লন্ডন ভ্রমণ

Published: 25 May 2026


মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

লন্ডন ভ্রমণ

লন্ডনের আকাশে তখন মেঘ-রোদ্দুরের খেলা। এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ব্রিটেনের মাটিতে পা রাখা। প্রথমবার সবকিছু দেখার একটা তাড়া থাকে, কিন্তু দ্বিতীয় সফরটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—এক গভীর অনুভূতির, হৃদয়ের খুব কাছাকাছি যাওয়াার গল্প। যান্ত্রিক কোলাহল ছাপিয়ে এই ভ্রমণে আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল আমাদের বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষদের অপরিসীম ভালোবাসা।

নিজের বোন, পরম আত্মীীয় আর চেনা পাড়া-প্রতিবেশীদের সান্নিধ্যে কাটানো মুহূর্তগুলো যেন আমাকে নিমেষেই ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল দেশের চেনা উঠোনে। অনেকেই পরম মমতায় আমার খোঁজখবর নিয়েছেন, মুখোমুখি বসে আড্ডা হয়েছে। তবে মনের ভেতর মৃদু একটা আক্ষেপের মেঘ রয়েই গেছে; সময়ের চাকা এত দ্রুত ঘুরছিল যে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু প্রিয় মানুষকে মনভরে সময় দিতে পারিনি।

লন্ডনের রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম, সুদূর প্রবাসের এই প্রতিকূল পরিবেশেও আমাদের বাংলাদেশিরা কীভাবে নিজেদের একতাবদ্ধ রেখেছেন। শূন্য থেকে শুরু করে আজ তারা সাফল্যের যে শিখরে পৌঁঁছেছেন, তা দেখে একজন বাঙালি হিসেবে আমার বুকটা গর্বে ভরে উঠছিল। ব্রিটেনের বুকে আমাদের পূর্বপুরুষদের কঠোর পরিশ্রম আর নিজেদের স্থাান তৈরি করে নেওয়াার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে। ভ্রমণের ফাঁকে বিলাতের রূপ-লাবণ্যও আমি কম উপভোগ করিনি। তবে দুঃখের বিষয়, এবারের সফরে বিখ্যাাত ‘টাওয়াার ব্রিজ’ আমার ডায়েরিতে অপূর্ণই থেকে গেল। সাধারণত লন্ডনে যারা আসেন, টাওয়াার ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে একটা স্মৃতির ছবি তোলা তাদের জন্য যেন এক অলিখিত নিয়ম। সময়ের অভাবে এবার তা হয়ে ওঠেনি। তবে মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছি—ইনশাআল্লাাহ, আগামী সফরে প্রথমেই টাওয়াার ব্রিজে যাব, প্রাণভরে সময় কাটাব আর একটা দারুণ সেলফি তুলে এই আক্ষেপ ঘুচাব।

এবারের ভ্রমণের ডায়েরিতে সবচেয়ে সোনালী পাতা হয়ে থাকবে ওখানকার মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সাথে কাটানো চমৎকার মুহূর্তগুলো। আমাদের বাঙালি কমিউনিটিতে যে এত এত প্রতিভাবান, প্রজ্ঞাবান ও মেধাবী মানুষ আছেন, তাদের সাথে সরাসরি না মিশলে হয়তো এই সত্যটা আমার জানাই হতো না। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় গণমাধ্যম ‘চ্যাানেল এস’-এর (CEO) প্রিয় বড় ভাই জনাব তাজ চৌধুরীর কথা স্মৃতির মণিকোঠায় চিরকাল অম্লাান থাকবে। তিনি যেভাবে আমাকে পরম আদরে আগলে রেখেছিলেন, চ্যাানেল এসের স্টুুডিও ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে এর সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সোনালী স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিয়েছিলেন, তা আমার জন্য সত্যিই এক অমূল্য প্রাপ্তি।

আর লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাাবের সেই মুখগুলোর কথা কীভাবে ভুলি? বিশেষ করে ক্লাাবের সাধারণ সম্পাাদকের (জেনারেল সেক্রেটারি) শ্রদ্ধেয় আকরামুল হুসাইন ভাইয়ের কথা না বললেই নয়। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি যেভাবে আমার খোঁজ নিয়েছেন আর সময় দিয়েছেন, আন্তরিকতায় বুকটা ভরিয়ে দিয়েছেন, তা আমার এই সফরকে সার্থক করে তুলেছে। তার মতো গুণী মানুষের সান্নিধ্য ও দিকনির্দেশনা আমার চিন্তার জগতকে সমৃদ্ধ করেছে।

আকরামুল হুসাইন ভাইয়ের আন্তরিক সহযোগিতায় প্রেস ক্লাাবে রয়্যাাল লাইফ ইন্টাারন্যাাশনাল-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেস ব্রিফিংং বা সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির নানা সমীকরণের মাঝেও দুবাইয়ের প্রপার্টি বা রিয়েল এস্টেট মার্কেট যে এখনো নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের জন্য একটি চমৎকার জায়গা, তা আমি এই ব্রিফিংংয়ে বিস্তারিত তুলে ধরি। বিনিয়োগ নিয়ে প্রবাসীদের মনের ভেতরের কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা সংশয় দূর করার প্রয়াস ছিল আমার এই বক্তব্যে। আনন্দের বিষয় হলো, উপস্থিত সুধীজন ও গণমাধ্যমকর্মী ভাইদের কাছ থেকে অভাবনীয় সাড়া পেয়েছি। অনেকেই দুবাইয়ে বিনিয়োগের ব্যাাপারে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং অদূর ভবিষ্যতে দুবাই সফরের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির ভাই-বোনেরা যদি এই আলোচনার মাধ্যমে দুবাইয়ের আবাসন খাতে বিনিয়োগের সঠিক দিকনির্দেশনা পান, তবেই আমার এই প্রচেষ্টা সার্থক হবে।

প্রেস কনফারেন্সের বাইরেও আমি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কমিউনিটি মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছি। সেখানে রিয়েল এস্টেট ও নিরাপদ বিনিয়োগ বিষয়ে আগ্রহী অনেকেই আমাকে নানা প্রশ্ন করেন এবং আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে তাদের কৌতূহল ও প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আশা করছি, ভবিষ্যতেও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠাানিক মাধ্যমে আমরা এ বিষয়গুলো আরও জোরালোভাবে সবার সামনে তুলে ধরতে পারব।

প্রেস ক্লাাবে আকরামুল ভাইসহ আরও অনেক আপন মানুষের সাথে যে প্রাণবন্ত আড্ডা ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছিল, তার রেশ এখনো আমার মনে লেগে আছে। এত গুণী মানুষের নাম জড়ো হয়েছে এই সফরে যে, সবার নাম লিখতে গেলে হয়তো শেষ হবে না। তাদের এই আপন করে নেওয়াার উদারতা এবং আতিথেয়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার মতো ভাষা সত্যিই আমার জানা নেই। বিনম্র শ্রদ্ধায় শুধু এটুকুই বলতে পারি, দূর প্রবাসে আপনাদের এই স্নেহময় হাত আমার পথচলার পাথেয় হয়ে থাকবে।

টেমস নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মৃদু বাতাসে চোখ বুঁজতেই বারবার মনে হচ্ছিল, এই সফর কেবলই কিছু দর্শনীয় স্থাান দেখার ভ্রমণ ছিল না, এটি আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক। লন্ডনের চেনা-অচেনা পথে হাঁটার সময় আমি কেবল দালানকোঠা বা কৃত্রিম আলো দেখিনি, অনুভব করেছি মানুষের অবদান আর আমাদের সংস্কৃৃতির গভীরতাকে।

আজ আমাদের বাঙালি সংস্কৃৃতি শুধু বাংলাদেশের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে এর এক গভীর ও ইতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে  পড়েছে।

বিদায়লগ্নে লন্ডনের আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছি, খুব শিগগিরই আবার আসব, এই গৌরব আর ঐতিহ্যের গল্পগুলোকে আরও গভীরভাবে হৃদয়ে ধারণ করতে।