পূর্ব লন্ডনে এমসি কলেজের কিংবদন্তি দুই অধ্যাপকের বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা

Published: 18 May 2026

পোস্ট ডেস্ক :


বিলেতের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝে গত রোববার পূর্ব লন্ডনে এক অসাধারণ আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হলেন প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজ। সিলেট মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজের বড়বাড়ী খ্যাত রসায়ন বিভাগের দুই কিংবদন্তি অধ্যাপক প্রফেসর সুধাংশু শেখর তালুকদার ও প্রফেসর মেঘনাথ সাহাকে বর্ণাঢ্য আয়োজনে সংবর্ধনা প্রদান করেন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সাবেক শিক্ষার্থীগণ। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত এম.সি. কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে আয়োজিত এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান পরিণত হয় এক হৃদয়স্পর্শী মিলনমেলায়।

বিলেতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত দেড় শতাধিক মুরারীয়ান এই অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত প্রাক্তন শিক্ষার্থীর প্রবাসের কর্মব্যস্ত জীবন থেকে সময় করে নিয়ে তাদের প্রিয় শিক্ষকদের সম্মান জানাতে একত্রিত হন। অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের পর থেকেই পরিচিত মুখের ভিড়ে পুরনো স্মৃতি যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন পর সহপাঠীদের সাথে দেখা, স্যারদের সামনে বসে সেই ছাত্র জীবনের অনুভূতি ফিরে পাওয়া — সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি শুরু থেকেই এক অনন্য আবহ তৈরি করে।

সুসজ্জিত মিলনায়তনে শুরু হয় পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মাধ্যমে। জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।এরপর স্বাগত বক্তব্য, স্মৃতিচারণ, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং সম্মাননা প্রদানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান এগিয়ে চলে। একে একে বক্তারা মঞ্চে উঠে শিক্ষকদের সাথে তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, শিক্ষা জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত এবং অধ্যাপক দ্বয়ের অনুপ্রেরণামূলক শিক্ষাদান পদ্ধতির কথা তুলে ধরেন। অনেকের কন্ঠ আবেগে ভারি হয়ে আসে, চোখের কোণে জমে ওঠে কৃতজ্ঞতার অশ্রু।

প্রফেসর সুধাংশু শেখর তালুকদার ও প্রফেসর মেঘনাথ সাহা দীর্ঘ কর্মজীবনে সিলেট এম.সি. কলেজের রসায়ন বিভাগে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী গড়ে তুলেছেন। তাঁদের অনন্য শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক মনোযোগ এবং বিষয় জ্ঞানের গভীরতা তোদেরকে করে তুলেছিল শিক্ষার্থীদের অত্যন্ত প্রিয়। শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কীভাবে যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে হয়, তা-ও শিখিয়েছেন তাঁরা। আজ তাঁদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের নানা প্রান্তে সফলতার সাথে প্রতিষ্ঠিত —এটা তাঁদের সবচেয়ে বড় অর্জন ও স্বীকৃতি।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, “স্যারেরা শুধু আমাদের রসায়নের সূত্র শিখান নি , জীবনের সূত্র শিখিয়েছেন। তাদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা না পেলে আজকের এই প্রতিষ্ঠিত জীবন হয়তো সম্ভব হতো না।” অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী জানান, কঠিন সময়ে স্যারের উৎসাহের কথা তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে।

সংবর্ধনা গ্রহণ করে অধ্যাপক দ্বয় গভীর আবেগ ও কৃতজ্ঞতার সাথে বলেন, প্রবাসের মাটিতে এত বছর পরেও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এই উষ্ণ ভালোবাসা তাঁদের কাছে অমূল্য। তাঁরা বলেন, “একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো তাঁর শিক্ষার্থীদের সাফল্য ও ভালোবাসা। আজকের এই অনুষ্ঠান আমাদের সেই পুরস্কার দিল।” তাঁরা উপস্থিত সকল প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সুখী জীবন কামনা করেন।

উল্লেখ্য, সিলেট মুরারিচাঁদ কলেজ বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত। এই কলেজ দীর্ঘ বছর ধরে দেশে-বিদেশে অসংখ্য কৃতী বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও প্রকৌশল তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বিলেতে প্রতিষ্ঠিত মরারীয়ানদের এই সংগঠিত প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, প্রবাসেও শেকড়ের প্রতি টান ও শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কোনোভাবেই ম্লান হয়নি।

গত রোববারের এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শুধু দুজন বিশিষ্ট শিক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আয়োজন নয় — এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাংস্কৃতিক ও মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল প্রকাশ। এই অনুষ্ঠান আগামী প্রজন্মের কাছে বার্তা দিয়ে গল — শিক্ষকের ঋণ কোনদিন শোধ হয় না, কেবল কৃতজ্ঞতায় বহন করা যায়।

অনুষ্ঠানে উভয় অধ্যাপক কে ক্রেস্ট, সম্মাননা পত্র ও পুষ্পস্তবক প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে সবাই একসাথে ভোজে অংশ নেন, যেখানে চলে পুরনো দিনের গল্প, হাসি-আনন্দ আর নস্টালজিয়ার আলোচনা।