হাকালুকির পানিতে ভাসছে কৃষকের স্বপ্ন
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) :

টানা বেশ কয়েক দিনের কালবৈশাখীর ঝড়, বজ্রপাত, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নিমজ্জিত এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি পাড়ে বোরো ধান সংগ্রহে প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা। পানির নিচ থেকে তুলে আনা ধান ডেরায় রেখে পচন ধরতে শুরু করেছে। অনেক কৃষক ধানের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। হাওর তীরের ভূকশিমইল, জয়চন্ডী, কাদিপুর, বরমচাল, ভাটেরা ও ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের প্রায় অর্ধ শতাধিক গ্রামে প্রায় তিন হাজার কৃষকের বোরো ধানের জমি অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া যায় এসব হতাশার চিত্র। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন।
সরেজমিনে গিয়ে হাকালুকি হাওরের দক্ষিণ তীরের কুলাউড়া উপজেলা অংশের ভূকশিমইল, জয়চন্ডী, কাদিপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গেলে কৃষকদের প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবেলা করে ধান কাটতে দেখা যায়। নৌকা ও কলা গাছের ভেলা দিয়ে অনেক কৃষক ধান কাটছেন এবং বহন করে স্তুপ করে রাখছেন পাশ্ববর্তী সড়কে।
অনেক কৃষকের ধান স্তুপ করা থাকাবস্থায় খড়ে পচন ধরে নতুন অঙ্কুরোদগম হয়। মাড়াই দিতে রোদের আশায় অপেক্ষায় রয়েছেন কৃষকরা।
জয়চী ইউনিয়নের মীরশংকর গ্রামের মান্নান মিয়া, রইছ আলী, লতিফ মিয়া ও আব্দুল করিম, কাদিপুর ইউনিয়নের মতু মিয়া, জেবুল মিয়াসহ বেশ কয়েকজন কৃষক জানান, এক সপ্তাহ আগে কাটা ধান স্তুপ করে রাখা হয়েছে। মেশিন ছাড়া মাড়াইয়ের কোন সুযোগ নেই।
এমন সময় ধান পানিতে তলিয়ে গেলো যখন মেশিন দিয়ে ধান কাটার সুযোগ ছিলো না। কিন্তু এখন শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। তার আগেই পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তাদের মতে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধানের আশা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। এবার জ্বালানি তেল সংকটে সময়মত হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হয়নি।
যার কারণে ধানের মূল্য থেকে শ্রমিকের মজুরী বেশি। হাওর থেকে এক বিঘা ধান কেটে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে ছয় থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়। তারমধ্যে খোলা বাজারে বর্তমানে বোরো ধান প্রতিমণ ৯০০-১০০০ টাকা বিক্রি হলেও ধান সংগ্রহে একেক জন শ্রমিকের মজুরী পড়েছে হাজার টাকার উপরে। শুধু মীরশংকর ও কাদিপুর নয় হাওর তীরের
সাদিপুর, কোরবানপুর, মহেষগোরী, মদনগৌরি, মীরশংকর, জাবদা, মুক্তাজিপুর, বড়দল, কাড়েরা, গৌড়করণ, বাদে ভূকশিমইল, মিঠুপুর, দূর্গাপুর, ঘাটের বাজার, ভৈরব বাজার, গৌরিশংকর, কাদিপুর, গুপ্তগ্রাম, ছকাপন, ভাগমতপুর, মৈন্তাম, আলীনগর, পূর্ব সিঙ্গুর, রাউৎগাঁও, সিংহনাথ, হোসেনপুর, বেড়কুরি, নওয়াগাঁও, বড়গাঁও, শাহমির, খামাউরা, হরিপুর, শ্রীপুর, জালালাবাদ, দাউদপুর, শেরপুরসহ সবক’টি গ্রাম ঘুরে কৃষকের সাথে কথা বলে পাওয়া যায় হতাশার চিত্র। সবার একই কথা, বছরে এক চাষ বোরো ধান। এই বোরো ধান সারা বছরের খাবার। এবার মনে হয় না খেয়ে থাকতে হবে। প্রতিবছর পরিবারের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে সরকারি মূল্যে বিক্রি করি। কিন্তু জমিতে এবার আধাপাকা থাকাবস্থায় পানিতে ধানের ক্ষতি হয়েছে। কৃষকদের দাবি, আগাম বন্যায় বোরো ধান রক্ষায় যেন কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাহলে হাওর পাড়ের লাখ লাখ মানুষ আর বোরো ধান নিয়ে দু:শ্চিন্তায় পড়বে না।
কুলাউড়া উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, এবার উপজেলায় ৮ হাজার ৭শত ২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এরমধ্যে হাওর এলাকায় ৪ হাজার ৮ শত ০৫ হেক্টর। অতিবৃষ্টি ও ঢলে ৩৮০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এতে প্রায় তিন হাজার কৃষক প্রাথমিকভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছেন।হাওর তীরের ভূকশিমইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, হাওর তীরসহ তার ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলে অর্ধেকের বেশি বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে।
উপজেলা কৃষি অফিসার মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, এখন পর্যন্ত হাকালুকি হাওর এলাকায় প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ বোরো ধান কাটতে সক্ষম হয়েছেন। আর গ্রামাঞ্চলে ৬৫ ভাগ ধান কাটতে সক্ষম হয়েছেন কৃষকরা। বৈরী আবহাওয়া, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। অনেক কৃষকের আধাপাকা ধান এখনো পানির নিচে নিমজ্জিত রয়েছে। এগুলো দ্রুত সংগ্রহ করতে কৃষি বিভাগসহ প্রশাসন তদারকিতে রয়েছে। তিনি আরো বলেন, সরকারিভাবে কুলাউড়ায় রবিবার থেকে সরকারি মূল্যে বোরো সংগ্রহ শুরু হয়েছে। এবারের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৩৫ টন। প্রতিজন কৃষক ৩ সর্বোচ্চ তিন টন ধান বিক্রি করতে পারবে ১৪৪০ টাকা মূল্যে।




