ভারতে মুসলিম নারীদের নিলামে ‘বিক্রি’র অ্যাপ!
পোস্ট ডেস্ক :

ভারতে মুসলিম নারীদের অনলাইনে নিলামে ‘বিক্রি’ করে দেয়ার বিজ্ঞাপন দিয়ে তাদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের অজ্ঞাতে এ কর্মকা-ে মানসিকভাবেও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত এসব নারী। তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ক্ষোভ। এর মধ্যে রয়েছেন নারী পাইলট হেনা মোহসিন খান, নাবিয়া খান, লেখক, অধিকারকর্মী, সাংবাদিক সহ অনেক নারী। ঘটনাটি দু’মাস আগের হলেও এখন পর্যন্ত অনলাইনে এসব নারীকে বিক্রি করে দেয়ার অ্যাপ ‘সুলি ডিলস’ সৃষ্টিকারী কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি। নির্যাতিত নারীরা বলছেন, এ ঘটনায় কোনো পদক্ষেপ নেয়ার অভাবে এটাই জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে যে, ভারতে মুসলিম নারীরা কতটা বৈষম্যের শিকার। মুসলিম নারীদের নিলামে বিক্রি করে দেয়ার এই অ্যাপ এবং সংশ্লিষ্ট নারীদের নিয়ে এর আগে অনলাইন সিএনএনের দেয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন । ৬ই সেপ্টেম্বর একই বিষয়ে সিএনএন ফলোআপ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।
তাতে বলা হয়েছে, হেনা মোহসিন খান ৩২ বছর বয়সী একজন পাইলট এবং গর্বিত নারীবাদী।
সাংবাদিক, লেখিকা, প্রভাবশালী এমন কমপক্ষে ৮০ জন মুসলিম নারীকে নিলামে বিক্রি করে দেয়ার জন্য ‘সুলি ডিলস’ নামের একটি অ্যাপে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। মুসলিম নারীদের অবমাননা করতে সুলি ডিলস শব্দটি ব্যবহার করে থাকে উগ্র ডানপন্থি হিন্দু পুরুষরা। এই অ্যাপের ব্যবহারকারীদেরকে পণ্যের মতো নিলামে এসব নারীকে ‘কেনা’র প্রস্তাব দেয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে এর মাধ্যমে তাদেরকে ভীত, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়া হতো। তাদেরকে যৌন নিগ্রহের শিকারে পরিণত করা হতো।
দু’মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্লাটফরম ‘গিটহাব’ ওই সাইটটি নামিয়ে ফেলে। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নারীরা। তারা বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে, তারা নীরব হয়ে যাবেন। ঘটনার শিকার নারী, বিরোধী আইনপ্রণেতা এবং অধিকারকর্মীরা ভারতের পুলিশের কাছে এ বিষয়ে কমপক্ষে চারটি অভিযোগ দাখিল করেছেন। তার মধ্যে হেনা মোহসিন খান অন্যতম। দিল্লি পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তা প্রবীণ দুজ্ঞাল নিশ্চিত করেছেন যে, সাইবার সেলের একটি ইউনিট এ অভিযোগ তদন্ত করছে। তবে বিষয়টি ‘সিলড’। তাই তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে অস্বীকৃতি জানান।
সাইবার ক্রাইমের বিরুদ্ধে আইন আছে ভারতে। কিন্তু সাইবার বুলিং বা অনলাইনে কাউকে অবমাননা করার বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো বিধান বা আইন নেই। অথচ ভারতে দেদারছে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এ মাধ্যমে। হেনা মোহসিন খান ও অন্য নারীবাদী আন্দোলনকারীরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তিরা তাদেরকে টার্গেট করছে। এসব মানুষ তাদেরকে ভয় দেখাচ্ছে। কিন্তু তাদেরকে বিরত রাখতে যথেষ্ট করছে না ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। তারা মনে করেন, ধর্মীয় কারণে তাদেরকে এভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া নারীরা লিঙ্গগত দিক দিয়ে শক্তিশালী অধিকার চায় এ কারণেও তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হতে পারে।
বৈশ্বিক বেশির ভাগ পরিমাপকে ভারতে লিঙ্গগত সমতা খুব দুর্বল। চার ভাগের মধ্যে এক ভাগেরও কম নারী শ্রমবাজারে রয়েছেন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ২০২১ রিপোর্ট অনুযায়ী একজন পুরুষের পারিশ্রমিকের তুলনায় একজন নারী শতকরা মাত্র ২০ ভাগ উপার্জন করেন। এই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ভারতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনও একটি সমস্যা রয়ে গেছে। পুরো জীবনে প্রতি চার জনের মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী নির্যাতিত হন না হয় তার পার্টনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন। সেখানে ‘সুলি ডিলস’ অ্যাপ ব্যবহার করে সরাসরি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা করা হয়নি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে তাদের ছবি কপি করে নিয়ে এতে ব্যবহার করা হয়েছে এবং অন্যদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এসব নারীকে অবমাননা করতে। হেনা মোহসিন খানের ১৫ হাজার অনুসারী আছেন টুইটারে। নিয়মিত সেখানে তিনি ঘৃণাপ্রসূত মন্তব্য পান। প্রথমত তা আসে পুরুষদের পক্ষ থেকে। হেনা বলেন, ওই অ্যাপে তার ছবি প্রকাশ হওয়ার পর এসব মন্তব্য বৃদ্ধি পেয়েছে। মুখোরা মুসলিম নারীরা সবচেয়ে বড় হুমকিতে।
সরকারের ২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী, ভারতে মোট নারীর সংখ্যা প্রায় ৫৮ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ৬.৫ ভাগই মুসলিম। এর মধ্যে প্রথম সারির এসব নারীর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘নিলামে’ তোলার বিষয়টি ভাইরাল হওয়ার পর ২১ জন নারী হোয়াটসঅ্যাপে যুক্ত হয়েছেন। তারা একে অন্যকে সমর্থন দেয়ার জন্য এই গ্রুপটি সৃষ্টি করেছেন। এর সঙ্গে রয়েছেন কবি নাবিয়া খান। তিনি নিয়মিত টুইটারে পোস্ট দেন। সেখানে ভারতে একপেশে হয়ে পড়া মানুষদের কণ্ঠকে জোরালো করে প্রকাশ করেন তিনি। মনে করেন, এ কারণে তার দিকে দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল ‘সুলি ডিলস’-এর। হেনা মোহসিন খানের কোনো আত্মীয় নন নাবিয়া খান। তিনি বলেন, পুরুষরা মনে করে থাকেন যে, যৌন সহিংসতা একটি বৈধ শাস্তি। নির্যাতিত হওয়ার প্রতিবাদে তিনি পুলিশে অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু এখনও তাদের কাছ থেকে কিছু ফলোআপ পাননি। নাবিয়া খান বলেন, আমি আশা করেছিলাম যে, আমার অভিযোগকে মর্যাদার সঙ্গে দেখা হবে। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি ন্যায়বিচারের পক্ষে এ নিয়ে কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি। এতে আমি ক্ষুব্ধ।
নির্যাতিত নারীরা বলেছেন, অনলাইনে এভাবে নির্যাতন এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতীয় মুসলিমদের প্রতি তাদের মনোভাব। সম্প্রতি ভারতে মুসলিম বিরোধী ঘৃণাপ্রসূত অপরাধের বেশ কিছু রিপোর্ট পাওয়া গেছে। বিজেপি শাসিত বেশ কয়েকটি রাজ্য আইন পাস করেছে। সমালোচকরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে ভারতে রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৯ সালে ভারতের পার্লামেন্ট একটি বিল পাস করেছে। তাতে শুধু মুসলিম বাদে প্রতিবেশী তিনটি দেশ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দেয়ার পথ করে দেয়া হয়েছে। মুসলিম বিরোধিতা পুলিশ বাহিনীতেও বিদ্যমান। প্রায় ১২ হাজার পুলিশ কর্মকর্তার ওপর জরিপ করে এ কথা বলা হয়েছে। ২০১৯ সালে স্ট্যাটাস অব পুলিসিং ইন ইন্ডিয়া রিপোর্টে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নিয়েছিলেন যারা তার মধ্যে প্রায় অর্ধেক পুলিশই মনে করেন, মুসলিমরা স্বভাবগতভাবেই অপরাধপ্রবণ।
সামাজিক অধিকার আন্দোলনকারী এবং ইন্ডিয়ান মুসলিম ওমেন্স মুভমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা জাকিয়া সোমান বলেছেন, অনলাইনে কুসংস্কারও ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে এ ধরণের হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে।




