাউন্ট গুর্খা – ওয়াটারলু, লিভারপুল
মালিহা অ্যান্ড তাজ বাঙালি অ্যান্ড ইন্ডিয়ান রেস্টেুরেন্ট- টনটন, সমারসেট
স্পাইস ভিলেজ- নিউ অ্যাশ গ্রিন, কেন্ট
আরিয়া ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট – ওয়াটফোর্ড, হার্টফোর্ডশায়ার
মনসুন রেস্টুরেন্ট – হলিউড, বার্মিংহাম
স্পাইস মাস্টার- টাইলহার্স্ট, রিডিং
বেস্ট শেফ অব দ্য ইয়ার- ২০২৬
শেফ গয়াস উল্লাহ- কুইন্স হেড রেস্টুরেন্ট,ব্রেটফোর্ড, রাগবি
শেফ আবদুল মালিক- সাফরন, লিক, স্ট্যাফোর্ডশায়ার
শেফ শামসুল মিয়া- সিনামন লাউঞ্জ, হরবেরি, ওয়েকফিল্ড
শেফ মোশাহিদ আলী (রাজ) – নাজ ইন্ডিয়ান কুইজিন, হেস্কেথ ব্যাংক, প্রেস্টন
শেফ সৈয়দ উসমানি – ইন্ডিয়ান কুইন টেকঅ্যাওয়ে, রাগবি, স্ট্যাফোর্ডশায়ার
শেফ আবদুল মিয়া- প্রিন্স অব ইন্ডিয়া, ফাভারশাম, কেন্ট
শেফ সামির দেশাই লেস্টার- দ্য ব্রডওয়ে বার অ্যান্ড গ্রিল, লেস্টার
বেস্ট টেকঅ্যাওয়ে অব দ্য ইয়ার- ২০২৬
তাজ মহল নাইট- চেমসফোর্ড, এসেক্স
ক্লে ওভেন টেকঅ্যাওয়ে- সাউথ ড্যাগেনহ্যাম, এসেক্স
হেনলো তান্দুরি – হেনলো, বেডফোর্ডশায়ার
লিটল ইন্ডিয়া- বোল্টন, গ্রেটার ম্যানচেস্টার
বে-লিফ টেকঅ্যাওয়ে- হুইটস্টোন, লন্ডন





