ব্রিটিশ রাজনীতিতে রিফর্মের উত্থান
ব্রিটিশ রাজনীতিতে রিফর্মের উত্থান
তোপের মুখে কিয়ের স্টারমার।। ৪ মন্ত্রীর পদত্যাগ
স্টাফ রিপোর্টার :

যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির মারাত্মক পরাজয়ের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার নিজ দলের মন্ত্রী ও এমপিদের তোপের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করানোর জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইভেট কুপারসহ অন্তত চারজন শীর্ষ ক্যাবিনেট মন্ত্রী একটি সুশৃঙ্খল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করতে চাপ দিচ্ছেন। ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা থেকে ইতোমধ্যে চারজন জুনিয়র মন্ত্রী পদত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারকেও পদত্যাগের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়াও প্রকাশ্যে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন লেবার পার্টির অন্তত ৮৬ জন এমপি। লেবার পার্টির নিয়ম অনুযায়ী দলীয় প্রধানের নেতৃত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জ করতে হলে সংসদীয় দলের অন্তত ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৮১ জন এমপির লিখিত সমর্থন প্রয়োজন।
এদিকে তীব্র সমালোচনা ও চাপের মুখেও স্টারমার নিজেকে প্রধানমন্ত্রী পদে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং দেশকে কোনো বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দেবেন না। বরং তিনি সরকারকে পুনর্গঠন করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে ১০০ জনের বেশি এমপি এক বিবৃতি প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তারা বলেছেন, এখন নেতৃত্বের লড়াইয়ের সময় নয়।
সংকটের মূল কারণ ও বর্তমান পরিস্থিতি :
যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে এবং গ্রিন পার্টি উভয় দলই ঐতিহাসিক এবং নজিরবিহীন সাফল্য অর্জন করেছে। মূল দুই দল লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টির ভোট ব্যাংক ধসিয়ে দিয়ে তারা এই বড় জয় তুলে নেয়।
লেবার পার্টি ইংল্যান্ডজুড়ে প্রায় ১,০০০টি কাউন্সিল আসন হারিয়েছে এবং ওয়েলসে দীর্ঘ ২৭ বছর পর ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে।
নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে এই দলটি এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে। দলটির কাউন্সিলর আসন সংখ্যা প্রায় শূন্য থেকে এক লাফে ১,৪৫৩ টিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা মোট ১,৪৫১টি নতুন আসন জয় করেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রিফর্ম ইউকে ইংল্যান্ডের ১৪টি স্থানীয় কাউন্সিলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে লন্ডনের হ্যাভারিং কাউন্সিল অন্যতম। এছাড়া সান্ডারল্যান্ড, বার্নসলি এবং এসেক্সের মতো লেবার ও কনজারভেটিভদের পুরোনো ঘাঁটিতে তারা জয়লাভ করেছে। ওয়েলস পার্লামেন্ট (সেনেড) নির্বাচনে তারা ৩৪টি আসন জিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। স্কটল্যান্ডেও ১৭টি আসন জিতে লেবার পার্টির সমান অবস্থান নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে গ্রিন পার্টি পরিবেশবাদী এই দলটিও বামপন্থী ও মধ্যপন্থী ভোটারদের সমর্থন আকর্ষণ করে রেকর্ড পরিমাণ সাফল্য পেয়েছে। গ্রিন পার্টি পুরো যুক্তরাজ্যে ৫৮৭টি আসনে জয়লাভ করেছে। যার মধ্যে ৪১১টি আসনই তারা নতুন করে জিতেছে।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লন্ডনের ৩টি গুরুত্বপূর্ণ কাউন্সিল হ্যাকনি, লুইশাম এবং ওয়ালথাম ফরেস্ট লেবার পার্টির হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে গ্রিন পার্টি। লন্ডনের বাইরে নরউইচ ও হেস্টিংস কাউন্সিলেও তারা বড় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। লন্ডনের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বারো হ্যাকনিতে জো গ্যারবেট এবং লুইশামে লিয়াম শ্রীবাস্তব গ্রিন পার্টির ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত মেয়র হিসেবে জয়ী হয়েছেন।
স্কটিশ পার্লামেন্টে রেকর্ড ১৫টি আসন পাওয়ার পাশাপাশি ওয়েলস পার্লামেন্টেও প্রথমবারের মতো ২টি আসন জিতে খাতা খুলেছে দলটি।
যুক্তরাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার যদি পদত্যাগ করেন বা তাঁর নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তবে লেবার পার্টির নতুন নেতা এবং পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে ৪ জন হেভিওয়েট প্রার্থী সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন:
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং
তিনি বর্তমানে মন্ত্রিসভার সবচেয়ে দক্ষ ও প্রভাবশালী বক্তা হিসেবে পরিচিত। লেবার পার্টির ডান ও মধ্যপন্থী এমপিদের একটি বড় অংশ তাঁকে সমর্থন করছে। তিনি ইতিমধ্যে দলের ২০ শতাংশের বেশি এমপির সমর্থন নিশ্চিত করেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। স্টারমার দ্রুত পদত্যাগ করলে স্ট্রিটিংয়ের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। দলের বামপন্থী সাধারণ সদস্যরা তাঁর অতিরিক্ত ডানপন্থী বা ‘ব্লেয়ারপন্থী’ মতাদর্শ পছন্দ নাও করতে পারেন।
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম
জনমত জরিপ অনুযায়ী তিনি এই মুহূর্তে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেবার রাজনীতিবিদ। সাধারণ জনগণ ও দলীয় সদস্যদের মাঝে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং উত্তর ইংল্যান্ডের ভোটারদের ওপর তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
প্রধান বাধা তিনি বর্তমানে ব্রিটিশ সংসদের সদস্য (গচ) নন। লেবার পার্টির নিয়ম অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী হতে হলে তাঁকে প্রথমে কোনো উপ-নির্বাচনে জিতে এমপি হতে হবে। তাঁর সমর্থকরা চাইছেন স্টারমার যেন পদত্যাগের একটি দীর্ঘ সময়সীমা নির্ধারণ করেন যাতে বার্নহাম এমপি হওয়ার সময় পান।
প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার
লেবার পার্টির বাম ও নরম-বামপন্থীদের মাঝে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
বার্নহাম যদি কোনো কারণে এমপি হয়ে প্রতিযোগিতায় নামতে না পারেন, তবে রেনার নিজেই স্ট্রিটিংয়ের বিরুদ্ধে মূল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াতে পারেন। তিনি প্রকাশ্যে বার্নহামকে সংসদে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য আবাসন ও কর সংক্রান্ত একটি আইনি বিতর্কের কারণে গত বছর তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, যা তাঁর ইমেজ কিছুটা ক্ষুণ্ণ করেছে।
জ্বালানি মন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড – তিনি লেবার পার্টির একজন প্রবীণ নেতা এবং ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দলের প্রধান ছিলেন।
যদি স্ট্রিটিং এবং বার্নহাম শিবিরের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তবে ‘ঐক্যমত্যের মধ্যবর্তী প্রার্থী’ বা অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মিলিব্যান্ডকে বেছে নেওয়া হতে পারে। তিনি অন্তর্র্বতীকালীন দায়িত্ব পালন করে পরবর্তী নির্বাচনের আগে বার্নহামের জন্য পথ ছেড়ে দিতে পারেন।
যুক্তরাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন দলের নেতা পরিবর্তিত হলে সরাসরি সাধারণ নির্বাচন হয় না; বরং নতুন দলীয় নেতাই রাজার আমন্ত্রণে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।




