‘নাকবা’ স্বীকৃতির দাবি জোরদার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে
পোস্ট ডেস্ক :

ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৭৮তম বার্ষিকীতে আবারও সামনে এসেছে ‘নাকবা’ ইস্যু। বিশ্লেষকরা বলছেন, ফিলিস্তিনি ইতিহাসকে স্বীকৃতি না দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ন্যায়সঙ্গত নীতি প্রণয়ন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। বৃহস্পতিবার ছিল নাকবা স্মরণ দিবস। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক উচ্ছেদ ও ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই অধ্যায়। এরপর থেকে ফিলিস্তিনিরা বাস্তুচ্যুতি ও জাতিগত নিধনের শিকার হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল প্রভাব বজায় রাখলেও যুক্তরাষ্ট্র সরকার এখনো নাকবাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।
আরবি শব্দ নাকবার অর্থ মহাবিপর্যয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনি ইস্যুতে আরও প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নিয়েছে। গাজা পুনর্গঠনের জন্য বিতর্কিত বোর্ড অব পিস গঠন করা হয়েছে। এই সময়ে গাজায় ইসরাইলের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিও যুক্তরাষ্ট্র নমনীয় অবস্থান বজায় রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা খালেদ এলগিন্ডি বলেন, আপনি যদি শুধু এক পক্ষের মানবিক দুর্ভোগ স্বীকার করেন, তাহলে আপনাকে ঐতিহাসিক বাস্তবতাও অস্বীকার করতে হবে, যা এখন বিদ্যমান।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, রাজনৈতিক বিস্মৃতি দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীতিকে প্রভাবিত করছে। দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে বিপুল সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে। অথচ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি দখলদারিত্ব ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বর্ণবাদী শাসন হিসেবে উল্লেখ করেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজায় ইসরাইলের হামলায় অন্তত ৭৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এলগিন্ডি বলেন, ভালো বা খারাপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফিলিস্তিন ইস্যুর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তিনি বলেন, নাকবাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে একটি মৌলিক ও দীর্ঘদিনের চাওয়া পূরণ হবে। এটি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা যে, ফিলিস্তিনিদের সম্মিলিত ট্রমা তাদের পরিচয় ও রাজনৈতিক মানসিকতার অংশ।
নাকবা চলছে: বৃহস্পতিবার মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব চলমান নাকবা ও ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অধিকারের স্বীকৃতির দাবিতে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। এ নিয়ে টানা পঞ্চমবারের মতো তিনি কংগ্রেসে প্রস্তাব দিলেন। ২০২২ সালে প্রথমবার প্রস্তাব আনার সময় ছয়জন সমর্থন দিয়েছিলেন। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১২। এক ভিডিও কনফারেন্সে তালিব বলেন, আমার অনেক সহকর্মী এমন আচরণ করেন যেন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা শুধু নেতানিয়াহুর সময় থেকেই শুরু হয়েছে। আমরা জানি, ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান নাকবা ও জাতিগত নিধন চলছে। প্রথম নাকবার সময় প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়। তারা পশ্চিম তীর, গাজা ও প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়। প্রায় ৪০০ শহর ও গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়ে। বালাদ আল-শেখ, সাসা, দেইর ইয়াসিন, সালিহা ও লিদ্দাসহ বিভিন্ন স্থানে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। আগের বছরের মতো এবারও তালিবের এই প্রস্তাব মূলত প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, কংগ্রেসে এখনো ইসরাইলপন্থি অবস্থানই প্রাধান্য পাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জনমতের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন জরিপে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি বাড়ছে এবং ইসরাইল সরকারের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে গাজায় গণহত্যার পর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন কমেছে। কংগ্রেসের অবস্থানেও ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। একসময় ইসরাইলের প্রতি সমর্থন ছিল প্রায় অলঙ্ঘনীয়। এখন দেশটিতে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবিতে সমর্থন বাড়ছে। গত এপ্রিল মাসে ১০০ সদস্যের সিনেটের ৪০ জন ডেমোক্র্যাট ইসরাইলে সামরিক বুলডোজার বিক্রি বন্ধের পক্ষে ভোট দেন। যদিও বিলটি পাস হয়নি, তবু অধিকারকর্মীরা এটিকে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেছেন। চলতি মাসের শুরুতে কংগ্রেসের ৩০ সদস্য ইসরাইলের কথিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অফিসিয়াল অস্পষ্টতা নীতিরও বিরোধিতা করেন। বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই প্রায় নিষিদ্ধ আলোচনার মধ্যে ছিল। আরব সেন্টার ওয়াশিংটনের কর্মকর্তা ইউসুফ মুনাইয়ার বলেন, আজ না হলেও একদিন এই প্রস্তাব পাস হবে। আর সেটা সম্ভব হবে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার কারণে।
এক প্রজন্মেই কি ভুলে যাবে? এমনকি ১৫ মে নাকবা দিবস স্বীকৃতি দেওয়াও এখনো বিতর্কিত। জাতিসংঘ ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো নাকবার ৭৫তম বার্ষিকী পালন করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও আরও ৩০টি দেশ নাকবাকে স্বীকৃতির জাতিসংঘের প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র অনুষ্ঠানেও অংশ নেয়নি। এক মুখপাত্র বলেন, জাতিসংঘ ব্যবস্থার মধ্যে দীর্ঘদিনের ইসরাইলবিরোধী পক্ষপাত নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে। একই বছর মার্কিন কংগ্রেসেও নাকবা ইস্যুতে বিরোধ দেখা দেয়। রাশিদা তালিব ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটলে প্রথমবারের মতো নাকবা স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। তবে রিপাবলিকান নেতারা অনুষ্ঠানটি বাতিলের চেষ্টা করেন। ইসরাইলপন্থি সংগঠন অ্যান্টি-ডিফেমেশন লীগের চাপও ছিল। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় এমন অবস্থানে ছিল না। এলগিন্ডি বলেন, ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ইহুদি মিলিশিয়া ও গোপন গোষ্ঠীগুলোর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলেছিলেন। যদিও তার প্রশাসনই প্রথম ইসরাইল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। ট্রুম্যান প্রশাসন জাতিসংঘের ১৯৪ নম্বর প্রস্তাবও সমর্থন করেছিল। এতে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইউএনআরডব্লিউএতে নিবন্ধিত। ওই প্রস্তাবের মাধ্যমে গঠিত প্যালেস্টাইন কনসিলিয়েশন কমিশনেও যুক্তরাষ্ট্র সদস্য ছিল। ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের পরিচালক জশ রুবনার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সম্পর্কে অবগত ছিল। যদিও তখন নাকবা বা জাতিগত নিধন শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়নি। তিনি বলেন, জেরুজালেম, হাইফা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন কূটনৈতিক দপ্তরের নথিতে পরিষ্কারভাবে দেখা যায়, তারা বুঝতে পেরেছিল ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কী করছে। তারা পরিকল্পিত লুটপাট, সম্পত্তি ধ্বংস, উচ্ছেদ ও নির্যাতনের বিষয়গুলো তলিকাভুক্ত করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। ১৯৬০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির আমলে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। ১৯৯০ এর দশকে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে অসলো চুক্তির সময়ও এটি আলোচনায় ওঠে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি নাকবার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে যখন ইসরাইল তার ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করবে, তখন ফিলিস্তিনিরা পালন করবে ভিন্ন এক বার্ষিকী— ৭০ বছর আগে ঘটে যাওয়া নাকবা বা বিপর্যয়ের স্মরণ। তবে এলগিন্ডি বলেন, ১৯৬০ দশকে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনের সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ ইসরাইলের প্রতি পূর্ণ সমর্থনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর এর সঙ্গে সঙ্গে নাকবার স্বীকৃতিও কমে যায়। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক নথি নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, আমেরিকার রাজনীতিতে এসব ভুলে যেতে এক প্রজন্মেরও কম সময় লেগেছে।Politics
সমাধানে ইচ্ছা কতটুকু? বিশ্লেষকরা বলছেন, নাকবার স্বীকৃতি শুধু প্রতীকী বিষয় নয়, বরং ফিলিস্তিন সংকট বোঝার জন্য বাস্তবিকভাবেও জরুরি। রুবনার বলেন, নীতিনির্ধারকরা যদি নাকবাকে বিবেচনায় না নেন এবং তা সংশোধনের চেষ্টা না করেন, তাহলে তারা অন্যায় পরিস্থিতিকেই স্থায়ী করবেন। মূল বাস্তবতা না বুঝে সমাধান খোঁজা মানে গোল ছিদ্রে চৌকো কাঠ ঢোকানোর চেষ্টা করা। ওয়াশিংটনে আরব সেন্টারের শীর্ষ কর্মকর্তা ইউসুফ মুনাইয়ার বলেন, ফিলিস্তিনে নাকবা স্বীকৃতি দিতে আমাদের ৮০ বছর অপেক্ষা করা উচিত নয়। আর গাজায় চলমান গণহত্যা স্বীকার করতেও যেন আরও ৮০ বছর অপেক্ষা করতে না হয়।




