আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)
কাবা প্রাঙ্গণে প্রথম যিনি উচ্চৈঃস্বরে কোরআন পাঠ করেন

Published: 28 May 2022, 12:10 PM

।।সাইফুল ইসলাম তাওহিদ।।


আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) প্রথম সারির একজন সাহাবি। ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামীদের একজন। ইসলামে গ্রহণের আগে তিনি মক্কার গিরিপথে উকবা ইবনে আবি মুআইতের ছাগল চরাতেন। সকালে ছাগল নিয়ে বেরিয়ে যেতেন, সন্ধ্যায় ফিরতেন।

অন্যদের মতো তিনিও মক্কায় নতুন নবীর আগমনের খবর শুনেছেন। কিশোর বয়সে তিনি ইসলামের ছায়াতলে আসেন। কুরাইশদের নিপীড়ন সহ্য করে দ্বিনের ওপর অটল থাকেন। নিজেকে পরিশুদ্ধ করেন নববি পাঠশালায়। তিনি একাধারে ফকিহ, মুহাদ্দিস ও কোরআনের কারি। যার সর্ম্পকে রাসুল (সা.) বলেন, কোরআন যেমন সুবজ-সতেজ অবতীর্ণ হয়েছে কেউ যদি তেমনি কোরআন তিলাওয়াত করে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন ইবনে উম্মে আব্দের মতো কোরআন তিলাওয়াত করে। (মুসনাদ আহমদ, হাদিস : ৩৫)

নবীজির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ : প্রতিদিনের মতো ওই দিনও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ছাগল নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। মক্কার গিরিপথে ছাগলের সঙ্গে সময় পার করছেন। একসময় দূর থেকে দুজন প্রৌঢ় ব্যক্তিকে তাঁর দিকে আসতে দেখলেন। তারা খুব ক্লান্ত ও পিপাসার্ত। তারা এসে তাঁকে সালাম দিল। তাদের একজন বলল, হে বালক! তোমার এ ছাগলগুলো থেকে আমাদের একটু দুধ দোহন করে দাও। তখন তিনি বললেন, আমি তা করতে পারব না। কারণ, এ ছাগলগুলো আমার নয়। আমি শুধু এগুলোর প্রহরী।

তারপর তাদের একজন বলল, আমাকে এমন একটি ছাগল দেখিয়ে দাও, যা এখনো দুধ দেয়নি। তিনি একটি ছাগল দেখিয়ে দিলে লোকটি আল্লাহর নাম নিয়ে ছাগলের ওলান মলে দিয়ে সেখান থেকে দুধ দোহন করতে লাগলেন। এবং সে দুধ তারা তিনজনে পান করে পরিতৃপ্ত হলেন। এরপর সেই বরকতময় ব্যক্তিটি ছাগলের ওলানকে সম্বোধন করে বললেন, তুমি সংকুচিত হয়ে যাও। ওলানটি সংকুচিত হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে গেল। এ দৃশ্য দেখে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বিমোহিত হলেন। এক অজনা মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ল তাঁর মাঝে। কারণ, সেই বরকমতয় ব্যক্তিটি ছিলেন রাসুল (সা.) আর তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবু বকর (রা.)। এ ছিল নবীজির সঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের প্রথম সাক্ষাৎ। এ দৃশ্য তাঁর মনে রেখাপাত করল। তিনি নবীজির সান্নিধ্য লাভে নিজেকে ধন্য করতে চাইলেন। (ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৬৫০৪)

এ ঘটনার কিছুদিন পর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন মুসলমানের সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচজন। নিজেকে সঁপে দেন রাসুল (সা.)-এর খিদমতে। তিনি সব সময় রাসুল (সা.)-এর আশপাশে থাকতেন। তিনি ছায়ার মতো রাসুল (সা.)-কে অনুসরণ করতেন।

মক্কায় উচ্চৈঃস্বরে কোরআন তিলাওয়াত

তখন মুসলমানরা সংখ্যায় ছিল নগণ্য। শক্তি-সামর্থ্যে তারা ছিল অতি দুর্বল। একদা কিছু সাহাবা কিরাম সমবেত হয়ে আলোচনা করতে লাগল যে এখনো কুরাইশরা উচ্চৈঃস্বরে এ কোরআনের তিলাওয়াত শুনতে পায়নি। সুতরাং কে আছে যে তাদের এ কোরআন শোনাবে? আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, আমি তাদের কোরআন শোনাব। তাঁর এ কথা শুনে সাহাবায়ে কিরাম বললেন, আমরা তোমার ব্যাপারে আশঙ্কা করছি। আমরা এমন ব্যক্তি তালাশ করছি, মক্কায় যার গোত্র আছে। বিপদে তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করবে এবং তাকে রক্ষা করবে। তখন তিনি বলেন, তোমরা আমাকে সুযোগ দাও। নিশ্চয় আল্লাহ আমাকে সাহায্য করবেন এবং তিনিই আমাকে রক্ষা করবেন।

এরপর তিনি হারাম শরিফে গিয়ে মাকামে ইবরাহিমে দাঁড়িয়ে উচ্চৈঃস্বরে সুরা আর-রহমান পড়া শুরু করলেন। এ সময় কুরাইশরা কাবার পাশে বসা ছিল। তারা ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর দিকে ছুটে গেল এবং তাঁকে মারধর করতে লাগল। তিনি তখনো কোরআন পাঠ করেই চলছেন। এক পর্যায়ে তিনি রক্তাক্ত হয়ে পড়লে কুরাইশরা তাঁকে ছেড়ে দেয়। তাঁর এ অবস্থা দেখে সাহাবায়ে কিরাম বলেন, আমরা তোমার ব্যাপারে এ ভয়ই করেছিলাম। তখন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বললেন, আল্লাহর কসম! আল্লাহর শত্রুরা আমার কাছে এখনের চেয়ে তুচ্ছ আর ছিল না। তোমরা চাইলে আগামীকাল সকালে আমি তাদের কাছে আবার যাব—কোরআন তিলাওয়াত করার জন্য। তখন সাহাবারা বললেন, না আর যেয়ো না। যথেষ্ট হয়েছে। (তবাকাতু ইবনে সাদ : ৩/১১৩)

(তবাকাতু ইবনে সাদ, সিয়ারু আলামিন নুবালা, সুওয়ারুম মিন হাতিস সাহাবার অবলম্বনে। )