ফার্স্ট-পাষ্ট-দ‍্যা-পোষ্ট কেন মরণফাঁদ 

Published: 10 May 2026

Dr Zaki Rezwana Anwar FRSA

২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টির বিশাল জয়ের পরেও একটি মৌলিক প্রশ্ন ঝুলে রয়েছিল – আমরা কি আমাদের রাজনীতিতে বহুদিনের কনজারভেটিভ বনাম লেবার পার্টির আধিপত্যের শেষের শুরু দেখতে পাচ্ছি? ২০২৬ এ ইংল‍্যান্ডে স্থানীয় নির্বাচন ও স্কটল‍্যান্ডে স্কটিশ পার্লামেন্টরী ও ওয়েলসে সেনেড (Senedd) নির্বাচনের পর এ প্রশ্ন যেন আরো জোরালো হয়ে উঠেছে।

১৯৪৫ সালের পর থেকে ব্রিটিশ রাজনীতিতে কনজারভেটিভ এবং লেবার পার্টির যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, তা এখন সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। অবশ্য কেউ বলতেই পারেন যে, প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের প্রতি হুমকি কি এর আগে কখনো  আসেনি? এসেছিল। ১৯৮১ সালে লিবারেল পার্টি ও এসডিপি (Social Democratic Party) মিলে ‘অ্যালায়েন্স’ বা জোট গঠন করেছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল লেবার ও কনজারভেটিভ – এই দুই দলের আধিপত্য ভেঙে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। সেই অ্যালায়েন্স নিজেদেরকে রাজনীতির ‘মধ্যপন্থী’ (Center Ground) হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল: তৎকালীন কনজারভেটিভ পার্টি (মার্গারেট থ্যাচারের অধীনে) অনেক বেশি ডানপন্থী হয়ে গিয়েছিল, অন‍্যদিকে লেবার পার্টি (মাইকেল ফুটের অধীনে) অনেক বেশি বামপন্থী হয়ে গিয়েছিল। অ্যালায়েন্স এই দুই চরমপন্থার মাঝামাঝি একটি বিকল্প সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেছিল।

এই জোটের সবচাইতে স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল ১৯৮৩ সালের নির্বাচন যেটিতে তারা অভাবনীয় সাফল্য পায়। তারা মোট ভোটের প্রায় ২৫.৪% পায়। মজার ব্যাপার হলো, লেবার পার্টি পেয়েছিল ২৭.৬% ভোট। অর্থাৎ, জনপ্রিয়তার দিক থেকে তারা লেবার পার্টির প্রায় ঘাড়ের কাছে চলে এসেছিল। কিন্তু ব্রিটেনের ‘ফার্স্ট পাস দ্য পোস্ট’ (First-past-the-post) নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে বিপুল ভোট পাওয়া সত্ত্বেও তারা মাত্র ২৩টি আসনে জিতেছিল, যেখানে লেবার পার্টি পেয়েছিল ২০৯টি আসন।

এই উদাহরণ আজ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে। ৮০-র দশকে চ্যালেঞ্জটা ছিল শুধু একদিক থেকে (অর্থাৎ Centre বা মধ‍্যপন্থীদের থেকে), কিন্তু বর্তমানে লেবার ও কনজারভেটিভরা একসাথে দুই দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। Right wing থেকে: রিফর্ম ইউকে (Reform UK) কনজারভেটিভদের ভোট কাটছে আর Left wing থেকে: গ্রিন পার্টি (Green Party) লেবারদের ভোট কাটছে। লেবার পার্টির সমস্যা হলো, একদিকে গ্রিন পার্টি তাদের ভোট শেয়ার (Vote Share) কমিয়ে দিচ্ছে, যার ফলে  লেবারকে জাতীয়ভাবে দুর্বল দেখাচ্ছে আর অন্যদিকে রিফর্ম ইউকে-র ভোটগুলো ভৌগোলিকভাবে এমনভাবে বিন্যস্ত যে তারা সরাসরি লেবারদের আসনগুলো (Seats) ছিনিয়ে নিতে পারছে।

তবে আমরা যে এখন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বে বাস করছি এবং বর্তমান পরিস্থিতি কেন আগের চাইতে আলাদা ও বেশী চ্যালেঞ্জিং, তার পেছনে আরো গুণগত দু’টো কারণ রয়েছে ব’লে আমি মনে করি।

প্রথম কারণ হচ্ছে: ২০২৪ সালের নির্বাচনটি ব্রিটিশ নির্বাচনী ইতিহাসে প্রথম এমন একটি নির্বাচন ছিল যেখানে পাঁচটি রাজনৈতিক দল প্রায় সব জায়গাতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা যা ছিল আজকের দ্বিদলীয় রাজনীতির একটি early manifestation.

দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে: একটা সময় ছিল যখন শ্রমজীবী মানুষেরা ভোট করত লেবার দলকে এবং মধ‍্যবিত্তরা ভোট দিত কনজারভেটিভ দলকে। অর্থাৎ ফ‍্যাক্টরটি ছিল একটি অর্থনৈতিক ইস্যু, কিন্তু এ যুগে নানান culture war এসে যুক্ত হয়েছে: যেমন কেউ মনে করছেন একটি দল পরিবেশ বান্ধব নয়; কেউ কেউ অতিমাত্রায় জাতিয়তাবাদী যারা রক্ষণশীল‍ মূল‍্যবোধকে আগলে রাখতে পছন্দ করেন; অনেকের কাছে আবার অভিবাসন নীতি একটি বড় বিষয়; অন্যদিকে কেউ আবার মাল্টিকালচারালিজম, সমকামিতা ইত্যাদি নানা বিষয়ে বেশ লিবারেল। কাজেই আজকের দিনে ভোটদানের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ছাড়াও নানা ফ‍্যাক্টর এসে যুক্ত হয়েছে।

গত এক বছরেরও বেশী সময় ধরে জনমত জরিপে দেখা গেছে, সব চাইতে জনপ্রিয় দল রিফর্মের প্রতি জনসমর্থন ২৬% ও সব চাইতে কম জনপ্রিয় দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটের জনসমর্থন ১৬% এবং প্রধান দুটি দল লেবার ও কনজারভেটিভ (যাদের সম্মিলিত সমর্থন এখন ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে) সহ গ্রীন পার্টি ২৬ ও ১৬ এর মধ‍্যে অবস্হান করছে। অর্থাৎ ৫টি রাজনৈতিক দল ২% বা ১% এর ব‍্যবধানে একেবারে একে অপরের সাথে গা ঘেঁষে অবস্থান করছে। আগে জনগণ যেখানে মূলত দু’ভাগে বিভক্ত ছিল তাঁরা এখন পাঁচ (কোথাও কোথাও পাঁচের বেশী) ভাগে বিভক্ত। তাই আমরা দেখতে পারছি, বর্তমানে ব্রিটিশ রাজনীতি দ্বিদলীয় শাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো একটি বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে ধাবিত হচ্ছে। সহজ কথায়, রাজনীতির এই খণ্ডিতকরণ (Fragmentation) পুরোনো বড় দলগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যকে এই নির্বাচনী ব্যবস্থার সাহায্যেই ধসিয়ে দিচ্ছে। কাজেই এই সিস্টেম এখন আর বড় দলগুলোর জন্য ‘insulation’ বা সুরক্ষা হিসেবে কাজ করছে না।

ভোটের গভীর বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদের ভোটের ভৌগোলিক বিন্যাসের (Geographical Distribution) দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।’ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ নির্বাচনী ব্যবস্থায় কেবল মোট ভোটের শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সেই ভোটগুলো কোথায় এবং কীভাবে কেন্দ্রীভূত তা-ই আসল। ‘Fisrt-past-the-post’ নির্বাচনী ব্যবস্থা তখনই একটি দলের জন্য সবচাইতে ভালো কাজ করে, যখন সেই দলের ভোটগুলো পুরো দেশে সমানভাবে ছড়িয়ে না থেকে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় concentrated থাকে। সাধারণত এই ব্যবস্থায় সেই দলগুলোই বেশি আসন পায় যাদের ভোট নির্দিষ্ট এলাকায় অনেক বেশি (যেমন স্কটল‍্যান্ডে এসএনপি)। যদি এমন হয় যে একটি দলের ভোট পুরো দেশে সমানভাবে ১০% বা ১৫% করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, তবে তারা হয়তো অনেক ভোট পাবে কিন্তু একটিও আসন জিততে পারবে না (কারণ কোনো একটি নির্দিষ্ট আসনে তারা প্রথম হতে পারবে না)।

‘ফার্স্ট-পাস-দ্য-পোস্ট’ সিস্টেমে জেতার মূল কৌশল হলো নিজের শক্ত ঘাঁটিতে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হওয়া। কিন্তু এবার আমরা দেখতে পেলাম, কনজারভেটিভ এবং লেবার উভয় দলই এখন তাদের শক্তিশালী এলাকাগুলোতে (Strongholds) সবচাইতে বেশি ভোট হারিয়েছে। লন্ডনের বাইরে লেবার পার্টির সান্ডারান্ড, গেটসহেড, বার্নলির মত জায়গা যেগুলোকে লেবারের দূর্গ বা Red Wall বলা হত সেসব জায়গায় লেবার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এবার কিছু জায়গায় ‘রিফর্ম’ দলের ভোট এতোটাই বেশি ছিল যে তারা প্রথম স্থানে চলে এসেছে।  যখন একটি নতুন দল (যেমন রিফর্ম) কোনো এলাকায় প্রথম হতে শুরু করে, তখন এই ‘ফার্স্ট পাস দ্য পোস্ট’ সিস্টেম আর পুরনো বড় দলগুলোকে (লেবার বা কনজারভেটিভ) সুরক্ষা দেয় না। বরং সিস্টেমটি তখন সেই নতুন দলটির পক্ষেই কাজ করতে শুরু করে। কনজারভেটিভ এবং লেবার পার্টি তাদের এক সময়কার সবচাইতে শক্তিশালী দুর্গগুলোতে এখন ভোট হারাচ্ছে আর এই এলাকাগুলোতে ভোট হারানো মানে হলো আসন হারানোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়া।

 লক্ষ‍্য করার মত বিষয় হল, আগে বড় দলগুলো জেতার জন্য ৫০% ভোট লাগত। এখন বহুদলীয় লড়াইয়ের কারণে দেখা যাচ্ছে ২৭% ভোট পেলেই কেউ একজন জিতে যাচ্ছে। এর মানে হলো, বাকি ৭৩% মানুষ হয়তো সেই জয়ী দলের বিরুদ্ধে, কিন্তু সিস্টেমের কারণে সে-ই আসনটি পাচ্ছে। অর্থাৎ আগে এই সুবিধা বড় দলগুলো পেত, এখন সেটি ছোট বা বিদ্রোহী দলগুলো কেড়ে নিচ্ছে। যেহেতু মানুষের ভোট ৫-৭টি দলের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে, তাই কোনো একটি দল যদি খুব অল্প ভোটও পায় (ধরা যাক ২৫-৩০%), কিন্তু সেই ভোটগুলো যদি কোনো এলাকায় অন্যদের চেয়ে সামান্য ভোট বেশী পায়, তবে তারা পুরো আসনটি জিতে নিচ্ছে।

যেহেতু আগে লড়াই হতো মূলত কনজারভেটিভ ও লেবার এই দু’ দলের মধ্যে, ফলে একদল খারাপ করলে আরেক দল জিতে যেত। কাজেই বড় দলগুলোর কিছুটা  ‘অজনপ্রিয়কতা’ থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা এই নির্বাচনী ব্যবস্থায় ছিল। যখন ভোট অনেকগুলো ছোট ছোট ভাগে ভাগ হয়ে যায়, তখন বড় দলগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক কম ভোট পায়। যখন বড় দলগুলো নিজেরাও ‘সংখ্যালঘু’ হয়ে পড়ে, তখন এই সিস্টেম আর তাদের জেতাতে পারে না।

যখন অনেকগুলো দল কাছাকাছি ভোট পায় (যেমন কেউ ২৬%, কেউ ২৪%, কেউ ১৬%), তখন কে জিতবে সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না।  খুব সামান্য ভোটের ব্যবধানে পুরো আসনটি অনেকটা লটারীর মত হয়ে যায়। এই অনিশ্চয়তাই বড় দলগুলোর সুরক্ষা দেয়াল ভেঙে দিচ্ছে। বর্তমানে দলগুলো খণ্ডিত হয়ে যাওয়ায় অল্প ব্যবধানে জয়ী হওয়া সম্ভব হচ্ছে বলেই সেটি লটারির মতো অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

এখন বড় দলগুলো যদি খুব সামান্য ব্যবধানেও দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থানে নেমে যায়, তবে এই সিস্টেমই তাদের আসনগুলো কেড়ে নিয়ে নতুন দলগুলোকে দিয়ে দেয়, কারণ  এই সিস্টেমের নিয়মই হলো, যে প্রথম হবে সে-ই সব পাবে। কাজেই আগে যে সিস্টেম বড় দলগুলোকে একটি ‘দেয়াল’ হিসেবে রক্ষা করত কারণ ছোট দলগুলো প্রচুর ভোট পেলেও কোনো আসন পেত না। সেজন‍্যেই আগে ফার্ষ্ট-পাষ্ট-দ‍্যা-পোষ্ট যেভাবে বড় দলগুলোর সুরক্ষা কবজ ছিল এখন তা হয়েছে তাদের মরণফাঁদ॥

………………….

লেখক Dr Zaki Rezwana Anwar FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD একজন চিকিৎসক, জনপ্রিয় সংবাদ পাঠক, কলামিষ্ট ও আন্তর্জাতিক স্পীকার।