ইরানের অদৃশ্য নেতৃত্বে কারা?
পোস্ট ডেস্ক :

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক এই সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হলেও কার্যত অদৃশ্যই রয়েছেন তিনি। ফলে চলমান এই যুদ্ধে নিজেদের শক্ত অবস্থানের পেছনে তেহরানের ওপর ঝুলছে একটি সরল প্রশ্ন—সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন আসলে কে?
ইরানের নেতৃত্বকে ‘বিভক্ত’ মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ধারণা, তেহরানের একটি ‘ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব’ আসার জন্য অপেক্ষা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ইরানের নেতারা এই একতার বিষয়টি মাথায় রেখেই হয়তো দেশটির জনগণের মোবাইল ফোনে এক বার্তায় জানিয়েছেন, ‘ইরানে কঠোরপন্থী কিংবা মধ্যপন্থী বলে কিছু নেই—আছে শুধু এক জাতি, এক পথ।’
অদৃশ্য সর্বোচ্চ নেতা
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। কিছু লিখিত বিবৃতি ছাড়া তার সক্রিয় উপস্থিতির প্রমাণ খুবই সীমিত। এমনকি প্রাথমিক হামলায় তিনি আহত হয়েছেন বলেও জানা গেছে।
তবে সব কিছুর পরও তার কার্যকর ‘অদৃশ্য নেতৃত্ব’ নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় শুধু পদ নয়, বরং উপস্থিতি ও বার্তাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার অনুপস্থিতিতে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন আগের তুলনায় কম হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দিশাহীন কূটনীতি
কাগজে-কলমে কূটনীতি সরকারের দায়িত্ব। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। কিন্তু তাদের কৌশলগত ভূমিকা অনেকটাই সীমিত। আরো বড় কথা হচ্ছে, ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ।
এমনকি হরমুজ প্রণালি খোলা না বন্ধ—এ নিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থানও বারবার বদলাতে দেখা গেছে।
যা একটি দেশের নেতৃত্বের স্বাভাবিক কাঠামোকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এর প্রভাবে যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনা আটকে যাওয়া বিষয়টিকে আরো জোরালো করে তুলছে।
সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব বৃদ্ধি
ইরানের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা। কিন্তু কূটনীতিকদের অংশগ্রহণ ছাড়াই এটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
এটি প্রকৃত ক্ষমতা সেই কর্তাদের হাতে তুলে দিয়েছে, যারা মূলত আড়ালে থেকেই কাজ করেন। ফলে আগের সংকটগুলোর মতো এখন আর কোনো একক, শাসনযোগ্য ব্যক্তি নেই—যিনি স্পষ্টভাবে এসব সিদ্ধান্ত বা কৌশলের দাবিদার।
যদিও হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা বা উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার মাধ্যমেই মূলত প্রশাসনিক শাখা পতনের ইঙ্গিত দেয় না। কিন্তু সুস্পষ্ট রাজনৈতিক মধ্যস্থতার অভাবে আইআরজিসির কার্যক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন অন্তত সাময়িকভাবে বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
‘দৃশ্যমান’ গালিবাফের উত্থান
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছেন দেশটির বর্তমানে সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাজনীতিতে আসা দৃশ্যমান এই নেতা এখন আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছেন, জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং কখনো কখনো বাস্তববাদী অবস্থান তুলে ধরছেন।
তবে এত কিছুর পরও তার এই সক্রিয়তা আসলে কতটা অনুমোদিত—তা স্পষ্ট নয়। তিনি দাবি করলেও তার পদক্ষেপ সর্বোচ্চ নেতার ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বা সরাসরি সমন্বয়ের— তারও খুব বেশি প্রমাণ নেই। যে দেশের শাসন ব্যবস্থা শীর্ষ পর্যাযের ওপর নির্ভর করে, সেখানে এই অস্পষ্টতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ধারাবাহিক ঐক্যের দাবি নাকি বাস্তবায়ন
সব মিলিয়ে, ইরানের রাষ্ট্র কাঠামো এখনো ভেঙে পড়েনি। প্রশাসন, কূটনীতি ও সামরিক বাহিনী কাজ করছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশের অভাবে একটি ‘সমন্বয়ের ঘাটতি’ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখনো বিভিন্ন ফ্রন্টে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম। কিন্তু সেই শক্তিকে একটি সুসংহত কৌশলে রূপ দিতে পারছে না। আর ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এই ‘সংকেত বা দিকনির্দেশই’ মূলত স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।
ফলে সামগ্রিকভাবে চাপ বাড়লেও, এখন পর্যন্ত পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রেখে যেকোনো পদক্ষেপ মোকাবেলা করছে তেহরান। কিন্তু দিন দিন এই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে—এই ধারাবাহিকতা আদৌ বাস্তবায়িত হচ্ছে, নাকি কেবল সেই ঐক্যের দাবি করছে?




